
এবিএস লিটন, গোবিন্দগঞ্জ প্রতিনিধি:
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের খননকাজের পর লোকচক্ষুর সামনে এসেছে ঐতিহাসিক রাজা বিরাটের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। খননে ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের প্রবেশপথ, বসার স্থানসহ বিভিন্ন প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে বিপুল পর্যটন সম্ভাবনা থাকলেও পর্যটকদের জন্য বিশ্রামাগার, শৌচাগার ও পানীয় জলের মতো নূন্যতম সুযোগ-সুবিধা না থাকায় এই উদ্যোগ পূর্ণতা পাচ্ছে না। ফলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পর্যটক সমাগম বাড়ছে না।
ইতিহাস ও ঐতিহ্য: গাইবান্ধার ইতিহাস ও ঐতিহ্যগ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার রাজাহার ইউনিয়নের বিরাট রাজার ঢিবি বা গড় উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এখানকার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লিপিবদ্ধ করে গেছেন। স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের মতে, একসময় এই স্থানে বিশাল প্রাচীরবেষ্টিত রাজা বিরাটের বসতি ছিল, যা ‘বিরাট নগর’ নামে পরিচিত। প্রাচীনকালে এটি একটি দুর্গনগরী ছিল। গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এই স্থানটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। প্রতিবছর বৈশাখ মাসে এখানে মাসব্যাপী তীর্থমেলায় হিন্দুধর্মাবলম্বী হাজারো পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে।
খনন ও প্রাপ্ত নিদর্শন: দীর্ঘদিনের অবহেলিত এই প্রাচীন ঢিবিতে প্রথমবারের মতো প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ পরিচালনা করে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক দল। খননকারী দলের প্রধান ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. নাহিদ সুলতানা খননকালে জানিয়েছিলেন, “ধারণার চেয়েও বড় আকারের অবকাঠামো পাওয়া গেছে। পুরো খননকাজ শেষ হলে এই নিদর্শনগুলোর সঠিক সময়কাল জানা যাবে।” ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো প্রাচীন ও মধ্যযুগের নিদর্শন।
পর্যটকদের ভোগান্তি ও দাবি: খননকাজের পর থেকে স্থানীয় দর্শনার্থী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা আসতে শুরু করেছেন। বগুড়ার শেরপুর থেকে আসা পর্যটক অজয় কুমার সাহা বলেন, “পৌরাণিক কাহিনী মতে এটি ছিল রাজা বিরাটের আবাসস্থল, যেখান থেকে তিনি রাজ্য শাসন করতেন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের খনন কার্যক্রম অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে পর্যটকদের জন্য এখানে কোনো বিশ্রামাগার বা টয়লেটের ব্যবস্থা নেই, যা আমাদের জন্য বিড়ম্বনার।”
পাঁচবিবি উপজেলার সালাইপুর গ্রাম থেকে আসা আরেক দর্শনার্থী বলেন, “অধিক খননকাজের মাধ্যমে এই ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থান থেকে প্রাচীন সব নিদর্শন বের করে আনা হোক। একইসঙ্গে পর্যটকদের সুবিধার্থে এখানে অবিলম্বে বিশ্রামাগার ও টয়লেট স্থাপন করা জরুরি।”
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য: রাজা বিরাট শ্রী শ্রী মদন মোহন জিউ বিগ্রহ মন্দির উন্নয়ন কমিটির কর্মকর্তা শম্ভুনাথ বর্মণ বলেন, “খননকাজের মাধ্যমে পুরাকীর্তির অনেক কিছুই দৃশ্যমান হয়েছে, তবে পুরোপুরি খনন কাজ সম্পন্ন করা দরকার। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ালে নতুন প্রজন্ম রাজা বিরাটের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে এবং পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে এটি জনপ্রিয়তা পাবে।”
দিনাজপুর, জয়পুরহাট ও বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সড়কপথে সরাসরি যাতায়াতের সুবিধা থাকায়, অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা গেলে বিরাট রাজার এই ঐতিহাসিক স্থানটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Reporter Name 
























