শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) বিকেলে হাসপাতালের ৮ম তলার একটি কেবিনে সময়মতো সঠিক চিকিৎসা সেবা না পাওয়ার ওই নারীর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়।
মারা যাওয়া সবিতা রাণী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি’র) নওগাঁ জেলা শাখার নেতা সুজন কুমার মণ্ডলের মা। তিনি জেলার মহাদেবপুর উপজেলার অনন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা। শনিবার (১৮এপ্রিল) ভোরে এলাকার শ্বশানঘাটে তাকে দাহ করা হয়েছে বলে জানান ছেলে সুজন কুমার মন্ডল।
এদিকে এঘটনায় দোষীদের শাস্তির দাবিতে রবিবার (১৯ এপ্রিল) বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছেন বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি’র) নওগাঁ জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক দেওয়ান মাহবুব আল হাসান (সোহাগ)।
রোগীর স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার অসুস্থ অবস্থায় সুজন কুমার মণ্ডলের মাকে প্রথমে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে অক্সিজেন দেওয়ার পর তিনি কিছুটা সুস্থবোধ করেন। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাঁকে ৮ম তলার একটি কেবিনে ভর্তি করা হয়। সেখানে রক্ত দেওয়ার পর রোগীর শ্বাসকষ্ট শুরু হলে দায়িত্বরত একজন নার্স এসে মুখে অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে চলে যান।
স্বজনদের অভিযোগ, মাস্ক পরানোর ১০-১৫ মিনিট পর রোগী প্রচণ্ড ছটফট করতে শুরু করেন। তখন স্বজনরা খেয়াল করেন, কেবিনের লাইনে কোনো অক্সিজেন সরবরাহ নেই। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নার্সদের জানানো হলেও তাঁরা কোনো কর্ণপাত না করে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজবে ব্যস্ত ছিলেন। উল্টো স্বজনদের সাথে দুর্ব্যবহার করে বলেন, "আপনারা বেশি বোঝেন।" দীর্ঘ প্রায় ৪০-৪৫ মিনিট অক্সিজেনের অভাবে ছটফট করে সন্তানদের সামনেই ওই নারী শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
খবর পেয়ে হাসপাতালে উপস্থিত হন এনসিপির নেতা দেওয়ান মাহবুব আল হাসান সোহাগ। তাঁর উপস্থিতিতে পুনরায় আল্ট্রাসাউন্ড করানো হলে রোগীর মৃদু হার্টবিটের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তখন মুমূর্ষু অবস্থায় দ্রুত জরুরি বিভাগের চিকিৎসককে ডেকে আনার জন্য সেখানে কর্তব্যরত এক পুরুষ নার্সকে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু ওই নার্স চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বলেন, "আমার ডিউটি ৮ তলায়, আমি নিচে যেতে পারব না। আপনারা পারলে ডেকে আনেন।" পরবর্তীতে প্রতিবাদ ও চাপের মুখে ওই নার্স নিচে গিয়ে ইমার্জেন্সি ডাক্তার ডেকে আনেন। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে যায়। নিহতের শুভাকাঙ্ক্ষীরা এই ঘটনাকে 'সময়মতো চিকিৎসা না দেওয়া নয়, বরং অবহেলায় খুন' বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এনসিপির নেতা দেওয়ান মাহবুব আল হাসান সোহাগ বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের স্বজনদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, দায়িত্বরত নার্সরা সেবার চেয়ে অলস সময় কাটাতেই বেশি পছন্দ করেন। অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের মুমূর্ষু অবস্থায় ডাকলেও তাদের পাওয়া যায় না; এমনকি ডিউটি চলাকালীন তারা মোবাইল ফোনে টিকটক নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো অসহায় পরিবার অনিয়মের প্রতিবাদ করলে নার্সরা স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী যুবককে ডেকে এনে হুমকি প্রদান করেন। সুজন মণ্ডলের মায়ের ক্ষেত্রেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। সেখানে দায়িত্বরত এক ইন্টার্ন নার্স তাঁর পরিচিত একজনকে নিয়ে এসে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করে, তবে পরবর্তীতে প্রতিবাদের মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।
