Dhaka ০২:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
বীরমুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও ‎দাফনে বাধা দেয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন সুন্দরগঞ্জে ট্রাক-অটোভ্যান সংঘর্ষ: নিহত ২, আহত ১ ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাসাদের কাছে বিমান বিব্ধস্ত, পাইলটসহ সকল আরোহীর মৃত্যু সাঘাটায় জমি বিরোধে বিধবার ৪০টি গাছ নিধন, ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে আটক ১ জেলার ১১ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাস করেনি কেউ, ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ গাজীপুরে শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ, যানবাহন ভাঙচুর, ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন বাংলাদেশের চার সমুদ্রবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত বেতন বৃদ্ধির দাবিতে মিরপুরে পোশাক শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ, পুলিশেস সাথে সংঘর্ষ মার্কিন ডিভি লটারি চালুর নির্দেশ স্থগিত করলেন আপিল আদালত ব্রহ্মপুত্রের বুকে নৌকার পাটাতনে জন্ম নিলো ফুটফুটে কন্যাশিশু

স্মৃতির পাতায় শ্রদ্ধেয় আবু জাফর সাবু: গাইবান্ধার সাংবাদিকতা ও প্রগতিশীল আন্দোলনের বাতিঘর

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৪:০৭:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
  • ৯৪ Time View

আফতাব হোসেন:

গাইবান্ধার সংবাদপত্র জগৎ, সাহিত্য-সংস্কৃতি আর প্রগতিশীল নাগরিক আন্দোলনের কথা উঠলেই যে নামটি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে উচ্চারিত হয়, তিনি সাংবাদিক আবু জাফর সাবু। তিনি কেবল একজন প্রথিতযশা সাংবাদিকই ছিলেন না; ছিলেন উত্তর জনপদের গণমাধ্যম অঙ্গনের অভিভাবক, দক্ষ সংগঠক, কবি এবং রুচিশীল ব্যক্তিত্ব। ২০২১ সালের ২৯ আগস্ট এই গুণী মানুষটি না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান। তাঁর প্রয়াণে গাইবান্ধা একজন অভিভাবক হারালেও তিনি রেখে গেছেন সাংবাদিকতার অনন্য নীতিবোধ ও নেতৃত্বের উজ্জ্বল আদর্শ।

আবু জাফর সাবু দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি সুনামের সঙ্গে জাতীয় দৈনিক জনকণ্ঠ এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-এর গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক আজকের জনগণ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের গুরুদায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন।

ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও যমুনার করাল গ্রাসে নদীভাঙনে নিঃস্ব মানুষ, বন্যাপীড়িত চরাঞ্চলের জীবনসংগ্রাম আর পিছিয়ে পড়া এই অঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভাবনার কথা তিনি সাহসিকতার সাথে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরেছেন। পক্ষপাতহীন দৃষ্টিভঙ্গি, সংবাদের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং পেশাদারিত্ব তাঁকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল।

গাইবান্ধা প্রেসক্লাবের একাধিক মেয়াদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আবু জাফর সাবু স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত মর্যাদা, ঐক্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি মজবুত করতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন। মফস্বল সাংবাদিকদের কাছে তিনি ছিলেন বটবৃক্ষের মতো। নতুন প্রজন্মের সংবাদকর্মীদের সাংবাদিকতার নীতি-রীতি ও মাঠপর্যায়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তিনি পরম স্নেহে পরামর্শ দিতেন, শিখিয়ে দিতেন কাজের খুঁটিনাটি।

গভীর রাত কিংবা যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি—মফস্বলের কোনো সাংবাদিক বিপদে পড়ে তাঁকে জানালে তিনি তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ নিতেন; যেখানে যোগাযোগ করা দরকার করতেন, প্রয়োজনে নিজে ছুটে যেতেন। সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক নেতৃত্ব কীভাবে দিতে হয়, তা তিনি কাজের মাধ্যমে দেখিয়ে গেছেন। সংবাদকর্মী ও সমাজকর্মীদের কাছে তাঁর নেতৃত্বগুণ ছিল এক জীবন্ত পাঠশালা।

সাংবাদিকতার কঠিন বাস্তবতার ভেতরেও তাঁর মধ্যে বাস করত এক সংবেদনশীল শিল্পমনা সত্তা। তিনি নিয়মিত কবিতা লিখতেন, যা জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ও প্রশংসিত হয়েছে। পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন খেলাঘর, উদীচী ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে। গাইবান্ধার সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের প্রতিটি নাগরিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা।

ব্যক্তিজীবনে আবু জাফর সাবু ছিলেন ভীষণ পরিপাটি ও রুচিশীল মানুষ। ভ্রমণ, মানুষের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ এবং প্রকৃতির সান্নিধ্য ছিল তাঁর প্রিয় শখ। তাঁর স্নেহশীল আচরণ, প্রাণখোলা আড্ডা আর বিপদে পাশে দাঁড়ানোর নিঃস্বার্থ মানসিকতা সহকর্মীদের হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে।

