
আফতাব হোসেন: তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার উত্তর জনপদে প্রায় ৫ লাখ পরিবারের বসতভিটা চরম বন্যাঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতি বছর নদীভাঙনের শিকার হয়ে গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও লালমনিরহাট জেলার ৪২৬টি চরের অন্তত ১৫ লাখ মানুষ বন্যার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন। বছরের ৪ থেকে ৫ মাসই বন্যাকালীন চরম অনিশ্চয়তা ও জীবন-জীবিকার ঝুঁকি নিয়ে কাটে তাদের দিন।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণউন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) তথ্যমতে, চরাঞ্চলের মাত্র ১০ শতাংশ পরিবারের বসতবাড়ি বন্যামুক্ত হলেও প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়িঘরই বন্যাঝুঁকিতে রয়েছে। বছরজুড়ে নদীভাঙনের শিকার হয়ে বিভিন্ন চরে আশ্রয় নেওয়া এসব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে বাধ্য হয়ে নিচু জমিতেই থাকতে হয়। চরম আর্থিক দৈন্যের কারণে মাটি কেটে বসতভিটা উঁচু করার বা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নিজস্ব সামর্থ্য তাদের নেই।
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার উত্তর দীঘলকান্দি গ্রামের মফিজ সরকার জানান, প্রতি বছর নদীভাঙনের কারণে ঘরবাড়ি টেনে নিয়ে নিচু জমিতে আশ্রয় নিতে হয়। একারণে বন্যা আসার আগেই চরম দুশ্চিন্তায় পড়তে হয় তাদের।
এতসব হতাশার মাঝেও আশার আলো ছড়াচ্ছে ফুলছড়ি উপজেলার উজালডাঙা গ্রামের ‘ক্লাস্টার ভিলেজ’। বেসরকারি সংস্থা জিইউকে-এর উদ্যোগে গড়ে তোলা এই ক্লাস্টারে আশ্রয় নিয়ে বেশ নিরাপদে আছেন সেখানকার বাসিন্দারা। গ্রামের জহুরুল হক স্বস্তির কথা জানিয়ে বলেন, “আগে নদীর পানি বাড়লেই চিন্তা হতো ঘরে থাকতে পারব কি না। এখন আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি।”
সরেজমিনে দেখা যায়, ক্লাস্টার গ্রামটির প্রতিটি বাড়ির উঠান এখন সবুজে ঘেরা। প্রতিটি বাড়িতে গড়ে তোলা হয়েছে সবজি বাগান। হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল পালনের পাশাপাশি ফসল ফলিয়ে নিজেদের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছেন তারা।
গ্রামের আরেক বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন জানান, নদীভাঙন ও বন্যার ঝুঁকিপূর্ণ এই এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি। উজালডাঙা ক্লাস্টার ভিলেজ মূলত একটি টেকসই অভিযোজনের বাস্তব উদাহরণ। বন্যার ক্ষতি থেকে বাঁচতে এখানকার ঘরগুলো বন্যার পানির উচ্চতার চেয়ে উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রতিটি পরিবারকে জলবায়ু সহনশীল কৃষি পদ্ধতির ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অল্প সময়ে ফলনশীল জাতের ফসল চাষ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং জৈব সারের ব্যবহার। ফলে কম সম্পদেও তারা এখন বেশি উৎপাদন করতে পারছেন। একক বা ক্লাস্টারভিত্তিক এমন বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হলে চরের মানুষ অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে নিরাপদ থাকবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।
গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস সালাম জানান, ফুলছড়ির উজালডাঙা চরে তৈরি করা ক্লাস্টার ভিলেজ মডেলটি চরের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত উপযোগী। স্বল্প খরচে ক্লাস্টার ভিলেজ নির্মাণ করা যায়। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “এখানে ৪০টি পরিবারের জন্য অনেকটাই স্থায়ী ও নিরাপদ বাসস্থান গড়ে উঠেছে। এখানকার মানুষ এখন তাদের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে পরিকল্পনা করতে পারছে এবং তাদের জীবনমান উন্নত হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এ ধরনের পদক্ষেপ আরও বাড়ানো উচিত।”
এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবীব দুলু বলেন, “উত্তর জনপদের বিশেষ করে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর চরাঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো নদীভাঙন। এই সমস্যা সমাধান করে নদীকে সম্পদে পরিণত করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।” চরের মানুষের জীবন-জীবিকার টেকসই উন্নয়ন হলে এ অঞ্চলে আর দারিদ্র্য থাকবে না বলেও জানান তিনি।

Reporter Name 