তিনি আরও জানান, নওগাঁ সদর হাসপাতালে অব্যবস্থাপনা, নার্সদের স্বেচ্ছাচারিতা এবং দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। কিছুদিন আগেই দালালদের খপ্পরে পড়ে এক ভুয়া ক্লিনিকে ভুয়া অপারেশনে রিয়া মুনি নামের এক অন্তঃসত্ত্বা মায়ের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। একের পর এক এমন ঘটনায় সাধারণ রোগীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাই এসব অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপচিকিৎসার প্রতিবাদে এবং অভিযুক্ত নার্সসহ সংশ্লিষ্ট স্টাফদের অপসারণের দাবিতে রবিবার সকাল ১০টায় নওগাঁ শহরের মুক্তির মোড়ে এক বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলের ডাক দেওয়া হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে নওগাঁর সকল স্তরের মানুষকে এই আন্দোলনে শরিক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এনসিপির নেতা সোহাগ বলেছেন, এই অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার শেষ না দেখে তারা মাঠ ছাড়বেন না এবং প্রয়োজনে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ভুক্তভোগী সুজন কুমার মন্ডল বলেন, মায়ের অবস্থা ক্রিটিক্যালই ছিল। তাই রক্ত দেওয়ার সময় মায়ের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তখন এক ইন্টার্নি ডাক্তার এসে রক্ত দেওয়া বন্ধ করে অক্সিজেন দিতে বলে। কিন্তু অক্সিজেন দিতে গেলে সাপ্লাই ছিলনা। আর এ রকম করতে করতে আমার মা বিকেলে সাড়ে ৫টার দিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এরপর আমাদের শান্তনা দিতে দেখানোর জন্য একটা সিলিন্ডার নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকেও অক্সিজেন সাপ্লাই হচ্ছিল না।
তিনি ক্ষোভ নিয়ে বলেন, আমরা ভিআইপি কেবিন নিয়েছিলাম। সেখানে সকল সুযোগ সুবিধা থাকার কথা ছিল। কিন্তু একটি বেড ছাড়া আর কিছুই ছিল না। সময়মতো অক্সিজেনসহ চিকিৎসা সেবা পেলে আমার মাকে হয়তো বাঁচানো সম্ভব হতো। আমার মা মারা গেছে এটা মেনে নিতেই হবে। কিন্তু এটার জন্য আমরা যে সাফার করছি, এটা যেন আর কেউ না করে। এবং আমি চাই ভবিষ্যতে যেন কারো সাথে অবহেলা করা না হয়। সেই জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিনিয়র ষ্টাফ নার্স মুনজিলা পারভীন মুঠোফোনে বলেন, তাদের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যে। আমরা অক্সিজেন নিয়ে যাওয়ার আগেই রোগীটি মারা যায়। আর রুমের ভিতর যে অক্সিজেন দেওয়া হয়েছিল, সেটা ভালো ছিল। তারা যখন যেটা বলেছে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। এবং সঙ্গে সঙ্গেই একজন আয়াকে দিয়ে ডাক্তার ডেকে আনা হয়েছিল।
সকল অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নওগাঁ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (সুপারিনটেনডেন্ট) ডাঃ আঃ মঃ আখতারুজ্জামান মুঠোফোনে বলেন, আমি যেহেতু ওখানে ছিলাম না, কাজেই সঠিক ঘটনা বলা যাচ্ছেনা। তাই তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। তদন্তের পর জানা যাবে আসল ঘটনা। তাছাড়া একপক্ষের কথা শুনে সব বিশ্বাস করার উপায় নেই। কারণ এক মিনিট দেরি হলেই অনেকে অনেক কথাই বলে। আর বাহির থেকে রোগীদের লোকও তো আসে।