Dhaka ০৪:১০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ

জাল আর নৌকাই সম্বল:গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেলেদের নিরন্তর জীবনসংগ্রাম

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:১৭:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪০ Time View

আফতাব হোসেন, গাইবান্ধা:

বিস্তীর্ণ জলরাশি, আর মাথার ওপর মেঘলা আকাশ। সেই বিশাল জলরাশির বুকে ছোট একটি ডিঙি নৌকায় জাল গুছিয়ে নিচ্ছেন এক জেলে, আর অন্যজন লগি ঠেলে নিপুণ হাতে নৌকা সামলাচ্ছেন। এ দৃশ্য গাইবান্ধার ওপর দিয়ে বয়ে চলা প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্র নদের। প্রতিদিন ভোর থেকে জীবিকার তাগিদে এভাবেই নদীর বুকে নেমে পড়েন এ অঞ্চলের হাজারো জেলে।

ব্রহ্মপুত্রের বিস্তীর্ণ এই বুকে জেলেদের জীবন যেন প্রতিদিনের এক যুদ্ধ। মাছ ধরাই তাদের আদি পেশা, আর এই নদীই তাদের অন্নদাতা। ছোট নৌকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা মাঝনদীতে চলে যান। একজন জাল গোটান বা ফেলেন, তো অন্যজন নৌকার হাল ধরেন। সারাদিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে চলে তাদের এই সংগ্রাম। দূরে দেখা যায় এমন আরও অসংখ্য নৌকা, যারা একইভাবে জীবিকার সন্ধানে ব্যস্ত।

সাঘাটার জেলে বলরাম দাস বলেন, নদীকে ঘিরেই তাদের জীবন-জীবিকা আবর্তিত হলেও সময় এখন অনেকটাই বদলেছে। আগের মতো নদীতে এখন আর রুই, কাতলা, বোয়াল, আইড়সহ দেশি প্রজাতির সুস্বাদু মাছ তেমন একটা পাওয়া যায় না। নদীর নাব্যতা সংকট, দূষণ, অবৈধ কারেন্ট জালের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ব্রহ্মপুত্রে মাছের চরম আকাল দেখা দিয়েছে। সারাদিন জাল ফেলেও অনেক সময় পরিবারের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত মাছ মেলে না। দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির বাজারে সারাদিনের সামান্য আয়ে সংসার চালানো তাদের জন্য এখন রীতিমতো কঠিন দায় হয়ে পড়েছে।

ফুলছড়ি ঘাটের এক প্রবীণ জেলে নিতাই চন্দ্র আক্ষেপ করে বলেন, “বাপ-দাদার আমল থেইকা এই নদীতেই মাছ ধরি। আগে একবার জাল ফেললে নৌকা ভইরা যাইত, আর এহন সারাদিন ঘুইরাও ইঞ্জিনের তেলের পয়সা ওঠে না। তাও নদী ছাড়া আমাগো আর কোনো উপায় নাই।”

গাইবান্ধা জেলা মৎস্যজীবী সমিতির নেতা নিপেন দাস জানান, শুধু মাছ ধরে এখন জীবিকা নির্বাহ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, জেলায় নিবন্ধিত অনেক জেলে থাকলেও সরকারি সহায়তা সবার ভাগ্য জোটে না। বিশেষ করে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারিভাবে যে সহায়তা দেওয়া হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য।

নদীভাঙন আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করে টিকে থাকা এই মানুষগুলোর জীবন যেন ব্রহ্মপুত্রের ঢেউয়ের মতোই উত্থান-পতনে ভরা। তবুও বুকভরা আশা নিয়ে প্রতিদিন তারা নতুন করে জাল ফেলেন নদীতে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ, বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং জেলেদের জন্য বিশেষ রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হলে ব্রহ্মপুত্র পাড়ের এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর জীবন কিছুটা হলেও সহজ হতো বলে মনে করেন স্থানীয় সচেতন মহল।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গোবিন্দগঞ্জে বিষাক্ত মদপানে যুবকের মৃত্যু, অসুস্থ ২

