প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ৫, ২০২৬, ১১:৩০ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুলাই ৫, ২০২৬, ৩:০৩ পি.এম

সুদীপ্ত সালাম
বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে কিছু অবকাঠামো প্রকল্প শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটায়নি, বরং দেশের অর্থনৈতিক ভূগোলকেও নতুনভাবে বিন্যস্ত করেছে। যমুনা বহুমুখী সেতু দেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলকে একসূত্রে বেঁধে জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করেছে। পদ্মা সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করে সেখানে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
আজ দেশের উত্তরাঞ্চলের ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের জাতীয় যোগাযোগ কৌশলের অংশ হিসেবে দ্বিতীয় যমুনা (ব্রহ্মপুত্র) সেতু নির্মাণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এই মেগা প্রকল্পের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সেতুটি কোথায় নির্মিত হলে দেশের সর্বাধিক জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে স্থানীয় আবেগ, রাজনৈতিক প্রভাব বা কোনো জেলার আন্দোলনের শক্তির ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ, দ্বিতীয় যমুনা সেতু কোনো একটি জেলার প্রকল্প নয়; এটি আগামী একশ বছরের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক উন্নয়নের একটি কৌশলগত বিনিয়োগ।
সর্বাধিক মানুষের কল্যাণই হোক প্রধান বিবেচনা
বিশ্বব্যাপী বড় অবকাঠামো প্রকল্প মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—একই বিনিয়োগে কোথায় সর্বাধিক মানুষ এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক অঞ্চল উপকৃত হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বালাসীঘাট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সম্ভাব্য যোগাযোগ নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বালাসীঘাটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে রংপুর বিভাগের আটটি জেলা—গাইবান্ধা, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হতে পারেন। একই সঙ্গে রাজশাহী বিভাগের বগুড়া, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলার প্রায় ৭০ লাখ মানুষও এই সেতুর সুফল ভোগ করতে পারবেন।
অর্থাৎ, মোট ১১টি জেলার প্রায় আড়াই কোটি মানুষের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ করিডোর সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একটি রাষ্ট্রীয় মেগা প্রকল্পের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, একই বিনিয়োগের মাধ্যমে যদি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করা যায়, তাহলে সেই বিনিয়োগের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
বালাসীঘাটের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব
বালাসীঘাটে সেতু নির্মাণের দাবি নতুন নয়। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই স্থানে একটি সেতু নির্মাণের দাবি উঠে আসছে। ঐতিহাসিকভাবেও বালাসীঘাট উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌ ও রেল যোগাযোগ কেন্দ্র ছিল এবং উত্তরবঙ্গের অন্যতম বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত ছিল।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ঐতিহাসিক গুরুত্ব নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
বিকল্প যোগাযোগ করিডোর গঠনের সুযোগ
বর্তমানে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের একটি বড় অংশ বিদ্যমান যমুনা সেতুর ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যতে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবিলার বিষয় বিবেচনায় একটি বিকল্প যোগাযোগ করিডোর গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। যদি দ্বিতীয় সেতু বিদ্যমান সেতুর খুব কাছাকাছি নির্মিত হয়, তাহলে কী সত্যিকার অর্থে একটি নতুন জাতীয় করিডোর সৃষ্টি হবে, নাকি বিদ্যমান করিডোরই আরও শক্তিশালী হবে?
