কায়সার রহমান রোমেল
দেশের মানচিত্রে গাইবান্ধা নামের জেলাটি বহুকাল ধরেই যেন এক নীরব প্রান্তবাসী। যমুনা নদীর পূর্ব পাড়ে বাহাদুরাবাদ আর পশ্চিম পাড়ে বালাসীঘাট— মাঝখানে বিস্তৃত জলরাশি, আর তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা লাখো মানুষের একটিই প্রশ্ন: আর কতদিন? এই প্রশ্নকে ঘিরেই আত্মপ্রকাশ করেছে ‘উত্তরসংযোগ’ নামের একটি ছোটকাগজ, যার প্রথম সংখ্যাটি সম্পূর্ণভাবে সাজানো হয়েছে একটিমাত্র দাবির পক্ষে— বালাসী-বাহাদুরাবাদে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের যৌক্তিকতা তুলে ধরার প্রয়াসে।
সাধারণত ছোটকাগজ বলতে আমরা বুঝি সাহিত্য, কবিতা কিংবা সংস্কৃতিচর্চার একান্ত পরিসর। কিন্তু ‘উত্তরসংযোগ’ সেই চেনা ছকের বাইরে গিয়ে একটি অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন-দাবিকে কেন্দ্র করে প্রকাশ পেয়েছে সংখ্যাটি, যা বাংলাদেশের সাময়িকী-সংস্কৃতিতে বিরল এক উদ্যোগ বলা চলে। সম্পাদকীয় নিবন্ধ ‘এটি শুধু একটি সেতুর দাবি নয়’-এ স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল বা মেট্রোরেলের মতো মেগা-প্রকল্পের সুফল যেভাবে দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছায়নি, উত্তরাঞ্চল তারই এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। কৃষি উৎপাদনে সিংহভাগ অবদান রাখা এই জনপদ যমুনা নদীর ভৌগোলিক বিভাজনের কারণে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন— এই আক্ষেপই বইয়ের মূল সুর।
সংখ্যাটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর বহুস্বরিক কাঠামো। ১১২ পৃষ্ঠার এই কাগজে স্থান পেয়েছে প্রায় চব্বিশটি লেখা, যেখানে কলম ধরেছেন প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক থেকে শুরু করে নদী গবেষক তুহিন ওয়াদুদ, সাবেক অতিরিক্ত সচিব নীলিমা আখতার, প্রকৌশলী, আইনজীবী, চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধি, অভিনয়শিল্পী জুলফিকার চঞ্চল, সংগীতশিল্পী রেজা করিম থেকে শুরু করে স্থানীয় সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মীরা। এই বৈচিত্র্যই বইটিকে নিছক একপাক্ষিক আবেগনির্ভর আবেদনপত্র হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে। আনিসুল হকের ‘বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতু: উত্তরবঙ্গের আরেকটি স্বপ্ন’ প্রবন্ধে নদী আর সভ্যতার সম্পর্কের এক কাব্যিক পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়, যেখানে তিনি লিখেছেন— সেতু কেবল কংক্রিট আর ইস্পাতের নির্মাণ নয়, সেতু সময়কে ছোট করে, দূরত্বকে কাছে আনে, মানুষের জীবনকে সহজ করে।
অন্যদিকে তুহিন ওয়াদুদ কিংবা জহুরুল কাইয়ুমের লেখায় উঠে এসেছে উন্নয়ন-বৈষম্যের পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং সেতুর স্থান নির্ধারণের কারিগরি যুক্তি। প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান বাবুর নিবন্ধ ‘রাষ্ট্রীয় নিয়মাবলী বনাম রাজনৈতিক বক্তব্য’ অংশটি বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো— এখানে তিনি রাজনৈতিক ঘোষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার (একনেক, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর) মধ্যকার দ্বন্দ্ব তুলে ধরে প্রশ্ন তুলেছেন— একটি জাতীয় মেগা-প্রকল্পের রুট কি কোনো একক ব্যক্তির ইচ্ছায় নির্ধারিত হতে পারে? এই অংশটুকু বইটিকে নিছক প্রশস্তিমূলক রচনার সীমানা পেরিয়ে একধরনের নাগরিক জবাবদিহিতার দলিলে পরিণত করেছে।
