Dhaka ০১:৩৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রে মাছের আকাল: সংকটে ৩০ হাজার জেলে পরিবার

  • আফতাব হোসেন
  • Update Time : ০৫:১৮:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১৩১ Time View

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ঝাড়াবর্ষা গ্রামের বলরাম দাস। বংশপরম্পরায় ব্রহ্মপুত্র নদে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু বর্তমানে নদে পানি না থাকা এবং যত্রতত্র জাল ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মিঠাপানির মাছের উৎস এখন হুমকির মুখে। বলরাম দাসের মতো গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নদ-নদী তীরবর্তী প্রায় ৩০ হাজার জেলে পরিবারের জীবন-জীবিকা এখন চরম সংকটে।

গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীতে উন্মুক্তভাবে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে অন্তত ৩০ হাজার পরিবার। বংশপরম্পরায় এই পেশায় জড়িত মানুষগুলোর বিকল্প কোনো আয়ের পথ নেই। কিন্তু নদীর নাব্য সংকটে মিঠাপানির মাছের দেখা মিলছে না। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন তারা।

সরেজমিনে ফুলছড়ির বালাসীঘাটে কথা হয় জেলে নিপেন চন্দ্রের সঙ্গে। তিনি বলেন, “ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত মুঠোজাল নিয়ে নদীতে মাছ ধরি। কিন্তু দিন শেষে আধা কেজির বেশি মাছ পাওয়া যায় না। বাজারে এসে গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় তা বিক্রি করে কোনোমতে চাল-ডাল কিনে বাড়ি ফিরতে হয়।”

একই ঘাটের মাছ ব্যবসায়ী আলী আকবর বলেন, “জেলেরা মাছ ধরে আনলে আমরা তা কিনে বাজারে বিক্রি করি। কিন্তু সারাদিন অপেক্ষা করে অধিকাংশ দিনই মাছশূন্য হয়ে হাটে ফিরতে হয়।” সদর উপজেলার কামারজানি ঘাটের আজগর আলী বলেন, “নদীর মাছই উপার্জনের একমাত্র ভরসা। কিন্তু পানি না থাকলে মাছ ধরব কোথায়? আর যেখানে সামান্য পানি আছে, সেখানেও মাছ মিলছে না।”

গাইবান্ধা জেলা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি জানান, একসময় উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরেই হাজার হাজার পরিবার চলত। কিন্তু সেই সুযোগ এখন সংকুচিত। নদী, বিল-ঝিল ইজারা দেওয়া হচ্ছে অথবা প্রভাবশালীরা দখল করে মাছ চাষ করছে। এতে সাধারণ মৎস্যজীবীরা বেকার হয়ে পড়ছেন। তিনি নদ-নদীতে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও উন্মুক্তভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সুদৃষ্টি কামনা করেন।

মাছ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে গাইবান্ধা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনোয়ারুল কবির আহম্মেদ বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন ও নাব্যসংকটের কারণে মিঠাপানির মাছ কমেছে। এ ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে পোনা নিধন, জমিতে কীটনাশকের ব্যবহার এবং নদীতে কারেন্ট জালের ব্যবহার অন্যতম কারণ।” তবে দেশীয় মাছ রক্ষা ও বৃদ্ধিতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে পানি বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদ ড. আইনুন নিশাত বলেন, “নদীতে মাছ না থাকার জন্য আমরাই দায়ী। নদী না বাঁচলে মাছ থাকবে কীভাবে? নদীর সঙ্গে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত, কিন্তু এটা নিয়ে কেউ ভাবে না।” তিনি আরও বলেন, “এখনও সময় আছে। নদীর গতিপ্রকৃতি ঠিক রাখতে এবং নদীগুলোকে বাঁচাতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সঠিক ও যৌথ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।”

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রে মাছের আকাল: সংকটে ৩০ হাজার জেলে পরিবার

Update Time : ০৫:১৮:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ঝাড়াবর্ষা গ্রামের বলরাম দাস। বংশপরম্পরায় ব্রহ্মপুত্র নদে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু বর্তমানে নদে পানি না থাকা এবং যত্রতত্র জাল ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মিঠাপানির মাছের উৎস এখন হুমকির মুখে। বলরাম দাসের মতো গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নদ-নদী তীরবর্তী প্রায় ৩০ হাজার জেলে পরিবারের জীবন-জীবিকা এখন চরম সংকটে।

গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীতে উন্মুক্তভাবে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে অন্তত ৩০ হাজার পরিবার। বংশপরম্পরায় এই পেশায় জড়িত মানুষগুলোর বিকল্প কোনো আয়ের পথ নেই। কিন্তু নদীর নাব্য সংকটে মিঠাপানির মাছের দেখা মিলছে না। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন তারা।

সরেজমিনে ফুলছড়ির বালাসীঘাটে কথা হয় জেলে নিপেন চন্দ্রের সঙ্গে। তিনি বলেন, “ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত মুঠোজাল নিয়ে নদীতে মাছ ধরি। কিন্তু দিন শেষে আধা কেজির বেশি মাছ পাওয়া যায় না। বাজারে এসে গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় তা বিক্রি করে কোনোমতে চাল-ডাল কিনে বাড়ি ফিরতে হয়।”

একই ঘাটের মাছ ব্যবসায়ী আলী আকবর বলেন, “জেলেরা মাছ ধরে আনলে আমরা তা কিনে বাজারে বিক্রি করি। কিন্তু সারাদিন অপেক্ষা করে অধিকাংশ দিনই মাছশূন্য হয়ে হাটে ফিরতে হয়।” সদর উপজেলার কামারজানি ঘাটের আজগর আলী বলেন, “নদীর মাছই উপার্জনের একমাত্র ভরসা। কিন্তু পানি না থাকলে মাছ ধরব কোথায়? আর যেখানে সামান্য পানি আছে, সেখানেও মাছ মিলছে না।”

গাইবান্ধা জেলা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি জানান, একসময় উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরেই হাজার হাজার পরিবার চলত। কিন্তু সেই সুযোগ এখন সংকুচিত। নদী, বিল-ঝিল ইজারা দেওয়া হচ্ছে অথবা প্রভাবশালীরা দখল করে মাছ চাষ করছে। এতে সাধারণ মৎস্যজীবীরা বেকার হয়ে পড়ছেন। তিনি নদ-নদীতে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও উন্মুক্তভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সুদৃষ্টি কামনা করেন।

মাছ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে গাইবান্ধা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনোয়ারুল কবির আহম্মেদ বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন ও নাব্যসংকটের কারণে মিঠাপানির মাছ কমেছে। এ ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে পোনা নিধন, জমিতে কীটনাশকের ব্যবহার এবং নদীতে কারেন্ট জালের ব্যবহার অন্যতম কারণ।” তবে দেশীয় মাছ রক্ষা ও বৃদ্ধিতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে পানি বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদ ড. আইনুন নিশাত বলেন, “নদীতে মাছ না থাকার জন্য আমরাই দায়ী। নদী না বাঁচলে মাছ থাকবে কীভাবে? নদীর সঙ্গে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত, কিন্তু এটা নিয়ে কেউ ভাবে না।” তিনি আরও বলেন, “এখনও সময় আছে। নদীর গতিপ্রকৃতি ঠিক রাখতে এবং নদীগুলোকে বাঁচাতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সঠিক ও যৌথ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।”