Dhaka ০২:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
বীরমুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও ‎দাফনে বাধা দেয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন সুন্দরগঞ্জে ট্রাক-অটোভ্যান সংঘর্ষ: নিহত ২, আহত ১ ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাসাদের কাছে বিমান বিব্ধস্ত, পাইলটসহ সকল আরোহীর মৃত্যু সাঘাটায় জমি বিরোধে বিধবার ৪০টি গাছ নিধন, ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে আটক ১ জেলার ১১ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাস করেনি কেউ, ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ গাজীপুরে শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ, যানবাহন ভাঙচুর, ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন বাংলাদেশের চার সমুদ্রবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত বেতন বৃদ্ধির দাবিতে মিরপুরে পোশাক শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ, পুলিশেস সাথে সংঘর্ষ মার্কিন ডিভি লটারি চালুর নির্দেশ স্থগিত করলেন আপিল আদালত ব্রহ্মপুত্রের বুকে নৌকার পাটাতনে জন্ম নিলো ফুটফুটে কন্যাশিশু

কিশোর গ্যাং: পারিবারিক অবক্ষয়, সামাজিক সংকট ও প্রযুক্তির অপব্যবহারের অশনি সংকেত

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:৪৯:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
  • ৮০ Time View
লিপু রহমান
একটি শিশুর হাতে থাকার কথা বই, খাতা, ক্রিকেট ব্যাট কিংবা রঙ-পেনসিল। তার চোখে থাকার কথা ভবিষ্যতের স্বপ্ন। অথচ সেই হাতেই যখন উঠে আসে অস্ত্র, আর স্বপ্নের জায়গা দখল করে নেয় আধিপত্য, ভয় ও অপরাধ, তখন শুধু একজন কিশোরের জীবন নয়, প্রশ্নের মুখে পড়ে পুরো সমাজের ভবিষ্যৎ।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে পুলিশের তালিকা অনুযায়ী সারাদেশে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য এবং সাড়ে চার হাজারের বেশি সদস্যের কথা উঠে এসেছে। রাজধানীতেই রয়েছে ১৫৯টি গ্রুপ। কোথাও ছিনতাই, কোথাও চাঁদাবাজি, কোথাও মাদক, কোথাও আধিপত্য বিস্তার ও সংঘর্ষ। সংখ্যাগুলো তাই নিছক পরিসংখ্যান নয়; এগুলো আমাদের সামাজিক অসুখের দৃশ্যমান উপসর্গ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কিশোররা কেন গ্যাংয়ে জড়াচ্ছে? অপরাধের আগে তৈরি হয় এক শূন্যতা।একজন কিশোর হঠাৎ অপরাধী হয়ে ওঠে না। কৈশোর মানুষের জীবনের এমন একটি সময়, যখন সে নিজের পরিচয় খোঁজে, স্বীকৃতি চায়, বন্ধুত্ব চায় এবং নিজের গুরুত্ব অনুভব করতে চায়। পরিবার ও সমাজ যদি সেই প্রয়োজনকে সুস্থ পথে পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন ভুল মানুষ ও ভুল গোষ্ঠী সেই শূন্যস্থান দখল করে নেয়।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সহপাঠী গোষ্ঠীর প্রভাব কৈশোরে অত্যন্ত শক্তিশালী। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এটি সামাজিকীকরণের সংকট। আর বাস্তব জীবনে এর অর্থ খুব সহজ: যে কিশোর ঘরে নিজের কথা বলার মানুষ পায় না, সে অনেক সময় রাস্তার আড্ডায় নিজের পরিচয় খুঁজে নেয়। প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর দল, এরপর দলীয় শক্তির প্রদর্শন। ধীরে ধীরে ভয় দেখানো হয়ে ওঠে সাহস, অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে ওঠে ক্ষমতা, আর অপরাধ হয়ে ওঠে ‘স্মার্টনেস’-এর পরিচয়।
পরিবারে ভালোবাসার ঘাটতি, সময়ের অভাব
কিশোর গ্যাংয়ের উত্থানের সঙ্গে পারিবারিক অবক্ষয়ের সম্পর্ক অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সন্তানকে খাবার, পোশাক, মোবাইল কিংবা টাকা দেওয়া দায়িত্বের একটি অংশ; কিন্তু তাকে সময় দেওয়া, তার কথা শোনা, তার বন্ধুদের চেনা, তার মানসিক পরিবর্তন বুঝতে চেষ্টা করা এবং ভুল করলে অপমান না করে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া আরও বড় দায়িত্ব।