জাল আর নৌকাই সম্বল:গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেলেদের নিরন্তর জীবনসংগ্রাম

Update Time : ০১:১৭:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আফতাব হোসেন, গাইবান্ধা:

বিস্তীর্ণ জলরাশি, আর মাথার ওপর মেঘলা আকাশ। সেই বিশাল জলরাশির বুকে ছোট একটি ডিঙি নৌকায় জাল গুছিয়ে নিচ্ছেন এক জেলে, আর অন্যজন লগি ঠেলে নিপুণ হাতে নৌকা সামলাচ্ছেন। এ দৃশ্য গাইবান্ধার ওপর দিয়ে বয়ে চলা প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্র নদের। প্রতিদিন ভোর থেকে জীবিকার তাগিদে এভাবেই নদীর বুকে নেমে পড়েন এ অঞ্চলের হাজারো জেলে।

ব্রহ্মপুত্রের বিস্তীর্ণ এই বুকে জেলেদের জীবন যেন প্রতিদিনের এক যুদ্ধ। মাছ ধরাই তাদের আদি পেশা, আর এই নদীই তাদের অন্নদাতা। ছোট নৌকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা মাঝনদীতে চলে যান। একজন জাল গোটান বা ফেলেন, তো অন্যজন নৌকার হাল ধরেন। সারাদিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে চলে তাদের এই সংগ্রাম। দূরে দেখা যায় এমন আরও অসংখ্য নৌকা, যারা একইভাবে জীবিকার সন্ধানে ব্যস্ত।

সাঘাটার জেলে বলরাম দাস বলেন, নদীকে ঘিরেই তাদের জীবন-জীবিকা আবর্তিত হলেও সময় এখন অনেকটাই বদলেছে। আগের মতো নদীতে এখন আর রুই, কাতলা, বোয়াল, আইড়সহ দেশি প্রজাতির সুস্বাদু মাছ তেমন একটা পাওয়া যায় না। নদীর নাব্যতা সংকট, দূষণ, অবৈধ কারেন্ট জালের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ব্রহ্মপুত্রে মাছের চরম আকাল দেখা দিয়েছে। সারাদিন জাল ফেলেও অনেক সময় পরিবারের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত মাছ মেলে না। দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির বাজারে সারাদিনের সামান্য আয়ে সংসার চালানো তাদের জন্য এখন রীতিমতো কঠিন দায় হয়ে পড়েছে।

ফুলছড়ি ঘাটের এক প্রবীণ জেলে নিতাই চন্দ্র আক্ষেপ করে বলেন, “বাপ-দাদার আমল থেইকা এই নদীতেই মাছ ধরি। আগে একবার জাল ফেললে নৌকা ভইরা যাইত, আর এহন সারাদিন ঘুইরাও ইঞ্জিনের তেলের পয়সা ওঠে না। তাও নদী ছাড়া আমাগো আর কোনো উপায় নাই।”

গাইবান্ধা জেলা মৎস্যজীবী সমিতির নেতা নিপেন দাস জানান, শুধু মাছ ধরে এখন জীবিকা নির্বাহ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, জেলায় নিবন্ধিত অনেক জেলে থাকলেও সরকারি সহায়তা সবার ভাগ্য জোটে না। বিশেষ করে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারিভাবে যে সহায়তা দেওয়া হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য।

নদীভাঙন আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করে টিকে থাকা এই মানুষগুলোর জীবন যেন ব্রহ্মপুত্রের ঢেউয়ের মতোই উত্থান-পতনে ভরা। তবুও বুকভরা আশা নিয়ে প্রতিদিন তারা নতুন করে জাল ফেলেন নদীতে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ, বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং জেলেদের জন্য বিশেষ রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হলে ব্রহ্মপুত্র পাড়ের এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর জীবন কিছুটা হলেও সহজ হতো বলে মনে করেন স্থানীয় সচেতন মহল।