
সুদীপ্ত সালাম
রংপুর বিভাগের রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ধরলা, দুধকুমার, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র–যমুনা, জিঞ্জিরাম, হলহলিয়া ও ঘাঘট নদ-নদীর বুকে জেগে ওঠা চরগুলো বাংলাদেশের এক অনন্য কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত জনপদ। আনুমানিক ৪৬০ থেকে ৫০০টি চরাঞ্চলে বসবাস করছে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ মানুষ, যাদের জীবন প্রতিনিয়ত নদীভাঙন, বন্যা, দারিদ্র্য ও বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে চলছে।
এই নদীবাহিত বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলজুড়ে মোট ২৫টি উপজেলার ৯৮টি ইউনিয়ন সারা বছরই সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকে। উত্তরাঞ্চলের প্রায় সব নদ-নদীই উজান থেকে প্রবাহিত হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে হঠাৎ পানির চাপ বৃদ্ধি পায়, যা বন্যা ও নদীভাঙনকে আরও তীব্র ও অনিশ্চিত করে তোলে।
চরাঞ্চলের মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো মৌসুমী চরম বৈপরীত্য। বর্ষায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে ঘরবাড়ি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। আবার একই স্রোত উজান থেকে পলি এনে জমিকে উর্বর করে তুললেও, বালু ও পলির অতিরিক্ত সঞ্চয়ে অনেক ক্ষেত্রে উর্বর জমিও অনুর্বর চরভূমিতে পরিণত হয়। ফলে প্রকৃতির এই দ্বৈত আচরণে কৃষকের ভাগ্য প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়—কখনো আশার, কখনো চরম ক্ষতির।
শুষ্ক মৌসুমে একই অঞ্চল রূপ নেয় ধু-ধু বালুচরে—পানি স্বল্পতা, কৃষির সীমাবদ্ধতা এবং বিচ্ছিন্নতা জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তোলে। অনেক সময় নদীর ভাঙন ও নতুন চর জাগার কারণে মানুষ এক চর থেকে আরেক চরে বারবার স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়, যা একটি স্থায়ী অনিশ্চয়তার জীবন তৈরি করে।
নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের একটি বড় অংশের শেষ আশ্রয় হয় নদী নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, রাস্তার ধারের সরকারি জমি অথবা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরের বস্তি এলাকা। কেউ কেউ আবার পরিবারসহ সারাজীবন এক চর থেকে আরেক চরে ঘুরে বেড়ায়, কখনোই স্থায়ী ঠিকানার নিশ্চয়তা পায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই অনিয়ন্ত্রিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও তীব্র ও অনিয়মিত হয়ে উঠেছে, ফলে প্রায় প্রতি বছরই মানুষকে নতুন করে ঘরবাড়ি গড়ে তুলতে হয়।
বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতিও এই বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী জাতীয় দারিদ্র্যের হার প্রায় ২১.২ শতাংশ, যেখানে PPRC-এর জরিপে এটি প্রায় ২৭.৯৩ শতাংশ পর্যন্ত দেখা গেছে। রংপুর বিভাগে দারিদ্র্যের হার আরও বেশি—প্রায় ৪২ থেকে ৪৭ শতাংশ, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। আর চরাঞ্চলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন গবেষণায় দারিদ্র্যের হার প্রায় ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় বহুগুণ বেশি।
এই উচ্চ দারিদ্র্যের মূল কারণ হলো অনিশ্চিত ভূমি, ঘন ঘন দুর্যোগ, সীমিত জীবিকা এবং মৌলিক সেবার ঘাটতি। ফলে চরাঞ্চলের মানুষ প্রায় স্থায়ীভাবে একটি দারিদ্র্যচক্রে আবদ্ধ থাকে।
চরাঞ্চলের অর্থনীতি মূলত কৃষি, মৎস্য, পশুপালন ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আয় অনিশ্চিত ও মৌসুমী হওয়ায় জীবিকার চাপ অত্যন্ত বেশি। ফলে পুরুষদের একটি বড় অংশ বছরের অর্ধেকের বেশি সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হয়। এই সময়ে পরিবারে নারী ও শিশুরা চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটায়।
যোগাযোগ ব্যবস্থা চরাঞ্চলের আরেকটি বড় সংকট। বর্ষায় নৌপথই প্রধান ভরসা হলেও তা ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিয়মিত। শুষ্ক মৌসুমে কাদা-বালুচর ও খড়ালপায়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চলাচল করতে হয়। এই বাস্তবতা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাজারব্যবস্থা ও জরুরি সেবার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, ফলে মৌলিক সেবাগুলো অনেকাংশে মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যায়।
এই দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে চরাঞ্চলে সরকারি ও বেসরকারি সেবার উপস্থিতিও অত্যন্ত সীমিত। অনেক সরকারি কর্মচারীর এই অঞ্চলে পোস্টিং থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ মানুষ তাদের চিনেই না বা সেবা সম্পর্কে জানেই না। একইসঙ্গে অনেক চর এখনো ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবার বাইরে রয়ে গেছে, ফলে মানুষ সঞ্চয়, ঋণ বা নিরাপদ লেনদেনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত।
চরাঞ্চলের উন্নয়নের অন্যতম বড় কাঠামোগত সমস্যা হলো ভূমির অনিশ্চিত মালিকানা। প্রচলিত আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট শর্তে সিকস্তি জমি পুনরায় জেগে উঠলে মালিকানা ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ জটিল ও অনিশ্চিত। অনেক ক্ষেত্রে মালিকরা বছরের পর বছর পুরনো কাগজপত্রের ভিত্তিতে খাজনা পরিশোধ করে যান, মালিকানা ধরে রাখার আশায়। অথচ অনেক জমিই বাস্তবে খাস হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা থাকলেও তা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত নয়। এই অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ, স্থায়ী বসতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চরাঞ্চলের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা মানুষের সামাজিক জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। সীমিত চলাচল, শিক্ষায় অনগ্রসরতা এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চিত জীবনযাত্রার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতার ঘাটতি দেখা যায়। এর ফলে কিছু এলাকায় এখনও কুসংস্কার ও গোঁড়ামির প্রভাব বিদ্যমান, যা নারী, শিশু ও তরুণদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক অংশগ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
তবে চরাঞ্চলের বাস্তবতা শুধু বঞ্চনার গল্প নয়। চরের মানুষ অত্যন্ত পরিশ্রমী, অভিযোজনক্ষম এবং সাহসী। প্রকৃতির বিরূপ আচরণের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে তারা নিজেদের টিকে থাকার পথ তৈরি করেছে। এই দৃঢ়তা ও সহনশীলতাই চরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় শক্তি।
তবুও সামাজিক বাস্তবতায় তারা পিছিয়ে। মূল ভূখণ্ডের মানুষের সঙ্গে চরাঞ্চলের মানুষের পরিচয় ও অবস্থানের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন লক্ষ করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে “চরুয়া” বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয় এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক ক্ষেত্রেও বৈষম্যের মুখে পড়তে হয়।
সবকিছু বিবেচনায় স্পষ্ট যে, চরাঞ্চলের বাস্তবতা শুধু ভৌগোলিক নয়—এটি একটি গভীর আর্থ-সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের প্রতিফলন। এই বৈষম্য দূর করতে প্রয়োজন সমন্বিত নীতি, লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ এবং চরাঞ্চল-কেন্দ্রিক বিশেষ উন্নয়ন কাঠামো।
এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্বগুলোতে চরাঞ্চলের দুর্যোগ, জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, নারী ও তরুণ সমাজসহ বিভিন্ন খাতভিত্তিক বাস্তবতা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে।

Reporter Name 
