আজ অনেক পরিবারে বাবা-মা সন্তানকে ভালোবাসেন, কিন্তু সেই ভালোবাসার ভাষা অনেক সময় হয়ে যায় শুধু অর্থ ও প্রয়োজন পূরণ। একই ছাদের নিচে থেকেও সন্তান ও অভিভাবকের মধ্যে তৈরি হয় মানসিক দূরত্ব। সন্তানের হাতে দামি ফোন থাকে, কিন্তু কথা বলার মতো একজন মানুষ থাকে না। তার ঘরে ইন্টারনেট থাকে, কিন্তু মনের জানালা খুলে দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। এই শূন্যতা বিপজ্জনক। তবে পরিবারকেই একমাত্র দায়ী করলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। একটি শিশুকে পরিবার লালন করে, কিন্তু তাকে ঘিরে রাখে সমাজ।
প্রযুক্তি যখন অপরাধের প্রচারমাধ্যম
প্রযুক্তি আমাদের সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ। কিন্তু আশীর্বাদও অপব্যবহারে অভিশাপে পরিণত হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্র প্রদর্শন, মারামারির ভিডিও, প্রতিপক্ষকে হুমকি, গ্যাংয়ের নাম ও পরিচয়কে ‘ব্র্যান্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা কিংবা অপরাধকে সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন কিশোরদের মানসিক জগতে ভয়ংকর প্রভাব ফেলতে পারে।
একজন কিশোর যখন দেখে অপরাধের ভিডিওতে বন্ধুরা উচ্ছ্বসিত, মন্তব্যে প্রশংসা, আর অনুসারীরা বাড়ছে, তখন অপরাধ তার কাছে শুধু অপরাধ থাকে না; সেটি সামাজিক স্বীকৃতির মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। তাই সন্তানকে শুধু মোবাইল থেকে দূরে রাখলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তাকে শেখাতে হবে ডিজিটাল নৈতিকতা, তথ্যের সত্য-মিথ্যা যাচাই, অনলাইন আচরণের দায়িত্ব এবং প্রযুক্তির ব্যবহারে আত্মনিয়ন্ত্রণ।
কিশোরের পেছনে যদি বড় কেউ থাকে
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো কিশোরদের ব্যবহার করে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী বা প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ হাসিলের সম্ভাবনা। কোনো কিশোর যদি কারও নির্দেশে অপরাধে জড়ায়, তাহলে শুধু কিশোরকে আটক করে সমস্যার সমাধান করা যায় না। তাকে ব্যবহারকারী ব্যক্তিকেও শনাক্ত করতে হবে। কারণ একটি গ্যাং ভেঙে দিলে যদি তার জায়গায় আরেকটি গ্যাং তৈরি হয়, তাহলে বোঝা যায় আমরা রোগের উৎসে পৌঁছতে পারিনি। অপরাধের পৃষ্ঠপোষকতা, মাদক সরবরাহ, অস্ত্রের প্রবাহ এবং স্থানীয় ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ না করলে কিশোর গ্যাংয়ের শেকড় উপড়ে ফেলা কঠিন।
শাস্তি প্রয়োজন, কিন্তু পুনর্বাসনও জরুরি
আইনের প্রয়োগ অবশ্যই দরকার। সমাজের নিরাপত্তা রক্ষায় অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অপরিহার্য। কিন্তু কিশোর অপরাধীর ক্ষেত্রে শাস্তির পাশাপাশি সংশোধন ও পুনর্বাসনের পথও খোলা রাখতে হবে। খেলার মাঠ, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, বিতর্ক চর্চা, স্কাউটিং, কারিগরি শিক্ষা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে। স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদের ফিরিয়ে আনতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার কিশোরদের জন্য বিশেষ কাউন্সেলিং ও সামাজিক কর্মসূচি প্রয়োজন। একটি মাঠ কেবল মাঠ নয়; এটি অপরাধ থেকে দূরে থাকার একটি নিরাপদ জায়গা। একটি পাঠাগার শুধু বইয়ের ঘর নয়; এটি বিকল্প স্বপ্নের দরজা। একজন ভালো শিক্ষক কখনো কখনো একটি জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।
কিশোরকে হারালে ভবিষ্যৎকে হারাব
যে কিশোর আজ গ্যাংয়ে দাঁড়িয়েছে, সে জন্ম থেকেই অপরাধী ছিল না। কোনো একদিন তারও স্বপ্ন ছিল। মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার স্মৃতি ছিল, বাবার কাছে আবদার ছিল, পরীক্ষার খাতায় ভালো করার চেষ্টা ছিল। কোথাও গিয়ে সেই স্বপ্ন হারিয়েছে; তার জায়গা নিয়েছে ভুল বন্ধুত্ব, ক্ষোভ, একাকিত্ব, ক্ষমতার মোহ কিংবা অপরাধের প্রলোভন।
তাই প্রশ্ন শুধু হওয়া উচিত নয়, ‘সে কী অপরাধ করেছে?’

প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘কোন পথ ধরে সে এখানে এসে দাঁড়াল?’

কিশোর গ্যাং দমন তাই শুধু পুলিশের অভিযান নয়। এটি পরিবারকে ফিরিয়ে আনার লড়াই, শিক্ষাকে শক্তিশালী করার লড়াই, মাঠ ও সংস্কৃতিকে বাঁচানোর লড়াই, প্রযুক্তিকে মানবিক ব্যবহারে আনার লড়াই এবং মূল্যবোধকে পুনর্জাগরণের লড়াই।

আমাদের কিশোরদের হাতে অস্ত্র নয়, স্বপ্ন তুলে দিতে হবে। কারণ আজ যে হাতে আমরা বই তুলে দিতে পারব, আগামীকাল সেই হাতই দেশ গড়বে। আর যে হাতকে আমরা অবহেলায় অপরাধের দিকে ঠেলে দেব, একদিন সেই অপরাধের ছায়া আমাদের নিজেদের দরজাতেও এসে পড়বে। কিশোরকে বাঁচানো মানে শুধু একটি জীবন বাঁচানো নয়; একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি দেশের ভবিষ্যৎকে বাঁচানো।

লেখক: কবি 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

বীরমুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও ‎দাফনে বাধা দেয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন

কিশোর গ্যাং: পারিবারিক অবক্ষয়, সামাজিক সংকট ও প্রযুক্তির অপব্যবহারের অশনি সংকেত

Update Time : ১১:৪৯:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
লিপু রহমান
একটি শিশুর হাতে থাকার কথা বই, খাতা, ক্রিকেট ব্যাট কিংবা রঙ-পেনসিল। তার চোখে থাকার কথা ভবিষ্যতের স্বপ্ন। অথচ সেই হাতেই যখন উঠে আসে অস্ত্র, আর স্বপ্নের জায়গা দখল করে নেয় আধিপত্য, ভয় ও অপরাধ, তখন শুধু একজন কিশোরের জীবন নয়, প্রশ্নের মুখে পড়ে পুরো সমাজের ভবিষ্যৎ।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে পুলিশের তালিকা অনুযায়ী সারাদেশে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য এবং সাড়ে চার হাজারের বেশি সদস্যের কথা উঠে এসেছে। রাজধানীতেই রয়েছে ১৫৯টি গ্রুপ। কোথাও ছিনতাই, কোথাও চাঁদাবাজি, কোথাও মাদক, কোথাও আধিপত্য বিস্তার ও সংঘর্ষ। সংখ্যাগুলো তাই নিছক পরিসংখ্যান নয়; এগুলো আমাদের সামাজিক অসুখের দৃশ্যমান উপসর্গ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কিশোররা কেন গ্যাংয়ে জড়াচ্ছে? অপরাধের আগে তৈরি হয় এক শূন্যতা।একজন কিশোর হঠাৎ অপরাধী হয়ে ওঠে না। কৈশোর মানুষের জীবনের এমন একটি সময়, যখন সে নিজের পরিচয় খোঁজে, স্বীকৃতি চায়, বন্ধুত্ব চায় এবং নিজের গুরুত্ব অনুভব করতে চায়। পরিবার ও সমাজ যদি সেই প্রয়োজনকে সুস্থ পথে পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন ভুল মানুষ ও ভুল গোষ্ঠী সেই শূন্যস্থান দখল করে নেয়।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সহপাঠী গোষ্ঠীর প্রভাব কৈশোরে অত্যন্ত শক্তিশালী। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এটি সামাজিকীকরণের সংকট। আর বাস্তব জীবনে এর অর্থ খুব সহজ: যে কিশোর ঘরে নিজের কথা বলার মানুষ পায় না, সে অনেক সময় রাস্তার আড্ডায় নিজের পরিচয় খুঁজে নেয়। প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর দল, এরপর দলীয় শক্তির প্রদর্শন। ধীরে ধীরে ভয় দেখানো হয়ে ওঠে সাহস, অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে ওঠে ক্ষমতা, আর অপরাধ হয়ে ওঠে ‘স্মার্টনেস’-এর পরিচয়।
