
নিজস্ব প্রতিবেদন:
দেশে জ্বালানি তেলের মজুত পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও নিছক গুজবে কান দিয়ে দেশজুড়ে পেট্রল ও অকটেন কেনার হিড়িক পড়েছে। ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কজনিত এই কেনাকাটার ফলে শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাতারাতি চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় বরাদ্দকৃত তেল নিমিষেই ফুরিয়ে যাচ্ছে, ফলে সাময়িকভাবে পাম্প বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা। তবে সরকার ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন—দেশে পেট্রল ও অকটেনের কোনো ঘাটতি নেই। মে মাস পর্যন্ত চাহিদার পুরো তেলই মজুত রয়েছে।
জনমনে প্রশ্ন জেগেছে, দেশে আসলে জ্বালানির উৎপাদন সক্ষমতা কতটুকু? জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, মজুত এবং উৎপাদন সক্ষমতা বিবেচনায় দেশে পেট্রল বা অকটেনের এমন হাহাকার হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। দেশে বছরে পেট্রলের চাহিদা ৪ লাখ ৬২ হাজার টন এবং অকটেনের চাহিদা ৪ লাখ ১৫ হাজার টন। সিলেটের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উপজাত হিসেবে পাওয়া কনডেনসেট (তরল হাইড্রোকার্বন) প্রক্রিয়াজাত করে বাংলাদেশ পেট্রল ও অকটেনের একটি বড় অংশ উৎপাদন করে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) দুটি প্ল্যান্ট এবং চারটি বেসরকারি রিফাইনারি নিজস্ব কনডেনসেট থেকে জ্বালানি উৎপাদন করে। এসজিএফএল-এর তথ্যমতে, দেশীয় কনডেনসেট থেকেই দেশের মোট পেট্রলের চাহিদার ৪০-৪৫ শতাংশ পূরণ হচ্ছে। ফলে দেশে ফিনিশড প্রোডাক্ট হিসেবে পেট্রল আমদানির প্রয়োজন হয় না বললেই চলে।
সংকটের মূলে শুধুই ‘প্যানিক বায়িং’ বর্তমান এই কৃত্রিম সংকটের মূল কারণ সরবরাহ ঘাটতি নয়, বরং ক্রেতাদের অতিরিক্ত কেনাকাটা। ইরান যুদ্ধ এবং তেলের মজুত নিয়ে নানা গুজবের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে অহেতুক আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
গা্মইবান্ধা পাম্প মালিক সমিতির এক দায়িত্বশীল ব্যক্তি জানান, “মানুষ অতিরিক্ত তেল কিনে মজুত করার কারণে এই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আগে যে পাম্পে দিনে ৫-৬ হাজার লিটার তেল বিক্রি হতো, এখন সেখানে ২০-৩০ হাজার লিটার চাহিদা তৈরি হয়েছে। সবাই গাড়ির ট্যাংক ফুল করতে চাচ্ছেন।”
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে “নিজস্ব সরবরাহ থেকেই পেট্রলের চাহিদা মোটামুটি মেটানো সম্ভব। আগামী মাসের জন্য প্রয়োজনীয় অকটেনের দ্বিগুণ তেল দেশে আসছে। সুতরাং পাম্পগুলোতে গাড়ির যে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবেই ‘প্যানিক পারচেজ’ বা আতঙ্কজনিত কেনাকাটার ফল।”
পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং কালোবাজারি রুখতে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সম্প্রতি জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানি তেলের যথেষ্ট মজুত রয়েছে।
তিনি বলেন, “বিশ্বব্যাপী উত্তেজনার কারণে আমরা বেশি দাম দিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে তেল এনে মজুত করছি। আমাদের সাপ্লাই লাইন ঠিক আছে, কিন্তু হঠাৎ চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গেলে পাম্পের তেল দ্রুত শেষ হয়ে যায়।”
অবৈধ মজুত ঠেকাতে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান চলছে বলে জানান মন্ত্রী। পাশাপাশি, সব পেট্রল পাম্পে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ করা হয়েছে। রেশনিং ব্যবস্থা হিসেবে সিরাজগঞ্জে ‘ফুয়েল কার্ড’ এবং রাজশাহীতে গাড়ির জোড়-বেজোড় নম্বর অনুযায়ী তেল সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঢাকায় মোটরসাইকেলের জন্য ‘কিউআর কোড’ চালু করা হচ্ছে, যাতে নির্দিষ্ট কোড স্ক্যান করে প্রাপ্যতার ভিত্তিতে তেল দেওয়া যায় এবং কেউ দিনে একবারের বেশি তেল নিতে না পারে।
সরকার বর্তমানে জ্বালানি তেলে দৈনিক ১৬০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। তেলের দাম না বাড়িয়ে জনগণকে সাশ্রয়ী হওয়ার এবং গুজবে কান দিয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল না কেনার আহ্বান জানিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। জনগণ সচেতন হলে দ্রুতই পাম্পগুলোর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Reporter Name 







