
কায়সার রহমান রোমেল
২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী গাইবান্ধা জেলার মোট জনসংখ্যা ২৫ লাখ ৬২ হাজার ২৩৩ জন, যার মধ্যে পুরুষ ১২ লাখ ৪১ হাজার ১৪৫ জন, নারী ১৩ লাখ ২০ হাজার ৯৬৭ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গ ১৫৩ জন। একই শুমারিতে জাতীয়ভাবে মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশকে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সি প্রবীণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই জাতীয় গড় অনুপাত ধরে হিসাব করলে গাইবান্ধা জেলায় প্রবীণদের সংখ্যা দাঁড়ায় আনুমানিক ২ লাখ ৩৭ থেকে ২ লাখ ৩৮ হাজারের কাছাকাছিÑ অর্থাৎ জেলার প্রতি ১০ জনের একজনই এখন প্রবীণ বয়সের সীমানায় পৌঁছে গেছেন, যাদের একটি বড়ো অংশ কাটাচ্ছেন নিরাপত্তাহীন জীবন।
দেশের সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ প্রবীণ নাগরিক রয়েছেন, যা ২০৫০ সাল নাগাদ সাড়ে ৪ কোটিতে গিয়ে পৌঁছাবে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ পেনশন সুবিধা ভোগ করেনÑ বাকিদের বেঁচে থাকার ভরসা হয় নিজস্ব সঞ্চয়, নয়তো সন্তানের ওপর নির্ভরতা। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক জরিপ বলছে, গ্রামবাংলায় দুই-তৃতীয়াংশের মতো প্রবীণ দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করেন, যাদের নিজস্ব সহায়-সম্বল বলতে তেমন কিছুই নেই। জাতীয়ভাবে প্রায় ৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশ প্রবীণের নিজস্ব কোনো আয়ের উৎস নেই, প্রায় ৪১ দশমিক ৬৭ শতাংশ পরিবারে উপেক্ষিত বা অবহেলার শিকার, আর মোট প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ১০ শতাংশ ভবঘুরে বা বাস্তুচ্যুত জীবন কাটাচ্ছেন।
সাতশ টাকার ভাতায় চলে না জীবন
সরকার বর্তমানে দেশের ৬২ লাখ প্রবীণকে মাসে ৭০০ টাকা হারে ভাতা দিচ্ছেÑ তিন মাস পরপর মোবাইলে পাঠানো হয় ২,১০০ টাকা করে, যার জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫,২৪০ কোটি টাকা। গাইবান্ধার গ্রামীণ এলাকায় এই ক্ষুদ্র অর্থটুকুই অনেক প্রবীণের ওষুধ কেনা আর মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর একমাত্র সম্বল। বছর কয়েক আগেও এই ভাতার হার ছিল মাসিক মাত্র ৫০০ টাকাÑ বাজারমূল্য ও স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের বিপরীতে, যা একজন সহায়-সম্বলহীন প্রবীণের জীবনধারণের জন্য প্রায় অর্থহীন ছিল। হার বাড়লেও বাস্তবতা খুব একটা বদলায়নি।
এই সামান্য ভাতার টাকাকে কেন্দ্র করেও গ্রামীণ সমাজে দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ অপরাধ। গোবিন্দগঞ্জে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনায় দেখা গেছে, দাদি প্রতিমা বালার (৬০) মোবাইলে আসা ভাতার টাকা ও সিম কার্ড হাতিয়ে নিতে তাঁরই ১৫ বছর বয়সি নাতি ও আরেক তরুণ পরিকল্পনা করে ১১ বছরের শিশু জিৎচন্দ্র বাদ্যকরকে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখে নদীতীরবর্তী ভুট্টাখেতে। জিৎচন্দ্র বাদ্যকর ছিল স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। সে তার নানি প্রতিমা বালার সেই মুঠোফোনটি ব্যবহার করত, যাতে সরকারি বয়স্ক ভাতার টাকা আসত। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ঘটে যাওয়া এই নৃশংস অপরাধের মূল কারণ ছিল, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আসা বয়স্ক ভাতার সামান্য কিছু টাকা এবং সিম কার্ড হাতিয়ে নেওয়া। এই ঘটনা প্রমাণ করে, চরম দারিদ্র্য কীভাবে প্রান্তিক পরিবারগুলোকে ঠেলে দিচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের দিকে।