পরিবারে ভালোবাসার ঘাটতি, সময়ের অভাব
কিশোর গ্যাংয়ের উত্থানের সঙ্গে পারিবারিক অবক্ষয়ের সম্পর্ক অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সন্তানকে খাবার, পোশাক, মোবাইল কিংবা টাকা দেওয়া দায়িত্বের একটি অংশ; কিন্তু তাকে সময় দেওয়া, তার কথা শোনা, তার বন্ধুদের চেনা, তার মানসিক পরিবর্তন বুঝতে চেষ্টা করা এবং ভুল করলে অপমান না করে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া আরও বড় দায়িত্ব।
আজ অনেক পরিবারে বাবা-মা সন্তানকে ভালোবাসেন, কিন্তু সেই ভালোবাসার ভাষা অনেক সময় হয়ে যায় শুধু অর্থ ও প্রয়োজন পূরণ। একই ছাদের নিচে থেকেও সন্তান ও অভিভাবকের মধ্যে তৈরি হয় মানসিক দূরত্ব। সন্তানের হাতে দামি ফোন থাকে, কিন্তু কথা বলার মতো একজন মানুষ থাকে না। তার ঘরে ইন্টারনেট থাকে, কিন্তু মনের জানালা খুলে দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। এই শূন্যতা বিপজ্জনক। তবে পরিবারকেই একমাত্র দায়ী করলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। একটি শিশুকে পরিবার লালন করে, কিন্তু তাকে ঘিরে রাখে সমাজ।
প্রযুক্তি যখন অপরাধের প্রচারমাধ্যম
প্রযুক্তি আমাদের সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ। কিন্তু আশীর্বাদও অপব্যবহারে অভিশাপে পরিণত হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্র প্রদর্শন, মারামারির ভিডিও, প্রতিপক্ষকে হুমকি, গ্যাংয়ের নাম ও পরিচয়কে ‘ব্র্যান্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা কিংবা অপরাধকে সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন কিশোরদের মানসিক জগতে ভয়ংকর প্রভাব ফেলতে পারে।
একজন কিশোর যখন দেখে অপরাধের ভিডিওতে বন্ধুরা উচ্ছ্বসিত, মন্তব্যে প্রশংসা, আর অনুসারীরা বাড়ছে, তখন অপরাধ তার কাছে শুধু অপরাধ থাকে না; সেটি সামাজিক স্বীকৃতির মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। তাই সন্তানকে শুধু মোবাইল থেকে দূরে রাখলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তাকে শেখাতে হবে ডিজিটাল নৈতিকতা, তথ্যের সত্য-মিথ্যা যাচাই, অনলাইন আচরণের দায়িত্ব এবং প্রযুক্তির ব্যবহারে আত্মনিয়ন্ত্রণ।
কিশোরের পেছনে যদি বড় কেউ থাকে
