
প্রতিনিধি, গাইবান্ধা
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় ৪০টি ইটভাটা চালু থাকলেও এর মধ্যে অন্তত ৩৪টির কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। সরকারি আইন ও বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে এসব অবৈধ ইটভাটা পরিচালিত হওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন ও তিন ফসলি আবাদি জমিতে ইটভাটা গড়ে ওঠায় মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ, কৃষি ও জনস্বাস্থ্য।
যত্রতত্র ইটভাটা স্থাপনের কারণে ফসলি জমির উর্বর টপসয়েল কেটে নেওয়া হচ্ছে। এতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গাছের ফলন নষ্ট হচ্ছে। কয়লার পাশাপাশি জ্বালানি কাঠ পোড়ানোর ফলে কালো ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে এলাকার পরিবেশ ও প্রকৃতি। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দিনরাত ইট প্রস্তুত ও পোড়ানোর কার্যক্রম চললেও কার্যকর তদারকি নেই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলায় বর্তমানে মাত্র ৬টি ইটভাটার লাইসেন্স থাকলেও সেগুলোর মেয়াদ ইতোমধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে। গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভা এলাকাসহ পুরো উপজেলায় ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ৩৬টি। কাটাবাড়ী, সাপমারা, কামারদহ, নাকাই, দরবস্ত, মহিমাগঞ্জ, কোচাশহর ও শিবপুর রাখালবুরুজ ইউনিয়নে এসব ইটভাটার অবস্থান। এর মধ্যে মাত্র কয়েকটি ভাটা অনুমোদনের কথা জানালেও বাকি প্রায় ৩০টি ভাটার কোনো লাইসেন্স বা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই।
অভিযোগ রয়েছে, ইটভাটাগুলো কৃষিজমির উর্বর মাটি (টপসয়েল) ব্যবহার করে ইট তৈরি করছে। সামান্য অর্থের বিনিময়ে কৃষকদের কাছ থেকে মাটি কিনে নেওয়ায় কৃষিজমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া ভাটায় নির্বিচারে গাছগাছালি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট কালো ধোঁয়া আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে ভুগছেন মানুষ। পুনতাইড়, ফাঁসিতলা এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে স্কুল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশেই ইটভাটা থাকায় শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা সারা বছর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকছেন।
ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় নারিকেল, সুপারি, আম, কাঁঠালসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। প্রতি বছর ফসল নষ্ট হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ থাকলেও কোনো কার্যকর প্রতিকার মিলছে না।
পৌর শহরের পূর্ব পান্তাপাড়া এলাকার কৃষক আব্দুল আলিম বলেন, ইটভাটার কারণে তাদের ফল ও ফসল উৎপাদনে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, অথচ ফলন কমে যাচ্ছে। গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বিলাস কুমার ভট্টাচার্য মুঠোফোনে জানান, বোয়ালিয়া এলাকার এক কৃষকের প্রণোদনা পাওয়া ফসলের জমি ইটভাটার জন্য কেটে নেওয়া হয়েছে, যা ফসল উৎপাদনে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর ‘ম্যানেজ’ করেই এসব অবৈধ ইটভাটা পরিচালিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে সমিতির সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদের কাছে অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা ও বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি কোনো তথ্য না দিয়ে এড়িয়ে যান।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, তিনি যোগদানের পর নতুন করে কোনো ইটভাটার প্রত্যয়ন দেওয়া হয়নি। ইটভাটার কারণে ফসলের ক্ষতির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চলতি বছরের ১০ ডিসেম্বর গাইবান্ধা পরিবেশ অধিদপ্তর ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তামশিদ ইরাম খানের নেতৃত্বে কামারদহ ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন মেসার্স উৎস এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ইটভাটায় অভিযান চালানো হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯)’ অনুযায়ী ভাটার স্বত্বাধিকারী আবু তালেব মন্ডলকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
গাইবান্ধা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক উত্তম কুমার মুঠোফোনে জানান, এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দা ইয়াসমিন সুলতানা মুঠোফোনে কোনো মন্তব্য না করে অফিসে আসার আহ্বান জানান। দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের এমন অস্পষ্ট ভূমিকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন গণমাধ্যমকর্মীরা।
এদিকে বেসরকারি সংস্থা নিপো’র নির্বাহী পরিচালক ও পরিবেশকর্মী আহম্মাদুল্লাহ বলেন, অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল ও কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। পাশাপাশি ইটভাটা মালিকদের সচেতন হয়ে অকৃষি ও ফাঁকা জমিতে পরিবেশবান্ধব উপায়ে ভাটা স্থাপনের আহ্বান জানান তিনি। জনবহুল এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাদি জমির পাশে থাকা ইটভাটা দ্রুত অপসারণের দাবি জানান এই পরিবেশকর্মী।

Reporter Name 






