
আফতাব হোসেন:
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় যমুনা নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চলে এখন চলছে আখ মাড়াই ও গুড় তৈরির ধুম। শীতের সকালে কুয়াশা ভেদ করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে আখের রস জ্বাল দেওয়ার মিষ্টি ঘ্রাণ। বাজারে যখন ভেজাল গুড়ের ছড়াছড়ি, তখন সাঘাটার এই চরাঞ্চলে চোখের সামনে তৈরি খাঁটি ও ভেজালমুক্ত গুড় কিনতে ভিড় করছেন দূর-দূরান্তের মানুষ।
সরেজমিনে সাঘাটার যমুনার তীরবর্তী এলাকা মুন্সিরহাট, বাঁশহাটা, পাখিমারা, হাসিলকান্দি, সাথালিয়া, হলদিয়া ও কানাইপাড়া ঘুরে দেখা যায়, কৃষকরা উৎসবমুখর পরিবেশে দেশীয় পদ্ধতিতে আখ থেকে গুড় উৎপাদন করছেন। এখানকার উৎপাদিত গুড় পাইকারি বাজারের পাশাপাশি খুচরা ক্রেতাদের কাছেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
হাসিলকান্দির গুড় উৎপাদনকারী চাষি হাফিজার রহমান জানান, তাঁরা সম্পূর্ণ দেশীয় ও সনাতন পদ্ধতিতে এই গুড় তৈরি করেন। কোনো প্রকার ক্ষতিকারক রাসায়নিক ব্যবহার না করায় এই গুড়ের স্বাদ ও মান বজায় থাকে। তিনি বলেন, “বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা সরাসরি এখানে এসে গুড় কিনছেন। আমরা লাভ কম রেখে ন্যায্যমূল্যেই গুড় বিক্রি করছি।”
অপর চাষি গফুর মন্ডল বলেন, “নদীর চরে আখ চাষ আমাদের জন্য বাড়তি আয়। আখ বন্যা সহনশীল ফসল হওয়ায় পানিতে ডুবে গেলেও তেমন ক্ষতি হয় না। আর বর্তমানে গুড়ের দাম ভালো থাকায় বেশ লাভও হচ্ছে।” তিনি জানান, প্রায় ৯০০ গ্রাম ওজনের এক মুঠো গুড় ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে ভেজাল গুড়ের দাপটে অতিষ্ঠ ক্রেতারা এখানে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। গুড় কিনতে আসা ক্রেতা আরিফ হোসেন বলেন, “বাজারে তো এখন ভেজাল গুড়ে সয়লাব। এখানে চোখের সামনে নিজের পছন্দমতো খাঁটি গুড় তৈরি হতে দেখে কিনছি। এতে বেশ তৃপ্তি পাচ্ছি।”
গুড় তৈরির পরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন স্থানীয়রাও। সাঘাটার ঘটিয়া গ্রামের বাসিন্দা রাতুল ইসলাম বলেন, “এখানে অত্যন্ত স্বাস্থ্যসম্মতভাবে আখের রস থেকে গুড় তৈরি হচ্ছে। ধোঁয়া ওঠা গুড় দেখে লোভ সামলাতে না পেরে ৫ মুঠো গুড় কিনে নিলাম।”
জেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের তীরে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছে। যমুনা নদী ও এর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে আখ চাষের পরিধি ক্রমেই বাড়ছে। আখ বন্যা সহনশীল ফসল হওয়ায় চরাঞ্চলের চাষিরা দিন দিন এই চাষে ঝুঁকছেন এবং লাভবানও হচ্ছেন।
এ বিষয়ে কৃষিবিদ ড. মোজাম্মেল হক বলেন, “চরাঞ্চলের মাটি আখ চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এই ফসলে রোগবালাই ও পরিচর্যা তুলনামূলক কম লাগে, আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগেও ঝুঁকি কম থাকে। তাই চরাঞ্চলের পতিত জমিগুলোতে আখ চাষ করলে কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারবেন।”
যমুনার চরে উৎপাদিত এই খাঁটি গুড় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

Reporter Name 







