Dhaka ০৪:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলার প্রতিবাদে গাইবান্ধায় বিক্ষোভ আব্বাসউদ্দীনের জন্মবার্ষিকীতে ভাওয়াইয়া আসর: ও মোর কালারে কালা পঞ্চগড়ের আকাশে মায়াবী কাঞ্চনজঙ্ঘা, মেঘ সরতেই ধরা দিল হিমালয়ের রূপালি মুকুট ২৪ ঘন্টায় ডেঙ্গুতে ১১ ও হাম উপসর্গে ৭ জনের মৃত্যু দিনাজপুরকে একটি সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হবে: সমাজকল্যাণ মন্ত্রী যুবদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভা জিডি নিয়ে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন, অপপ্রচারের অভিযোগ খেলতে গিয়ে ডোবার পানিতে ডুবে ভাই-বোনের মৃত্যু কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের শহীদ মিনার ভাঙচুর, অভিযুক্ত প্রশিক্ষক পলাতক তরুণদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা

শরতসন্ধ্যায় সুরের মুগ্ধতা ছড়ালেন অনন্যা

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৯:৩৫:১৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
  • ১৯১ Time View

কায়সার রহমান রোমেল: আশ্বিনের সন্ধ্যা নামতেই গাইবান্ধা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনের মঞ্চে জ্বলে উঠল সুরের আলো। নীরব হয়ে এল প্রেক্ষাগৃহ। তবলার ঠেকা, কী-বোর্ডের টান আর গিটারের সুরের সঙ্গে ভেসে এল একটি কণ্ঠ। সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত নানা আঙ্গিকের গানে শ্রোতারা যেন খুঁজে পেলেন অপার্থিব সুখের ঠিকানা।

গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘মোহনা’র ১৮৮তম মাসিক সংগীতাসর অনুষ্ঠিত হয়। আমন্ত্রিত শিল্পী ছিলেন বেতার ও টেলিভিশনের পরিচিত কণ্ঠশিল্পী অনন্যা আচার্য্য। জেলার একমাত্র নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিসেবে পরিচিত এই আসরে সুর, তাল আর লয়ের খেলায় শরতের সন্ধ্যা হয়ে ওঠে মোহনীয়।

অনুষ্ঠানের সূচনা হয় এক মিনিট নীরবতার মধ্য দিয়ে। যে-সব গুণীজন না-ফেরার দেশে চলে গেছেন, দাঁড়িয়ে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান উপস্থিত সবাই। এরপর মোহনার কার্যনির্বাহী সদস্য, গীতিকবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক অমিতাভ দাশ হিমুনের উপস্থাপনায় শুরু হয় মূল পর্ব। সোনালী ব্যাংকের সাবেক জিএম শেখ শাহ আলী মোসাদ্দেক মোহনার পক্ষ থেকে অতিথি শিল্পীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান।

মঞ্চে অনন্যার সঙ্গে ছিলেন একদল বাদ্য শিল্পী। মাহমুদ সাগর মহব্বতের তবলার সঙ্গে মিশে যায় এস.এম স্বাধীনের কী-বোর্ড, মানিক বর্মনের অক্টো-প্যাডের তাল, তানভীর মাহাতাবের গিটার ও ইমতিয়াজ অভিনের বেজ-গিটার। এই সম্মিলিত বাদ্যের মূর্ছনায় অনন্যা একের পর এক গেয়ে শোনান গান।

নজরুলগীতি ও ঠুমরির পাশাপাশি তাঁর কণ্ঠে উঠে আসে ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘ও আমার ময়না গো’, ‘চিঠি দিও প্রতিদিন- চিঠি দিও’, ‘নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা’, ‘জ্যোৎস্না করেছে আড়ি’, ‘ওই গাছের পাতায় রোদের ঝিকিমিকি’ এবং ‘শোনো গো দখিনো হাওয়া’। ছিল চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানও। সব মিলিয়ে ১৪টি জনপ্রিয় গান পরিবেশন করে ভরা মিলনায়তনের দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন তিনি। হৃদয় উজাড় করে গাওয়া এসব গানে শ্রোতাদের মনে ছড়িয়ে পড়ে ভালোলাগার অনুভূতি।

