কায়সার রহমান রোমেল
আমাদের চারপাশের পানি, নদী ও পরিবেশ সংকটকে নতুনভাবে ভাবার এক প্ররোচনা জাহিদ হোসেন ফিরোজের 'জল ও জলাধার ভাবনার স্রোতধ্বনি' বইটি।
শুরুতেই বলা যায়, বইটি পাঠকের মনে প্রশ্ন তোলে- আমরা কি সত্যিই পানি ও নদীকে বুঝে উঠতে পেরেছি? নাকি কেবল ব্যবহার করেছি, শাসন করেছি আর ধীরে ধীরে সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছি?
জাহিদ হোসেন ফিরোজের লেখক হয়ে ওঠার গল্পও কম আকর্ষণীয় নয়। গাইবান্ধা সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনেই তার বিজ্ঞানমনস্কতা ও অনুসন্ধিৎসু মনোভাবের পরিচয় মেলে। জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহে জেলা পর্যায়ে সাফল্য, এরপর প্রকৌশল শিক্ষা, পরিবেশ বিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি- সব মিলিয়ে তার চিন্তার ভিত্তি তৈরি হয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও একাডেমিক জ্ঞানের সংমিশ্রণে। পেশাগত জীবনে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা বইটির বিশ্লেষণকে করেছে আরও পরিপক্ব ও তথ্যনির্ভর।
১১২ পৃষ্ঠার এই বইয়ে মোট আঠারোটি অনুচ্ছেদের মাধ্যমে পানি, নদী, পরিবেশ ও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। বিষয়বস্তুর বিস্তৃতি যেমন বড়, তেমনি তার গভীরতাও লক্ষণীয়। “পানি ও জীবন” থেকে শুরু করে “ভূগর্ভস্থ পানির সংকট”, “পানি দূষণ”, “আন্তর্জাতিক নদী আইন”- প্রতিটি অধ্যায় যেন একটি আলাদা দৃষ্টিকোণ খুলে দেয়।
বইটির একটি বড় শক্তি হলো- এটি কেবল তথ্য দেয় না, চিন্তা জাগায়। উদাহরণস্বরূপ, নদীকে কেন্দ্র করে সভ্যতার বিকাশ নিয়ে আলোচনা যেমন রয়েছে, তেমনি আছে নদীর ভাঙন-গড়নের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। আবার সাহিত্যের ভেতর দিয়ে নদী ও পানির প্রতিফলনও তুলে ধরা হয়েছে। ফলে বইটি একই সঙ্গে বিজ্ঞান, সমাজ ও সংস্কৃতির এক আন্তঃসম্পর্কিত পাঠ হয়ে ওঠে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, লেখক পানি সংকটকে কেবল প্রাকৃতিক সমস্যা হিসেবে দেখেননি বরং এটিকে অর্থনীতি, রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। “হাইড্রো-পলিটিক্স” প্রসঙ্গে তার আলোচনা বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পানি নিয়ে বিরোধ, নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, আন্তঃসীমান্ত পানি বণ্টন- এসব বিষয় আমাদের মতো নদীমাতৃক দেশের জন্য শুধু তাত্ত্বিক নয়, বাস্তব চ্যালেঞ্জ।
বইটিতে নদী দূষণ ও পানির অপচয় নিয়ে যে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে নদীগুলো যেভাবে বিপন্ন হয়ে পড়ছে, তার একটি স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে এখানে। একই সঙ্গে সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে- সুশাসন, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব।
লেখকের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো- নদী কেবল একটি ভৌগোলিক সত্তা নয়, এটি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অংশ। নদীর নামকরণ থেকে শুরু করে তার তীরবর্তী মানুষের জীবনযাপন- সবকিছুই একটি গভীর মানবিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বইটিকে কেবল গবেষণাধর্মী নয়, মানবিক অনুভূতিতেও সমৃদ্ধ করেছে।
ঘাঘট নদীকে কেন্দ্র করে এক নারীর জীবনগল্প কিংবা কৃষিতে সেচের গুরুত্ব- এ ধরনের স্থানীয় উদাহরণ বইটিকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। এতে পাঠক শুধু তত্ত্ব ও তথ্য নয়, বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ খুঁজে পান।
বইটির ভাষা সহজ, প্রাঞ্জল এবং বিশ্লেষণধর্মী। ফলে নীতিনির্ধারক, গবেষক কিংবা সাধারণ পাঠক- সবাই নিজের মতো করে বইটি গ্রহণ করতে পারবেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের পানি নীতি, আইন এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তার অবস্থান নিয়ে আলোচনা বইটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ‘জল ও জলাধার ভাবনার স্রোতধ্বনি’ এমন একটি বই, যা আমাদের সময়ের একটি জরুরি বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে। পানি যে শুধু জীবনধারণের উপাদান নয় বরং সভ্যতার ভিত্তি, সংস্কৃতির ধারক এবং রাজনীতির অংশ- এই উপলব্ধি বইটি পাঠককে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের একটি গবেষণাধর্মী ও বিশ্লেষণমূলক কাজ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। বলা যায়, পানি ও নদী নিয়ে ভাবুক-চিন্তক, গবেষক কিংবা সচেতন নাগরিক- সবার জন্যই এই বইটি একটি প্রয়োজনীয় পাঠ।
