
পীরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:
রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার মকিমপুর গ্রামে জন্ম সান্তনা রানীর। অভাবের কারণে শৈশবেই বই-খাতা তুলে রাখতে হয়েছিল তাঁকে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিয়ে হয় একই উপজেলার সোয়েবপুর গ্রামের গোবিন্দ মহন্তের সাথে। নিজের কোনো জমিজমা বা ভিটেমাটি না থাকায় স্বামীর সংসারেও দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী। এরই মাঝে কোল আলো করে আসে তিন কন্যা সন্তান। কিন্তু সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে শুরু করেন হাড়ভাঙা খাটুনি। দিনরাত পরিশ্রম করে জমানো টাকায় তিন শতক জমি কিনে একটি ছোট বসতবাড়ি তৈরি করেন এবং মেয়েদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন বুনতে থাকেন।
জীবনের চাকা যখন কিছুটা মসৃণ হতে শুরু করেছে, তখনই ২০১৫ সালে বিনা মেঘে বজ্রপাত ঘটে সান্তনা রানীর জীবনে। আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান স্বামী গোবিন্দ মহন্ত। তিন মেয়েকে নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েন তিনি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা সান্তনা বাধ্য হয়ে অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ শুরু করেন। কিন্তু সামান্য মজুরিতে চারজনের মুখের আহার জোটানো এবং মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অভাবের তাড়নায় জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি।
অন্যের বাড়িতে কাজ করে যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন সান্তনা রানী এক সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। গ্রামীণ সমাজে একজন নারীর ভ্যান চালিয়ে বা ফেরি করে জিনিসপত্র বিক্রি করার বিষয়টি খুব একটা সহজ ছিল না। পদে পদে ছিল সামাজিক ভ্রুকুটি আর কটূক্তি। কিন্তু সন্তানদের ভবিষ্যতের কাছে সমাজের এই নেতিবাচকতা তুচ্ছ মনে হয় তাঁর কাছে। তিনি একটি ‘ভূমিহীন সমিতি’-তে জমানো নিজের সামান্য সঞ্চয়ের টাকা তুলে নেন। সেই টাকায় একটি পুরোনো ভ্যান কেনেন।
এরপর পাইকারি বাজার থেকে মসলা, ডাল, লবণ, তেল, সাবানসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য কিনে সেই ভ্যানে সাজিয়ে পীরগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে বিক্রি শুরু করেন। প্রখর রোদ, মুষলধারে বৃষ্টি বা কনকনে শীত উপেক্ষা করে প্রতিদিন মাইলের পর মাইল ভ্যান টেনে তিনি ব্যবসা চালিয়ে যান। তাঁর এই সততা এবং জীবনযুদ্ধের লড়াই দেখে একসময় সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে শুরু করে।
ভ্যানে ফেরি করে বিক্রির এই কষ্টসাধ্য জীবন তিনি চালিয়ে গেছেন দিনের পর দিন। তাঁর এই কঠোর পরিশ্রম বিফলে যায়নি। ব্যবসার পরিধি ও মূলধন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। জমানো পুঁজি দিয়ে একসময় ফেরি ব্যবসার ইতি টেনে পীরগঞ্জের হরিতলা বাজারে একটি স্থায়ী দোকান ভাড়া নেন তিনি। সেখানে গড়ে তোলেন নিজের মুদি দোকান। বর্তমানে তাঁর দোকানে চাল, ডাল থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব রকম পণ্যই পাওয়া যায়। ভ্যানচালক সান্তনা রানী ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন একজন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী।
আজ সান্তনা রানী অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী। নিজের আয়ে তিনি শুধু সচ্ছলভাবে সংসারই চালাচ্ছেন না, নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে ছোট মেয়েকে বিয়েও দিয়েছেন। একসময়ের কপর্দকশূন্য, স্বামীহারা যে নারীকে সমাজের অসহায় মনে করা হতো, সেই সান্তনা রানী আজ একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। হরিতলা বাজারের অন্যান্য ব্যবসায়ীদের কাছেও তিনি এখন অত্যন্ত সম্মানিত।
তাঁকে দেখে সোয়েবপুর, মকিমপুরসহ আশপাশের গ্রামের অসংখ্য দরিদ্র ও অসহায় নারী নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন। সান্তনা রানী প্রমাণ করেছেন-প্রবল ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য এবং অবিচল পরিশ্রম থাকলে চরম দারিদ্র্য ও সামাজিক প্রতিকূলতাকেও জয় করে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছানো সম্ভব।

Reporter Name 



















