
নওগাঁ প্রতিনিধি: এইচএসসি, এইচএসসি (ভোকেশনাল) ও আলিম পরীক্ষার ফলাফলে নওগাঁ জেলায় সামগ্রিকভাবে পাসের হার ৬৫ শতাংশের বেশি হলেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফলে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। শতভাগ অকৃতকার্যের এমন ঘটনায় জেলার শিক্ষাঙ্গনে উদ্বেগ ও আলোচনা সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা শিক্ষা অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের এইচএসসি, এইচএসসি (ভোকেশনাল) ও আলিম পরীক্ষায় নওগাঁ জেলার মোট পরীক্ষার্থী ছিল ২০ হাজার ৭৮০ জন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১৩ হাজার ৪৮৪ জন। তিনটি ধারার পরীক্ষায় অংশ নেয় জেলার ৩৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সাধারণ এইচএসসি শাখায় ২৫৯টি কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ভোকেশনাল শাখায় ২৪টি এবং আলিম শাখায় ৪৯টি মাদ্রাসা রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাধারণ এইচএসসি শাখায় ১৬ হাজার ৫৬৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১০ হাজার ৮৯৬ জন। এ শাখায় পাসের হার ৬৫ দশমিক ৮০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯০ জন।
এইচএসসি (ভোকেশনাল) শাখায় ১ হাজার ৯৮৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১ হাজার ৬২ জন। এ শাখায় পাসের হার ৫৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র একজন।
অন্যদিকে, আলিম পরীক্ষায় ২ হাজার ২৩০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১ হাজার ৫২৬ জন। এ শাখায় পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৪ জন।
জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, নওগাঁর বিভিন্ন উপজেলার ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো,
রামচন্দ্রপুর বাহালুল উলুম আলিম মাদ্রাসা, মহাদেবপুর, আরিফ মেমোরিয়াল কলেজ, মহাদেবপুর, হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) আলিম মাদ্রাসা, পোরশা, রাজাপুর বটতলী হাট মহাবিদ্যালয়, নিয়ামতপুর, সাঁওতাল আদিবাসী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নিয়ামতপুর, বড়থল বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ, রাণীনগর, শহীদ আব্দুল জব্বার মঙ্গলবাড়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, ধামইরহাট, পত্নীতলা সরকারি টেকনিক্যাল কলেজ, পত্নীতলা, মান্দা শ্যাম চাঁদের মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, মান্দা, ঘোনা আদর্শ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, মান্দা, এবং সোনাডাঙ্গা মহিলা বি.এম. অ্যান্ড টেকনিক্যাল কলেজ, আত্রাই।
পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয়ে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি উদ্বেগে পড়েছেন অভিভাবকরাও। নওগাঁ শহরের খলিফাপাড়া মহল্লার বাসিন্দা জাহিদুল হক বলেন, আমার মেয়ে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হবে, তা আমরা কল্পনাও করিনি। সন্তানের এমন ফলাফলে পুরো পরিবার ভেঙে পড়েছে। এখন তার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা ভেবে কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছি না।
তিনি আরও বলেন, শুনেছি, সরকার এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেবে। এমন সুযোগের কথা শুনে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি। অন্তত এতে সন্তানের একটি বছর নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কমবে। এখন মেয়েকে নতুন করে প্রস্তুত করার চেষ্টা করছি। তাকে মানসিকভাবে শক্ত রেখে আবারও ভালো ফল করার জন্য উৎসাহ দিচ্ছি।
নওগাঁ শহরের উকিলপাড়া এলাকার আরেক পরীক্ষার্থীর বাবা জুলফিকার হোসেন বলেন, এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কঠোরতা ছিল বলে তাঁর মনে হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতিকেও ফলাফল খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। তার মতে, পড়াশোনায় পর্যাপ্ত মনোযোগ ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ঘাটতি থাকায় অনেক শিক্ষার্থীর ফল আশানুরূপ হয়নি।
নওগাঁর মান্দা উপজেলার চকউলি ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক বেলাল হোসাইন বলেন, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার তুলনায় মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি আসক্তি বেশি লক্ষ্য করা গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তাদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে। ফলে প্রত্যাশিত মানের প্রস্তুতি নিতে না পারায় পরীক্ষার ফলাফলেও এর প্রতিফলন ঘটেছে। অন্যদিকে, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্রে প্রদত্ত উত্তরের যথার্থতা ও মান বিবেচনা করেই নম্বর দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
নওগাঁর ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শূন্য পাসের ফলাফল তাই কেবল একটি পরীক্ষার পরিসংখ্যান নয়বরং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মান, পাঠদান কার্যক্রম ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এ পরিস্থিতিতে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল ও শিক্ষাবিদরা
কথা হলে নওগাঁ সরকারি কলেজের অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে না পারা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি বড় ধাক্কা।
তিনি মনে করেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, পাঠদানের মান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তদারকি এবং সামগ্রিক শিক্ষা কার্যক্রমের কার্যকারিতা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ, নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, পাঠদানের মান এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

Reporter Name 