অন্যদিকে, বালাসীঘাটে সেতু নির্মাণ উত্তরাঞ্চলের জন্য একটি নতুন যোগাযোগ অক্ষ তৈরি করতে পারে, যা জাতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও বৈচিত্র্যময়, টেকসই এবং দুর্যোগ-সহনশীল করে তুলতে পারে।
আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসে একটি কৌশলগত বিনিয়োগ
বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ হলো আঞ্চলিক বৈষম্য। স্বাধীনতার পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে উঠলেও রংপুর বিভাগ এখনও তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। শিল্পায়ন, বৃহৎ বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাবে এই অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠী জীবিকার জন্য দেশের অন্যান্য অঞ্চলে কিংবা বিদেশে যেতে বাধ্য হয়।
বর্তমান সরকারের উন্নয়ন দর্শনের অন্যতম লক্ষ্য হলো ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়ন।
সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর স্থান নির্ধারণে এমন একটি বিকল্পকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, যা নতুন অঞ্চলকে উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করবে এবং দীর্ঘদিনের বৈষম্য কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
কৃষি, শিল্প ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত
উত্তরাঞ্চল দেশের অন্যতম খাদ্য উৎপাদন কেন্দ্র। ধান, আলু, ভুট্টা, গম, সবজি, মাছ এবং প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে এই অঞ্চলের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করা সম্ভব হবে, পরিবহন ব্যয় কমবে এবং কৃষক ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক শিল্প, হিমাগার, গুদামজাতকরণ, লজিস্টিক হাব এবং নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
আন্দোলনের শক্তি নয়, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন
দ্বিতীয় যমুনা সেতুর স্থান নির্বাচন কোনো জেলার আন্দোলনের তীব্রতা, রাজনৈতিক লবিং বা সাময়িক জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে হওয়া উচিত নয়। এটি এমন একটি জাতীয় বিনিয়োগ, যার সুফল আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছর ধরে দেশের মানুষ ভোগ করবে।
তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিবেচনায় থাকা উচিত—
• সর্বাধিক জনগোষ্ঠীর উপকার,
• নতুন অর্থনৈতিক করিডোর সৃষ্টি,
• আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস,
• শিল্পায়নের সম্ভাবনা,
• কৃষি অর্থনীতির সম্প্রসারণ,
• দুর্যোগকালীন বিকল্প যোগাযোগ,
• জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব,
• জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য।
ভুল সিদ্ধান্ত বা বিলম্বের মূল্য
মেগা অবকাঠামো প্রকল্পে ভুল স্থান নির্বাচন কিংবা দীর্ঘসূত্রতা দেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। যদি এমন কোনো স্থান নির্বাচন করা হয়, যেখানে দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় সুবিধা সীমিত থাকে, তাহলে একটি প্রজন্মের উন্নয়নের সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে। আবার দীর্ঘ বিলম্বের ফলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাস্তবায়ন আরও পিছিয়ে যেতে পারে। তাই প্রয়োজন দ্রুত কিন্তু তথ্যভিত্তিক, নিরপেক্ষ এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।
শেষকথা
দ্বিতীয় যমুনা (ব্রহ্মপুত্র) সেতু শুধু একটি নদী পারাপারের অবকাঠামো নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন মানচিত্র পুনর্গঠনের একটি কৌশলগত রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। এই সেতুর স্থান নির্বাচন এমনভাবে হওয়া প্রয়োজন, যাতে সর্বাধিক মানুষ উন্নয়নের সুফল পায়, নতুন অর্থনৈতিক করিডোর সৃষ্টি হয় এবং দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক বৈষম্য কমে আসে।
যদি একটি নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে বালাসীঘাটে সেতু নির্মাণের মাধ্যমে রংপুর বিভাগের আটটি এবং রাজশাহী বিভাগের তিনটিসহ মোট ১১টি জেলার প্রায় আড়াই কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে, নতুন শিল্প ও বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্য কমানো সম্ভব হবে, তাহলে জাতীয় স্বার্থেই এই বিকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে একটি দূরদর্শী ও যুগোপযোগী রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত।
কারণ, একটি মেগা সেতুর সফলতা শুধু কতটি যানবাহন চলবে, তা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়; বরং কত কোটি মানুষ, কতটি নতুন জেলা এবং কত বড় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলকে উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করা যাবে, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান মাপকাঠি।
দ্বিতীয় যমুনা (ব্রহ্মপুত্র) সেতু সেই অর্থে শুধু একটি সেতু নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের আড়াই কোটি মানুষের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধির সঙ্গে সমগ্র বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নযাত্রার এক নতুন ও স্থায়ী সেতুবন্ধ হয়ে উঠতে পারে।
আমাদের প্রত্যাশা, দ্বিতীয় যমুনা (ব্রহ্মপুত্র) সেতুর স্থান নির্ধারণে বর্তমান যানবাহনের চাপের পাশাপাশি আগামী ৫০–১০০ বছরের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি সর্বাধিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়ে একটি স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।