
সুদীপ্ত সালাম
উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলো কি শুধু অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকবে, নাকি আধুনিকায়নের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে ফিরে আসতে পারে? এই প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জে অবস্থিত রংপুর চিনিকল।
১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই চিনিকল এক সময় উত্তরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের লোকসান, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ও প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতার কারণে ২০২০ সালে তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রায় ১,৫০০ শ্রমিক-কর্মচারী এবং প্রায় ৩০,০০০ আখ চাষি সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম কায়সার লিংকন রংপুর চিনিকল পুনরায় চালুর বিষয়ে জোরালো দাবি জানিয়েছেন। এরও কয়েকদিন আগে রংপুর জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত “সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং শিল্পায়ন সম্ভাবনা” শীর্ষক আলোচনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব আসাদুল হাবিব দুলু এমপি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর মহোদয়গণের উপস্থিতিতে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লাও এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
এসব আলোচনা উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশাকে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশ প্রতিবছর চিনি আমদানিতে প্রায় ১.৫ থেকে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে। দেশীয় চিনিকলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে শুধু আমদানি নির্ভরতা কমবে না, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে এবং উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের দামের অস্থিরতা থেকেও দেশ কিছুটা সুরক্ষা পাবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত বনাম বেসরকারি খাত: পার্থক্য কোথায়?
বেসরকারি রিফাইনারিগুলো আমদানিকৃত raw sugar-এর ওপর নির্ভর করে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনায় লাভজনকভাবে চলছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত কলগুলো দেশীয় আখের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন ব্যয় বেশি, কাঁচামাল সরবরাহ অনিয়মিত এবং যন্ত্রপাতি পুরনো হওয়ায় এগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে।
আখ চাষেও গভীর সংকট রয়েছে। ন্যায্য মূল্য, সময়মতো পেমেন্ট ও প্রণোদনার অভাবে কৃষকেরা আখ চাষ থেকে সরে গেছেন। একদিকে কম শুল্কে চিনি আমদানি সহজ করা হয়েছে, অন্যদিকে দেশীয় মিলগুলোকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বলা হয়েছে—এই দ্বৈত নীতি আখভিত্তিক শিল্পকে ক্রমশ দুর্বল করে দিয়েছে।
পুনরুজ্জীবনের বাস্তবসম্মত পথ
৭০ বছরের পুরনো কলকে শুধু চালু করলেই চলবে না। প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ আধুনিকায়ন। আধুনিক চিনিকল শুধু চিনি উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি ইথানল, কো-জেনারেশন বিদ্যুৎ ও জৈব সার উৎপাদনের মাধ্যমে একটি লাভজনক শিল্প কমপ্লেক্সে রূপান্তরিত করা যেতে পারে।
এজন্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেল, আধুনিক প্রযুক্তি বিনিয়োগ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকবান্ধব নীতি অপরিহার্য। আখ চাষিদের ন্যায্য দাম ও সময়মতো পেমেন্ট নিশ্চিত করতে হবে। নীতিগত অসামঞ্জস্য দূর করে দেশীয় আখভিত্তিক শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে।
রংপুর চিনিকল পুনরায় চালু করা কেবল একটি বন্ধ শিল্পের পুনরুদ্ধার নয়। এটি একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কৃষি পুনর্জাগরণ, উত্তরাঞ্চলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন বৈষম্য হ্রাসের একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল।
জাতীয় সংসদে বিষয়টি ইতোমধ্যে উত্থাপিত হয়েছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সাহসী নীতিগত সংস্কার এবং বাস্তবভিত্তিক আধুনিকায়ন পরিকল্পনা। সঠিক সিদ্ধান্ত ও সময়োপযোগী উদ্যোগ নেওয়া গেলে মহিমাগঞ্জে অবস্থিত রংপুর চিনিকল আবারও উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতির শক্তিশালী চালিকাশক্তি এবং কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস হয়ে উঠতে পারে।

Reporter Name 






