লেখাগুলো পড়তে পড়তে বোঝা যায়, সম্পাদকমণ্ডলী বিষয়টিকে নিছক আবেগের জায়গা থেকে না দেখে অর্থনৈতিক মূল্যায়ন ও পরিবেশগত পর্যালোচনার ভিত্তিতে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। ব্যবসা-বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধির লেখা, নারীর জীবনে সেতুর প্রভাব নিয়ে আফরোজা লুনা ও রিকতু প্রসাদের পর্যবেক্ষণ, পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে শাহ আলম যাদুর নিবন্ধ— প্রতিটি লেখাই একই দাবিকে ভিন্ন ভিন্ন কোণ থেকে দেখার প্রয়াস। বইয়ের একেবারে শেষাংশে যুক্ত হয়েছে একটি আলাদা 'মন্তব্য' অংশ, যেখানে বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটের কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে চৌত্রিশ বিশিষ্ট ব্যক্তির পর্যালোচনা রয়েছে, আর সবশেষে রয়েছে একটি ছবির অ্যালবাম— স্থানীয় জনতার মতবিনিময় সভা, মানববন্ধন আর আন্দোলনের মুহূর্তের ফটোগ্রাফ, যা এই দাবিকে ছাপা কাগজ থেকে চেনা বাস্তবতায় নামিয়ে আনে।
তবে সততার সঙ্গেই বলা দরকার, এই সংখ্যাটির সবচেয়ে বড় শক্তি— এর একমুখী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কাঠামো— একই সঙ্গে এর সীমাবদ্ধতাও বটে। চব্বিশ লেখক আর চৌত্রিশজন মন্তব্যকারীরর প্রায় প্রত্যেকেই মূলত একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন— বালাসী-বাহাদুরাবাদই সেতুর জন্য যথাযথ স্থান। প্রতিযোগী রুট (যেমন বগুড়ার সারিয়াকান্দি-জামালপুরের মাদারগঞ্জ) নিয়ে আলোচনা এসেছে বটে, কিন্তু সেই পক্ষের যুক্তি বা প্রকৌশলগত সম্ভাব্যতা সমীক্ষার বিস্তারিত তুলনামূলক উপস্থাপনা অনুপস্থিত। ফলে পাঠক হিসেবে এই কাগজ থেকে যে চিত্র পাওয়া যায়, তা মূলত একটি অঞ্চলের দাবির পক্ষে সাজানো বয়ান— এটিকে সেতু-বিতর্কের নিরপেক্ষ পর্যালোচনা বলার সুযোগ কম। একইভাবে, দ্বিতীয় যমুনা সেতুর প্রাক্কলিত ব্যয়, অর্থায়নের উৎস কিংবা সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে স্বতন্ত্র কারিগরি বিশ্লেষণও প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত থেকে গেছে।
তারপরও ‘উত্তরসংযোগ’-এর এই প্রথম সংখ্যাকে খাটো করে দেখার কোনো কারণ নেই। এটি মূলত একটি অঞ্চলের সম্মিলিত কণ্ঠস্বরের দলিল— যেখানে সাহিত্যিক, সাংবাদিক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী আর সাধারণ মানুষ একই স্বপ্নে গলা মিলিয়েছেন। ঢাকাকেন্দ্রিক গণমাধ্যমে যেসব প্রান্তিক দাবি প্রায়ই যথাযথ গুরুত্ব পায় না, সেসব দাবিকে সংগঠিত, নথিবদ্ধ ও যুক্তিসংগতভাবে উপস্থাপনের এই প্রয়াস স্থানীয় সাংবাদিকতা ও নাগরিক আন্দোলনের একটি মূল্যবান নজির হয়ে থাকতে পারে। যাঁরা আঞ্চলিক উন্নয়ন-বৈষম্য, নদীভাঙন-বিধ্বস্ত জনপদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কিংবা তৃণমূল পর্যায়ের আন্দোলন-সাংবাদিকতার নমুনা খুঁজছেন, তাঁদের জন্য ‘উত্তরসংযোগ’-এর এই সংখ্যাটি একটি প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী পাঠ হতে পারে। বইটির প্রকৃত পরীক্ষা অবশ্য হবে বাস্তবে— দ্বিতীয় যমুনা সেতু সত্যিই বালাসী-বাহাদুরাবাদে নির্মিত হয় কি না, আর এই কাগজ সত্যি সত্যিই সেই দূরত্ব ঘোচাতে পারে কি না, সময়ই তার জবাব দেবে।
বই/পত্রিকা পরিচিতি:
উত্তরসংযোগ (সমসাময়িক ভাবনার ছোটকাগজ) ।
প্রথম সংখ্যা, আগস্ট ২০২৬ ।
বিষয়: উন্নয়ন ভাবনা, প্রেক্ষিত— দ্বিতীয় যমুনা সেতু ।
সম্পাদনা: হেদায়েতুল ইসলাম বাবু ।
প্রকাশনা: সংযোগ, গাইবান্ধা । পৃষ্ঠা: ১১২
প্রকাশক ও সম্পাদক :- এম আবদুস্ সালাম । নির্বাহী সম্পাদক:- আফতাব হোসেন। সম্পাদকীয় কার্যালয়:- দুই নং রেলগেট, গাইবান্ধা। ঢাকা অফিস : হাউস#৯৫/A, রোড #৪ ব্লক-F বনানী ঢাকা ১২১৩ মোবাইল :- ০১৭১৩৪৮৪৬৪৭
ই পেপার