Dhaka ০৮:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
পত্নীতলায় ট্রাক্টরের চাকায় পিষ্ট হয়ে বৃদ্ধের মৃত্যু শ্বশুরবাড়িতে আম পাড়তে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে জামাইয়ের মৃত্যু  চিলমারীতে হঠাৎ দমকা হাওয়ায় ডুবে গেছে ৭টি নৌকা সুন্দরগঞ্জে বাড়ির যাতায়াতের রাস্তা বন্ধ করার প্রতিবাদে মানববন্ধন নওগাঁয় বাসের বক্সের ঢাকনার আঘাতে অটোরিকশার ১ যাত্রী নিহত, আহত ২ শিশু   সুপারকম্পিউটারের ভবিষ্যদ্বাণীতে বিশ্বকাপে জিতবে কোন দল? গোবিন্দগঞ্জে এক মানসিক রোগীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে পুড়ছে দেশ, জুনে ২-৩ দফা তাপপ্রবাহের আভাস মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা: ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া সতর্কবার্তা ইরানের মুক্তিযুদ্ধের সময় নিখোঁজ বাবা: ৫৪ বছর পর বাংলাদেশে জন্মভিটার সন্ধান পেল পাকিস্তানে বেড়ে ওঠা ছেলে

চামড়ার বাজারে ব্যাপক ধস: ক্ষতির ভার কার কাঁধে?

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৯:০৬:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬
  • ৪০ Time View

নজরুল ইসলাম:

এবার ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করে সরকার । যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। কিন্তু চামড়ার বাজারে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যায়নি। রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারগুলোতে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া বিক্রি হয়েছে সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক কমে। প্রতি পিস ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।

পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে অস্থিরতা ও মূল্যপতনের চিত্র দেখা গেছে। সরকার কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাস্তবে সেই মূল্য কার্যকর হয়নি। ট্যানারি মালিক ও বড় আড়ৎদারদের একটি অংশ সরকারি দর উপেক্ষা করে অনেক কম দামে চামড়া কিনেছেন বলে ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং ক্ষুদ্র চামড়া
সংগ্রহকারীরা।

চামড়া দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী শিল্প। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের অবদান দীর্ঘদিনের। অথচ কোরবানির সময় সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়ার ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে না পারা একটি বড় অর্থনৈতিক ব্যর্থতা। সরকার প্রতিবছর মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায় না। ফলে নির্ধারিত দাম কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। যখন কোনো বাজারে ক্রেতার সংখ্যা সীমিত এবং বিক্রেতার সংখ্যা বিপুল হয়, তখন ক্রেতারা সহজেই মূল্য নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায়। কোরবানির চামড়ার ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকটি বড় ট্যানারি ও আড়ৎদারের ওপর বাজার নির্ভরশীল হওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক
পরিবেশ গড়ে ‍ওঠেনি। ফলে বাজারমূল্য নির্ধারণে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। চামড়ার দাম কমে যাওয়ার কারণে মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এক সময় কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ তাদের বছরের একটি বড় অংশের ব্যয় মেটাতে সহায়তা করত। কিন্তু বর্তমানে সেই আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থাও পরোক্ষভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় অনেক স্থানে চামড়া সংরক্ষণে অনীহা দেখা দেয়। ফলে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা জাতীয় সম্পদের অপচয়ের শামিল। চামড়া শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জীবিকাও এ অবস্থার কারণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। একটি সম্ভাবনাময় শিল্প খাতের এমন দুর্বলতা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও সুখকর নয়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, সরকার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি বা সমবায়ভিত্তিক চামড়া সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, চামড়া সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় লবণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে, যাতে ব্যবসায়ীরা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য না হন। পাশাপাশি নতুন ট্যানারি ও ক্রেতা
প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

চামড়া শিল্পকে ঘিরে যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে হলে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কোরবানির পশুর চামড়া যেন আর অবমূল্যায়নের শিকার না হয় এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যেন ন্যায্য মূল্য পান, সে লক্ষ্যে সরকার, ট্যানারি মালিক ও সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় দেশের সম্ভাবনাময় এই শিল্প আরও মহাসংকটে পড়তে পারে। তাই সময় থাকতে এ বিষয়ে
সঠিক ও জরুরিভাবে সিন্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়াজন।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

পত্নীতলায় ট্রাক্টরের চাকায় পিষ্ট হয়ে বৃদ্ধের মৃত্যু

চামড়ার বাজারে ব্যাপক ধস: ক্ষতির ভার কার কাঁধে?

Update Time : ০৯:০৬:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬

নজরুল ইসলাম:

এবার ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করে সরকার । যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। কিন্তু চামড়ার বাজারে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যায়নি। রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারগুলোতে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া বিক্রি হয়েছে সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক কমে। প্রতি পিস ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।

পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে অস্থিরতা ও মূল্যপতনের চিত্র দেখা গেছে। সরকার কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাস্তবে সেই মূল্য কার্যকর হয়নি। ট্যানারি মালিক ও বড় আড়ৎদারদের একটি অংশ সরকারি দর উপেক্ষা করে অনেক কম দামে চামড়া কিনেছেন বলে ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং ক্ষুদ্র চামড়া
সংগ্রহকারীরা।

চামড়া দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী শিল্প। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের অবদান দীর্ঘদিনের। অথচ কোরবানির সময় সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়ার ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে না পারা একটি বড় অর্থনৈতিক ব্যর্থতা। সরকার প্রতিবছর মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায় না। ফলে নির্ধারিত দাম কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। যখন কোনো বাজারে ক্রেতার সংখ্যা সীমিত এবং বিক্রেতার সংখ্যা বিপুল হয়, তখন ক্রেতারা সহজেই মূল্য নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায়। কোরবানির চামড়ার ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকটি বড় ট্যানারি ও আড়ৎদারের ওপর বাজার নির্ভরশীল হওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক
পরিবেশ গড়ে ‍ওঠেনি। ফলে বাজারমূল্য নির্ধারণে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। চামড়ার দাম কমে যাওয়ার কারণে মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এক সময় কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ তাদের বছরের একটি বড় অংশের ব্যয় মেটাতে সহায়তা করত। কিন্তু বর্তমানে সেই আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থাও পরোক্ষভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় অনেক স্থানে চামড়া সংরক্ষণে অনীহা দেখা দেয়। ফলে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা জাতীয় সম্পদের অপচয়ের শামিল। চামড়া শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জীবিকাও এ অবস্থার কারণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। একটি সম্ভাবনাময় শিল্প খাতের এমন দুর্বলতা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও সুখকর নয়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, সরকার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি বা সমবায়ভিত্তিক চামড়া সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, চামড়া সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় লবণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে, যাতে ব্যবসায়ীরা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য না হন। পাশাপাশি নতুন ট্যানারি ও ক্রেতা
প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

চামড়া শিল্পকে ঘিরে যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে হলে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কোরবানির পশুর চামড়া যেন আর অবমূল্যায়নের শিকার না হয় এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যেন ন্যায্য মূল্য পান, সে লক্ষ্যে সরকার, ট্যানারি মালিক ও সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় দেশের সম্ভাবনাময় এই শিল্প আরও মহাসংকটে পড়তে পারে। তাই সময় থাকতে এ বিষয়ে
সঠিক ও জরুরিভাবে সিন্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়াজন।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী