সম্পাদকীয়: বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা আজ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। দারিদ্র্য হ্রাস, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ বিকাশে দেশের অর্জন উল্লেখযোগ্য। তবে এই অগ্রগতির ভেতরেও একটি বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরে রয়ে গেছে—আঞ্চলিক উন্নয়ন বৈষম্য। উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগ সেই বৈষম্যের অন্যতম প্রধান প্রতিফলন।
Bangladesh Bureau of Statistics-এর বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ইঙ্গিত করে যে জাতীয় গড়ের তুলনায় এই অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার বেশি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থাকা সত্ত্বেও আধুনিকায়নের অভাব, শিল্পায়নের ধীরগতি এবং বিনিয়োগ ঘাটতির কারণে রংপুর এখনো তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারেনি।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডঃ রাশেদ আল মাহমুদ তীতুমীর-এর উদ্যোগে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভাগুলো এই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। “সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং শিল্পায়ন সম্ভাবনা” শীর্ষক এসব আলোচনায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন পক্ষের অভিমত এক জায়গায় মিলেছে—রংপুরকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই।
রংপুর অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। আলু, ভুট্টা, ধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনে এই অঞ্চল দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। ফলে কৃষি খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
অন্যদিকে শিল্পায়নের ঘাটতি এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর বন্ধ হয়ে আছে—যেমন রংপুর চিনিকল। নতুন শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কর্মসংস্থানের অভাবে তরুণরা রাজধানী কিংবা বিদেশমুখী হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
এই বাস্তবতায় রংপুরের উন্নয়নে প্রয়োজন একটি লক্ষ্যভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত কৌশল। প্রথমত, বন্ধ শিল্পকারখানাগুলোর পুনরুজ্জীবন এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের ওপর জোর দিতে হবে। আলু, ভুট্টা ও অন্যান্য কৃষিপণ্যভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলে স্থানীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী ভ্যালু চেইন তৈরি হবে, যা অর্থনীতিকে গতিশীল করবে।
দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তুলনামূলক কম বিনিয়োগে অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ থাকায় এই খাত রংপুরের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। বিসিক শিল্পনগরীগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকা অঞ্চলকে সমান নীতিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই রংপুর বিভাগকে বিশেষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে ‘ইতিবাচক বৈষম্য’ভিত্তিক উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। শিল্প স্থাপনে কর-সুবিধা, সহজ ঋণ, দ্রুত অনুমোদন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এক্ষেত্রে অপরিহার্য।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগে অগ্রাধিকার, উন্নত যোগাযোগ অবকাঠামো এবং একটি কার্যকর ‘one-stop service’ চালু করা প্রয়োজন, যাতে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত ও হয়রানিমুক্তভাবে সেবা পেতে পারেন। প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতা দূর না করলে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন হবে।
দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারিগরি শিক্ষা, ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ এবং শিল্পের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা এবং অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি করা জরুরি।
সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ আশার সঞ্চার করেছে। নীতিনির্ধারকরা রংপুরের উন্নয়ন বৈষম্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন—এটি ইতিবাচক লক্ষণ। তবে এই উদ্যোগ যেন কেবল আলোচনা বা পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; প্রয়োজন সময়সীমাবদ্ধ, জবাবদিহিমূলক এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।
দীর্ঘদিন ধরে রংপুরকে ‘পিছিয়ে পড়া অঞ্চল’ হিসেবে দেখা হয়েছে। এখন সময় এসেছে এই ধারণা বদলানোর। সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং নীতিগত সহায়তা পেলে এই অঞ্চলই দেশের কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
রংপুরের উন্নয়ন আর কেবল একটি আঞ্চলিক দাবি নয়—এটি এখন জাতীয় অগ্রগতির পূর্বশর্ত। সমতাভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে রংপুরকে অগ্রাধিকার দিয়েই এগিয়ে নিতে হবে। সময় এখনই—নীতিগত স্বীকৃতিকে বাস্তব অগ্রগতিতে রূপ দেওয়ার।
প্রকাশক ও সম্পাদক :- এম আবদুস্ সালাম । নির্বাহী সম্পাদক:- আফতাব হোসেন। সম্পাদকীয় কার্যালয়:- দুই নং রেলগেট, গাইবান্ধা। ঢাকা অফিস : হাউস#৯৫/A, রোড #৪ ব্লক-F বনানী ঢাকা ১২১৩ মোবাইল :- ০১৭১৩৪৮৪৬৪৭
ই পেপার