নদী যখন কেড়ে নেয় শেষ সম্বলটুকুও
গাইবান্ধার বুক চিরে বয়ে যাওয়া তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর অবিরাম ভাঙন চরাঞ্চল ও নদীকূলের প্রবীণদের জীবনকে ফেলে দিয়েছে চিরস্থায়ী অনিশ্চয়তার মুখে। বর্ষায় পানি বাড়া-কমার সঙ্গে আচমকা শুরু হওয়া ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে সহস্রাধিক পরিবার। জীবনের এই বয়সে এসে বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষগুলোর সামনে থাকে না নতুন ঘর তোলার সামর্থ্য। ফুলছড়ি উপজেলার চৌমোহন চর, কাপাসিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম কিংবা সদর উপজেলার মোল্লারচর ও সিধাইল এলাকায় শত শত বিঘা ফসলি জমির সঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে প্রবীণদের শেষ অবলম্বনও। দক্ষিণ রসুলপুর গ্রামের ৫২ বছর বয়সি আফরুজা বেগম বা উজালডাঙা চরের বৃদ্ধ রোস্তম আলীর অভিজ্ঞতা বলে, নদীর আকস্মিক ভাঙনে ঘরবাড়ি সরানোর সময়টুকুও মেলে নাÑ বাঁধের ধারে টিনের ঝুপড়ি তুলে এই বয়সেও আবার শুরু করতে হয় যাযাবর জীবন।
নদীভাঙন শুধু ঘরবাড়ি কাড়েনি, কেড়েছে জীবিকার পথও। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ায় ঐতিহ্যবাহী গরু-লাঙলনির্ভর চাষাবাদ থেকে ছিটকে পড়েছেন অনেক প্রবীণ কৃষক। অন্যদিকে গাইবান্ধার ২৫০ শয্যার হাসপাতাল চলছে মাত্র ১০০ শয্যার জনবল দিয়ে, ফলে বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভোগা প্রবীণরা পাচ্ছেন না উন্নত জেরিয়াট্রিক সেবা। এই সংকট বিচ্ছিন্ন কোনো চিত্র নয়Ñ আইসিডিডিআরবি’র এক গবেষণা বলছে, দেশের প্রতি পাঁচজন প্রবীণের চারজনই অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ডিমেনশিয়া ও বিষণ্ণতার মতো অসংক্রামক রোগে ভুগছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক গবেষণা অনুযায়ী, দেশের প্রবীণদের এক-চতুর্থাংশ অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে ২৫ জন পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন, আর পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে আছেন ৬৫ দশমিক ৩ শতাংশ। আয়ের পথ বন্ধ, স্বাস্থ্যসেবাও অপ্রতুল, তার ওপর রোগ-শোকের এই বহুমাত্রিক চাপÑ সব মিলিয়ে চরাঞ্চলের প্রবীণ সমাজ চলে যাচ্ছে গভীর মানবিক বিপর্যয়ের দিকে।
যেখানে সন্তান নেই, সেখানে ঠাঁই দিয়েছেন অচেনা তরুণেরা
দারিদ্র্য আর যৌথ পরিবারের দ্রুত ভাঙনের কারণে উত্তরাঞ্চলে অনেক প্রবীণ বাবা-মায়ের ঠাঁই হচ্ছে না নিজের পরিবারেই। পরিবার পরিকল্পনার কল্যাণে সন্তানসন্ততির সংখ্যা এক-দুইয়ে নেমে আসা, অভিবাসন, নারীশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বেড়ে যাওয়ায় সন্তানেরা এখন মা-বাবাকে একাকী রেখে দূরে চলে যাচ্ছেন। শারীরিক অবনতি, প্রিয়জন বিয়োগ আর নিউক্লিয়ার বা একক পরিবারের নতুন ধারায় সন্তান-নাতি-নাতনির সঙ্গসুখ থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রবীণরা হয়ে পড়েন গভীরভাবে নিঃসঙ্গ।
গাইবান্ধা শহর থেকে ২৭ কিলোমিটার দূরে, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ী ইউনিয়নের ছোট সোহাগি গ্রামে ২০১৭ সালে স্বেচ্ছাশ্রমে গড়ে তোলা হয়েছে ‘মেহেরুননেছা বৃদ্ধাশ্রম’। স্থানীয় তরুণ আপেল মাহমুদ ও তাঁর কয়েকজন সহপাঠী নিজেদের পড়াশোনা আর ব্যবসার খরচ বাঁচিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন এই প্রবীণ নিবাস, যেখানে বর্তমানে আশ্রয় নিয়েছেন ৪২ থেকে ৪৫ জন গৃহহীন ও স্বজনদের দ্বারা উপেক্ষিত নারী-পুরুষ।
