
নওগাঁ সংবাদদাতা: নওগাঁয় হঠাৎ বাড়তে শুরু করেছে সংক্রামক রোগ হামের প্রাদুর্ভাব। জেলায় এখন পর্যন্ত আটজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া ঢাকায় বসবাসকারী নওগাঁ জেলার এক শিশু সেখানে (ঢাকা) মারা গেছে। হামের প্রাদুর্ভাব গুরুত্ব দিয়ে সতর্কাবস্থায় রয়েছে বলছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে খুশি নন স্বজনরা।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় হামের উপসর্গ থাকা রোগী পাওয়া গেছে ৪১ জন। ল্যাবটেস্টে এর মধ্যে পজিটিভ এসেছে আট জনের। আক্রান্তরা নওগাঁ সদর, পোরশা, নিয়ামতপুর, সাপাহার, আত্রাই ও মান্দা উপজেলা উপজেলার বাসিন্দা। সবচেয়ে বেশি প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে নওগাঁ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড ও নিয়ামতপুর উপজেলার ভাবিচা ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডে। এছাড়া নওগাঁ শহরের বাঙ্গাবাড়িয়া এলাকায় এক শিশু সন্দেহভাজন হিসেবে সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।
সোমবার (৩০ মার্চ) সকালে ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগ ঘুরে দেখা যায়, রোগীতে ঠাসা শিশু বিভাগটি। শয্যা সংকটে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেক রোগীকে। ২০ ওয়ার্ডের বিপরীতে সর্দি, জ্বরসহ বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রয়েছে ৭০জন রোগী। স্বজনদের অভিযোগ, ওয়ার্ডের একই বিছানায় দুই থেকে তিন জন রোগী চিকিৎসায় বাড়ছে আক্রান্ত ঝুঁকি। এ অবস্থায় সঠিক চিকিৎসা না পাওয়া ও রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্বজনরা। এদিকে সেবা দিতে হিমশিম অবস্থা চিকিৎসক-নার্সদের।
মান্দা উপজেলার পাঁজরভাঙ্গা এলাকার এক শিশুর মা পারুল আকাতার জানান, ‘কয়েকদিন আগে তার ছেলে সারারাত কান্নাকাটি করে আর শরীর চুলকায়। সাথে জ্বর ছিলো। এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে ছেলেটি। স্থানীয়রা দেখে বলে হাম হয়েছে। পরে হাসপাতালে এসে শিশু ডাক্তার দেখালে ভর্তি হতে বলে। যার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়ছি।’
রানীনগর উপজেলার মিরাট ইউনিয়নের হরিশপুর গ্রামের জোবেদা বেগম জানান, তাঁর নাতির কয়েকদিন থেকে শরীরে জ্বর ছিলো। পরে খিচুনি ওঠে হাত-পা বাঁকা হয়ে অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। পরে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। তবে হাসপাতালে বেড না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছে।
নওগাঁ শহরের চকদেবপাড়া মো. মিশন নামে অরেক রোগীর স্বজন জানান, ‘ডায়রিয়া, জ্বর ও হামের চিকিৎসা একই ওয়ার্ডে একইভাবে দেয়া হচ্ছে। আলাদা কোন ব্যবস্থা নেই।’ তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর ভাগিনার গায়ে জ্বর ছিলো। হাসপাতালে আসলে বল হয় জ্বর মাপার থার্মোমিটার নেই। হাত দিয়ে তাপমাত্রা মেপে আইডিয়া করে ওষুধ দিচ্ছে। হাসপাতালের মত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যদি এসে আইডিয়া করে ওষুধ নিতে হয় তাহলে আমাদের স্বাস্থ্যসেবা কবে নিশ্চিত হবে?
শিশু ওয়ার্ড ইনচার্জ জেনাত রেহেনা জানান, ‘কয়েকদিন ধরেই জ্বরের রোগী বেশি আসছে। পাশাপশি কাশি ও শরীরে লালচে র্যাশ থাকছে। এতে রোগীর চাপ বাড়ায় সেবা দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। তারপরও আমরা সবাইকে সঠিক সময় সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’
নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আবু জার গাফফার বলেন, ‘জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে যা আশংঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। বর্তমানে হাসপাতালে একজন রোগী সন্দেহভাজন হিসেবে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এরজন্য আলাদাভাবে একটি কেবিনকে আইসোলেশন ওয়ার্ড করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে বাড়ানো হবে।’
নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম জানান, ‘হামের প্রাদুর্ভাবের শঙ্কা দেখা দেওয়ায় স্বাস্থ্যবিভাগ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। ইতোমধ্যে জেলা সদর হাসপাতালসহ প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হয়েছে। এরইমধ্যে জেলায় ৮জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। ঢাকায় বসবাসকারী নওগাঁ জেলার এক শিশু হামে আক্রন্ত হয়ে সেখানেই মারা গেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘নওগাঁ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড ও নিয়ামতপুর উপজেলার ভাবিচা ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় আক্রান্তদের আশপাশের প্রায় ৪০টি বাড়ির শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি করে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে। এছাড়া পোরশা, সাপাহার, মান্দা ও আত্রাই উপজেলায় সন্দেহজনক রোগী পাওয়ায় ওইসব এলাকায় অধিকতর সার্চিং কার্যক্রম চালু আছে। আগামী মে মাসে হামের টিকাদান কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিশুদের এমআর টিকার বুস্টার ডোজ দেওয়া হবে। পাশাপাশি হামের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার আহবান জানান।’

Reporter Name 


