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো কিশোরদের ব্যবহার করে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী বা প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ হাসিলের সম্ভাবনা। কোনো কিশোর যদি কারও নির্দেশে অপরাধে জড়ায়, তাহলে শুধু কিশোরকে আটক করে সমস্যার সমাধান করা যায় না। তাকে ব্যবহারকারী ব্যক্তিকেও শনাক্ত করতে হবে। কারণ একটি গ্যাং ভেঙে দিলে যদি তার জায়গায় আরেকটি গ্যাং তৈরি হয়, তাহলে বোঝা যায় আমরা রোগের উৎসে পৌঁছতে পারিনি। অপরাধের পৃষ্ঠপোষকতা, মাদক সরবরাহ, অস্ত্রের প্রবাহ এবং স্থানীয় ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ না করলে কিশোর গ্যাংয়ের শেকড় উপড়ে ফেলা কঠিন।
শাস্তি প্রয়োজন, কিন্তু পুনর্বাসনও জরুরি
আইনের প্রয়োগ অবশ্যই দরকার। সমাজের নিরাপত্তা রক্ষায় অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অপরিহার্য। কিন্তু কিশোর অপরাধীর ক্ষেত্রে শাস্তির পাশাপাশি সংশোধন ও পুনর্বাসনের পথও খোলা রাখতে হবে। খেলার মাঠ, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, বিতর্ক চর্চা, স্কাউটিং, কারিগরি শিক্ষা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে। স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদের ফিরিয়ে আনতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার কিশোরদের জন্য বিশেষ কাউন্সেলিং ও সামাজিক কর্মসূচি প্রয়োজন। একটি মাঠ কেবল মাঠ নয়; এটি অপরাধ থেকে দূরে থাকার একটি নিরাপদ জায়গা। একটি পাঠাগার শুধু বইয়ের ঘর নয়; এটি বিকল্প স্বপ্নের দরজা। একজন ভালো শিক্ষক কখনো কখনো একটি জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।
কিশোরকে হারালে ভবিষ্যৎকে হারাব
যে কিশোর আজ গ্যাংয়ে দাঁড়িয়েছে, সে জন্ম থেকেই অপরাধী ছিল না। কোনো একদিন তারও স্বপ্ন ছিল। মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার স্মৃতি ছিল, বাবার কাছে আবদার ছিল, পরীক্ষার খাতায় ভালো করার চেষ্টা ছিল। কোথাও গিয়ে সেই স্বপ্ন হারিয়েছে; তার জায়গা নিয়েছে ভুল বন্ধুত্ব, ক্ষোভ, একাকিত্ব, ক্ষমতার মোহ কিংবা অপরাধের প্রলোভন।
তাই প্রশ্ন শুধু হওয়া উচিত নয়, ‘সে কী অপরাধ করেছে?’

প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘কোন পথ ধরে সে এখানে এসে দাঁড়াল?’

কিশোর গ্যাং দমন তাই শুধু পুলিশের অভিযান নয়। এটি পরিবারকে ফিরিয়ে আনার লড়াই, শিক্ষাকে শক্তিশালী করার লড়াই, মাঠ ও সংস্কৃতিকে বাঁচানোর লড়াই, প্রযুক্তিকে মানবিক ব্যবহারে আনার লড়াই এবং মূল্যবোধকে পুনর্জাগরণের লড়াই।

আমাদের কিশোরদের হাতে অস্ত্র নয়, স্বপ্ন তুলে দিতে হবে। কারণ আজ যে হাতে আমরা বই তুলে দিতে পারব, আগামীকাল সেই হাতই দেশ গড়বে। আর যে হাতকে আমরা অবহেলায় অপরাধের দিকে ঠেলে দেব, একদিন সেই অপরাধের ছায়া আমাদের নিজেদের দরজাতেও এসে পড়বে। কিশোরকে বাঁচানো মানে শুধু একটি জীবন বাঁচানো নয়; একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি দেশের ভবিষ্যৎকে বাঁচানো।

লেখক: কবি