প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৬, ২০২৬, ৮:৫৫ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ মে ৩১, ২০২৬, ১২:৩৫ পি.এম

পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি: গাইবান্ধার পলাশবাড়ী পৌর জামায়াতের অফিস সেক্রেটারি ছামিউল ইসলামের (৩০) মৃত্যুকে ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
গত ২০ মে পান বাজারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সংঘর্ষে ইটের আঘাতে আহত হওয়ার ১০ দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার (৩০ মে) ভোর রাতে রংপুরের ডক্টরস ক্লিনিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
ছামিউলের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে পলাশবাড়ীতে শোকের ছায়া নেমে আসে। শনিবার সকালে তার মরদেহ পৌরসভার সিধনগ্রামস্থ নিজ বাড়িতে পৌঁছালে হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শেষবারের মতো একনজর দেখতে শত শত মানুষ তার বাড়িতে ভিড় করেন। শুধু জামায়াতের নেতাকর্মীরাই নন, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষও সেখানে উপস্থিত হন।
যোহর নামাজের পর নিজ বাড়িতে অনুষ্ঠিত জানাজায় অংশগ্রহণ করেন গাইবান্ধা জেলা জামায়াতের আমির ও গাইবান্ধা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল করিম, গাইবান্ধা-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল কাওছার মো. নজরুল ইসলাম (লেবু), জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা জহুরুল হকসহ জেলা, উপজেলা ও পৌর জামায়াতের নেতৃবৃন্দ।
জানাজা শেষে মরদেহ দাফনের প্রস্তুতি চলাকালে পুলিশ আপত্তি জানায়। কারণ, সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার ভিকটিম ছামিউল মৃত্যুবরণ করায় পুলিশ ময়নাতদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা জানায়। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে ময়নাতদন্ত না করার অনুরোধ জানানো হয়।
এ নিয়ে পুলিশ, নিহতের পরিবার এবং জামায়াত নেতাদের মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে কোনো অভিযোগ নেই মর্মে মুচলেকা প্রদান করা হলে পুলিশ দাফনের অনুমতি দেয়। ফলে জানাজার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর পারিবারিক কবরস্থানে ছামিউল ইসলামের দাফন সম্পন্ন হয়।
ছামিউলের মৃত্যুর পর তার চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো ঘিরে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সচেতন মহলের মতে, ২০ মে থেকে ২৯ মে পর্যন্ত পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দফায় দফায় তাকে কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সংঘর্ষের দিন ২০ মে আহত অবস্থায় ছামিউলকে হাসপাতালে আনা হলে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়।
পরে ২৫ ও ২৬ মে একই কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে দুই দিন চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং চিকিৎসকরা তাকে সুস্থ উল্লেখ করে ছাড়পত্র দেন।
এর মাত্র দুই দিন পর, ২৯ মে তিনি পুনরায় অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে "মস্তিষ্কে ইনফেকশন" সন্দেহে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন।
পলাশবাড়ী হাসপাতাল থেকে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হলেও পরে তাকে রংপুর ডক্টরস ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাকে জ্বর ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়।
প্রশ্ন উঠেছে, যদি মস্তিষ্কের ইনফেকশনই মূল সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে রেফার্ডকৃত হাসপাতালে চিকিৎসা না নিয়ে কেন বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়া হলো? যদিও সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় আইসিইউ সুবিধা না পাওয়ায় তাকে ডক্টরস ক্লিনিকে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মামলা দায়েরের সময়কাল। সংঘর্ষের ঘটনার প্রায় নয় দিন পর, ২৯ মে থানায় মামলা দায়ের করা হয় বলে জানা যায়। তবে স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, মামলাটি প্রকৃতপক্ষে ৩০ মে ছামিউলের মৃত্যুর পর তড়িঘড়ি করে গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়েও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে।
ছামিউল ইসলামের মৃত্যু নিয়ে এখন পলাশবাড়ীর সর্বত্র চলছে নানা আলোচনা। কেউ বলছেন এটি সংঘর্ষজনিত আঘাতের জটিলতার ফল, কেউ প্রশ্ন তুলছেন চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে। আবার অনেকে মনে করছেন, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
সচেতন মহল মনে করেন, ঘটনাটির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে— সংঘর্ষের প্রকৃত ঘটনা, আহত হওয়ার ধরন, হাসপাতালের চিকিৎসা এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, এসব বিষয় স্বাধীনভাবে তদন্ত করা হলে জনমনে সৃষ্ট বিভ্রান্তি দূর হবে।