জাহিদ হোসেন ফিরোজের ‘জল ও জলাধার ভাবনার স্রোতধ্বনি’ বইটি পড়া শেষে যে অনুভূতি তৈরি হয়, তা এককথায় ইতিবাচক হলেও নিঃসন্দেহে কিছু প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে। কারণ, পানি, নদী ও পরিবেশ নিয়ে সমকালীন বাংলাদেশে যে জটিল বাস্তবতা, সেটিকে বিশ্লেষণধর্মীভাবে ধরার চেষ্টা যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি এর সীমাবদ্ধতা নিয়েও আলোচনা জরুরি।
বইটির একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো- এটি অনেক ক্ষেত্রে বিশ্লেষণের গভীরতায় গেলেও, সমাধানের জায়গায় তুলনামূলকভাবে সাধারণ বা পুনরাবৃত্তিমূলক প্রস্তাবনায় সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। যেমন পানি দূষণ বা ভূগর্ভস্থ পানির সংকট নিয়ে আলোচনা থাকলেও বাস্তবায়নযোগ্য, স্থানীয় বাস্তবতায় প্রয়োগযোগ্য নীতিগত রূপরেখা আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা যেত। নীতিনির্ধারকদের জন্য বইটি উপযোগী বলা হলেও, সেই নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সরাসরি ব্যবহারযোগ্য টুল বা কাঠামো কিছু ক্ষেত্রে অনুপস্থিত মনে হয়।
বইটির আরেকটি দিক হলো- তথ্য ও বিশ্লেষণের মধ্যে ভারসাম্য সব জায়গায় সমানভাবে বজায় থাকেনি। কিছু অধ্যায়ে তথ্যের ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি হলেও, উৎস বা রেফারেন্স উল্লেখের অভাব পাঠকের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেহেতু এটি একটি গবেষণাধর্মী কাজ হিসেবে বিবেচিত হতে চায়, তাই তথ্যসূত্র, ডাটা উপস্থাপন কিংবা গ্রাফিক্যাল বিশ্লেষণ আরও সুসংগঠিত হলে বইটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ত।
ভাষা ও উপস্থাপনার দিক থেকেও কিছু সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ে। লেখকের ভাষা অনেক ক্ষেত্রে প্রাঞ্জল হলেও কিছু অধ্যায়ে তা অতিরিক্ত একাডেমিক হয়ে গেছে, যা সাধারণ পাঠকের জন্য পড়তে কিছুটা জটিল মনে হতে পারে। আবার কিছু জায়গায় একই ধরনের বক্তব্য পুনরাবৃত্ত হয়েছে, যা সম্পাদনার ক্ষেত্রে আরও সংক্ষিপ্ত ও সংহত করা যেত।
বইটির কাঠামোগত দিকেও উন্নতির সুযোগ রয়েছে। আঠারোটি অনুচ্ছেদে বিষয়গুলো ভাগ করা হলেও অধ্যায়গুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ আরও দৃঢ় করা যেত। অনেক সময় এক অধ্যায় থেকে অন্য অধ্যায়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটির স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা কিছুটা বিচ্ছিন্ন মনে হয়। ফলে পাঠককে বিষয়ান্তরের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাড়তি মনোযোগ দিতে হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- স্থানীয় বাস্তবতা বনাম বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের ভারসাম্য। লেখক আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন, যা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট নদী, অঞ্চল বা সংকটের কেস স্টাডি আরও বিস্তৃতভাবে যুক্ত হলে বইটি আরও বাস্তবমুখী এবং নীতিগত আলোচনায় কার্যকর হতো। যেমন ঘাঘট নদীর প্রসঙ্গ এসেছে, কিন্তু এ ধরনের স্থানীয় উদাহরণ আরও বাড়ানো গেলে পাঠকের সঙ্গে সংযোগ আরও গভীর হতে পারত।
তবুও সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বইটির গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এটি পানি ও পরিবেশ নিয়ে জনসচেতনতা তৈরির একটি প্রয়াস, যা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বিশেষ করে তরুণ গবেষক, শিক্ষার্থী এবং সচেতন নাগরিকদের জন্য এটি একটি চিন্তার খোরাক জোগায়। নদী, পানি ও পরিবেশকে কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ নয় বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি বইটি তৈরি করে, সেটিই এর সবচেয়ে বড় শক্তি।
সবশেষে বলা যায়, ‘জল ও জলাধার ভাবনার স্রোতধ্বনি’ একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ- যেখানে শক্তি ও সীমাবদ্ধতা পাশাপাশি অবস্থান করছে। ভবিষ্যতে লেখক যদি আরও গভীর গবেষণা, তথ্যনির্ভরতা এবং বাস্তবমুখী সমাধানকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেন, তবে এ ধারার লেখালেখি বাংলাদেশে পানি ও পরিবেশ ভাবনায় আরও সমৃদ্ধ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক :- এম আবদুস্ সালাম । নির্বাহী সম্পাদক:- আফতাব হোসেন। সম্পাদকীয় কার্যালয়:- দুই নং রেলগেট, গাইবান্ধা। ঢাকা অফিস : হাউস#৯৫/A, রোড #৪ ব্লক-F বনানী ঢাকা ১২১৩ মোবাইল :- ০১৭১৩৪৮৪৬৪৭
ই পেপার