এই আশ্রমে থাকা প্রবীণদের জীবনকাহিনি একেকটা বিচ্ছিন্নতার দলিল। চক বিরাহিমপুরের ভসি মামুদ, বয়স আনুমানিক ১০৩ থেকে ১০৮ বছরÑ চোখের অস্ত্রোপচারের পর বিশ্রামে থাকাকালে কাজ করতে না পারার অভিযোগে ছেলের বউয়ের কাছ থেকে অপমানিত হয়ে গৃহত্যাগ করেছিলেন। কালিডোবার আশি ছুঁইছুঁই জবেদ আলীকে ছেলেরা বাড়ি থেকে বের করে দিলে রাস্তায় ঘুরে নিঃস্ব অবস্থায় ঠাঁই পান আশ্রমে, পরে সেখানেই হারান স্ত্রীকে। সমসপাড়ার সত্তরোর্ধ্ব আজিজার রহমান সন্তানরা খোঁজ না নেওয়ায় দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন ভিক্ষাবৃত্তি করে। একই গ্রামের ষাট বছর বয়সি সোনা ভান বেওয়ার স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলেরা বন্ধ করে দেয় অন্নসংস্থান; অন্যের বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে পা ভাঙলে তিনিও ঠাঁই নেন আশ্রমে। তরুণ স্বেচ্ছাসেবক ও পারস্পরিক স্নেহে অন্ন-বস্ত্রের ব্যবস্থা হলেও উৎসবের দিনগুলোতে সন্তানদের শূন্যতার কান্না থামে না তাঁদের।
আইন আছে, প্রয়োগ নেই
প্রবীণদের অধিকার সুরক্ষায় ২০১৩ সালে পাস হয়েছিল ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’, যেখানে সামর্থ্যবান সন্তানের জন্য পিতা-মাতার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও সঙ্গ দেওয়া বাধ্যতামূলক এবং লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা বা তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু গাইবান্ধার মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথাÑ সন্তানস্নেহ, সামাজিক লোকলজ্জা আর আইনি জটিলতার ভয়ে কোনো প্রবীণই নিজ সন্তানদের বিরুদ্ধে থানা বা আদালতের দ্বারস্থ হতে রাজি হন না। ফলে কাগজে-কলমে থাকা এই সুরক্ষা বাস্তবে কোনো ফল দিতে পারছে না।
শুধু দিবস পালনেই থেমে থাকলে চলবে না
গাইবান্ধার প্রায় আড়াই লাখ প্রবীণের জীবনমান বদলাতে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বয়স্ক ভাতা আরও বাড়ানো, তালিকা থেকে অনিয়ম দূর করে প্রকৃত প্রবীণদের চিহ্নিত করা, আর মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে ভাতা সময়মতো পৌঁছানো জরুরি। নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত প্রবীণদের আবাসন প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে জেরিয়াট্রিক চিকিৎসা ইউনিট চালু করা এবং ‘মেহেরুননেছা বৃদ্ধাশ্রম’-এর মতো উদ্যোগকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনাও এখন সময়ের দাবি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রবীণ নিবাসই সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হতে পারে, যেখানে খাদ্য ও পুষ্টি, পেশাগত চিকিৎসা-পরিচর্যা, সাহচর্য ও সামাজিক যোগাযোগ থাকে হাতের নাগালেÑ বিশেষ করে ৮০ বছরের ঊর্ধ্বে বা মারাত্মক অসুস্থতায় শয্যাশায়ী প্রবীণদের জন্য এটি হতে পারে ন্যূনতম নিশ্চয়তার ব্যবস্থা। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেও এ ধরনের পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন প্রবীণনিবাস গড়ে তোলা জরুরি। এর পাশাপাশি পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন নিয়ে গ্রামীণ জনপদে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে প্রবীণ কল্যাণ সেল গড়ে তোলা গেলে, গাইবান্ধার প্রবীণদের জন্য একটি সম্মানজনক, সুরক্ষিত জীবন নিশ্চিত করা এখনো সম্ভব।
কায়সার রহমান রোমেল, লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী

Reporter Name 