আবু জাফর সাবু আজ সশরীরে নেই, কিন্তু তাঁর সততা, নির্ভীক সাংবাদিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধের পথ উত্তর জনপদের সংবাদকর্মী ও সুশীল সমাজকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে চলেছে। গণমানুষের অধিকার আদায়ে এবং মুক্তচিন্তার বিকাশে তাঁর অবদান চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

বীরমুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও ‎দাফনে বাধা দেয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন

স্মৃতির পাতায় শ্রদ্ধেয় আবু জাফর সাবু: গাইবান্ধার সাংবাদিকতা ও প্রগতিশীল আন্দোলনের বাতিঘর

Update Time : ০৪:০৭:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

আফতাব হোসেন:

গাইবান্ধার সংবাদপত্র জগৎ, সাহিত্য-সংস্কৃতি আর প্রগতিশীল নাগরিক আন্দোলনের কথা উঠলেই যে নামটি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে উচ্চারিত হয়, তিনি সাংবাদিক আবু জাফর সাবু। তিনি কেবল একজন প্রথিতযশা সাংবাদিকই ছিলেন না; ছিলেন উত্তর জনপদের গণমাধ্যম অঙ্গনের অভিভাবক, দক্ষ সংগঠক, কবি এবং রুচিশীল ব্যক্তিত্ব। ২০২১ সালের ২৯ আগস্ট এই গুণী মানুষটি না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান। তাঁর প্রয়াণে গাইবান্ধা একজন অভিভাবক হারালেও তিনি রেখে গেছেন সাংবাদিকতার অনন্য নীতিবোধ ও নেতৃত্বের উজ্জ্বল আদর্শ।

আবু জাফর সাবু দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি সুনামের সঙ্গে জাতীয় দৈনিক জনকণ্ঠ এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-এর গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক আজকের জনগণ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের গুরুদায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন।

ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও যমুনার করাল গ্রাসে নদীভাঙনে নিঃস্ব মানুষ, বন্যাপীড়িত চরাঞ্চলের জীবনসংগ্রাম আর পিছিয়ে পড়া এই অঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভাবনার কথা তিনি সাহসিকতার সাথে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরেছেন। পক্ষপাতহীন দৃষ্টিভঙ্গি, সংবাদের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং পেশাদারিত্ব তাঁকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল।

গাইবান্ধা প্রেসক্লাবের একাধিক মেয়াদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আবু জাফর সাবু স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত মর্যাদা, ঐক্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি মজবুত করতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন। মফস্বল সাংবাদিকদের কাছে তিনি ছিলেন বটবৃক্ষের মতো। নতুন প্রজন্মের সংবাদকর্মীদের সাংবাদিকতার নীতি-রীতি ও মাঠপর্যায়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তিনি পরম স্নেহে পরামর্শ দিতেন, শিখিয়ে দিতেন কাজের খুঁটিনাটি।

গভীর রাত কিংবা যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি—মফস্বলের কোনো সাংবাদিক বিপদে পড়ে তাঁকে জানালে তিনি তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ নিতেন; যেখানে যোগাযোগ করা দরকার করতেন, প্রয়োজনে নিজে ছুটে যেতেন। সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক নেতৃত্ব কীভাবে দিতে হয়, তা তিনি কাজের মাধ্যমে দেখিয়ে গেছেন। সংবাদকর্মী ও সমাজকর্মীদের কাছে তাঁর নেতৃত্বগুণ ছিল এক জীবন্ত পাঠশালা।

সাংবাদিকতার কঠিন বাস্তবতার ভেতরেও তাঁর মধ্যে বাস করত এক সংবেদনশীল শিল্পমনা সত্তা। তিনি নিয়মিত কবিতা লিখতেন, যা জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ও প্রশংসিত হয়েছে। পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন খেলাঘর, উদীচী ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে। গাইবান্ধার সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের প্রতিটি নাগরিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা।

ব্যক্তিজীবনে আবু জাফর সাবু ছিলেন ভীষণ পরিপাটি ও রুচিশীল মানুষ। ভ্রমণ, মানুষের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ এবং প্রকৃতির সান্নিধ্য ছিল তাঁর প্রিয় শখ। তাঁর স্নেহশীল আচরণ, প্রাণখোলা আড্ডা আর বিপদে পাশে দাঁড়ানোর নিঃস্বার্থ মানসিকতা সহকর্মীদের হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে।

আবু জাফর সাবু আজ সশরীরে নেই, কিন্তু তাঁর সততা, নির্ভীক সাংবাদিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধের পথ উত্তর জনপদের সংবাদকর্মী ও সুশীল সমাজকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে চলেছে। গণমানুষের অধিকার আদায়ে এবং মুক্তচিন্তার বিকাশে তাঁর অবদান চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।