পরিবেশনা শেষে অনন্যাকে উত্তরীয় পরিয়ে ক্রেস্ট তুলে দেন প্রধান অতিথি, গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক ড. মো. মনিরুজ্জামান। জেলা প্রশাসককেও ফুলেল শুভেচ্ছা ও উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করেন মোহনার সভাপতি শাহ মশিউর রহমান। সংকলন লাইব্রেরির স্বত্বাধিকারী যামিনি রঞ্জন সেন অনন্যাকে উপহার দেন একটি সৃজনশীল বই।

অনুষ্ঠানের এক বিশেষ মুহূর্ত তৈরি হয়, যখন উপস্থাপক অমিতাভ দাশ হিমুন দর্শকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন জেলা প্রশাসকের কবি-পরিচয়ের। ড. মনিরুজ্জামানের কাব্যগ্রন্থ ‘চোখের ভেতর যে নদী’, ‘অনিরুদ্ধ পঙত্তিমালা’, ‘সমুদ্র সংলাপ’ ও ‘হঠাৎ সন্ধ্যা আসে এক’-এর কথা তুলে ধরেন তিনি এবং তাঁর একটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনান।

বক্তব্যে জেলা প্রশাসক বলেন, ৩৩ বছর ধরে যেভাবে এই সংগঠন সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। তাঁর মতে, শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চার মধ্য দিয়েই একটি সৃজনশীল প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি মোহনার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেন।

অনন্যা আচার্য্যের জন্ম ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পোপাদিয়ায়। বাবা প্রবীর আচার্য্য, মা কণা আচার্য্য। সংগীতে হাতেখড়ি মায়ের কাছেই। মাত্র তিন বছর বয়সে মায়ের শিক্ষক শীতল ঘোষালের কাছে তালিম নেওয়া শুরু করেন। পরে চাঁদপুরে শঙ্কর আচার্য্যের কাছেও শেখেন।

বাবার কর্মসূত্রে পরিবার কুমিল্লায় এলে সেখানে অলকা দাশের কাছে তালিম নেন তিনি। তবে বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিল মেয়েকে ঢাকায় গান শেখানোর। তাই প্রতি শুক্রবার কুমিল্লা থেকে ঢাকায় যেতেন অনন্যা। সেখানে একে একে প্রয়াত সঞ্জীব দে, রুমানা মোর্শেদ, কনকচাঁপা, মইনুল ইসলাম খান, ফেরদৌস আরা ও ফরিদা পারভীনের কাছে তালিম নেন। ২০১১ সালে পরিবার ঢাকায় স্থায়ী হলে ঢাকা ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজে পূর্ণ বৃত্তি পেয়ে পড়ার সুযোগ পান। ঢাকায় বিজন চন্দ্র মিন্ত্রী, অনীল কুমার সাহা, অসিত দে, প্রিয়াংকা গোপ, পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী, সমরজিৎ রায় ও সংগীতাচার্য আলী এফ এম রেজোয়ানের কাছেও তালিম নিয়েছেন তিনি।

শৈশব থেকেই সাফল্যের ধারা অব্যাহত তাঁর। ২০০৬ সালে জাতীয় শিশু কিশোর প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক জেতেন। একই বছর চট্টগ্রাম আর্য সংগীত প্রতিযোগিতায় ৫টি বিভাগে প্রথম হয়ে চ্যাম্পিয়ান হিসেবে স্বর্ণপদক পান। ২০০৭ সালেও জাতীয় শিশুকিশোর প্রতিযোগিতায় প্রথম হন এবং আরশীনগর প্রতিযোগিতায় ৩টি বিষয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ২০০৮ সালে চ্যানেল আই ক্ষুদে গানরাজ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মিডিয়ায় পা রাখেন এবং ১৬তম স্থান অধিকার করেন, পরের বছর ওই প্রতিযোগিতায় হন ৬ষ্ঠ।

বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও শিল্পকলা একাডেমির তালিকাভুক্ত শিল্পী। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শাস্ত্রীয় সংগীতে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করে এখন রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। গানের মধ্য দিয়েই মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই পেতে চান অনন্যা, তাঁর স্বপ্ন, তাঁর গান থাকবে সবার মুখে মুখে।

গাইবান্ধার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মোহনা আজ ৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী নাম। সংগঠনের নামেই পরিচিত এর মাসিক সংগীতানুষ্ঠান। আয়োজকদের দাবি, মোহনা দেশের একমাত্র সংগঠন, যারা প্রতি মাসে নিয়মিত সংগীতানুষ্ঠান আয়োজন করে। তাঁদের ভাষ্যমতে, দেশ-বিদেশে এই আসরের পরিচিতি বেড়েছে এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রতি মাসেই সংগঠনটিকে অভিনন্দন জানান।

মোহনার কর্মকর্তারা বলেন, এ সাফল্য গাইবান্ধাবাসীর সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। ‘মোহনা মাটির কথা বলে, বাঙালির শেকড়ের সংস্কৃতির কথা বলে’- এই বিশ্বাস থেকেই তাঁরা পথ চলছেন। প্রতিবার আমন্ত্রিত শিল্পীরা সাড়া দিয়ে আসরকে সমৃদ্ধ করেছেন বলেও জানান তাঁরা।

আয়োজকদের মতে, মোহনার আরেকটি বড়ো দায়িত্ব নতুন প্রজন্মকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত করা, যাতে মানবিক মূল্যবোধের চর্চার মধ্য দিয়ে সমাজের কল্যাণ নিশ্চিত হয়। সংগীতপিপাসু দর্শকদের চাহিদা মেটাতে ভবিষ্যতেও এই আয়োজন অব্যাহত থাকবে, এমনটাই প্রত্যাশা তাঁদের।

রাত সাড়ে নয়টায় যখন পর্দা নামল, তখনো মিলনায়তনের বাতাসে লেগে ছিল সুরের রেশ। শরতের সেই সন্ধ্যায় গাইবান্ধার সংস্কৃতিপ্রেমীরা ঘরে ফিরলেন, অপেক্ষায় রইলেন পরবর্তী আসরের।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলার প্রতিবাদে গাইবান্ধায় বিক্ষোভ

শরতসন্ধ্যায় সুরের মুগ্ধতা ছড়ালেন অনন্যা

Update Time : ০৯:৩৫:১৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

কায়সার রহমান রোমেল: আশ্বিনের সন্ধ্যা নামতেই গাইবান্ধা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনের মঞ্চে জ্বলে উঠল সুরের আলো। নীরব হয়ে এল প্রেক্ষাগৃহ। তবলার ঠেকা, কী-বোর্ডের টান আর গিটারের সুরের সঙ্গে ভেসে এল একটি কণ্ঠ। সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত নানা আঙ্গিকের গানে শ্রোতারা যেন খুঁজে পেলেন অপার্থিব সুখের ঠিকানা।

গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘মোহনা’র ১৮৮তম মাসিক সংগীতাসর অনুষ্ঠিত হয়। আমন্ত্রিত শিল্পী ছিলেন বেতার ও টেলিভিশনের পরিচিত কণ্ঠশিল্পী অনন্যা আচার্য্য। জেলার একমাত্র নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিসেবে পরিচিত এই আসরে সুর, তাল আর লয়ের খেলায় শরতের সন্ধ্যা হয়ে ওঠে মোহনীয়।

অনুষ্ঠানের সূচনা হয় এক মিনিট নীরবতার মধ্য দিয়ে। যে-সব গুণীজন না-ফেরার দেশে চলে গেছেন, দাঁড়িয়ে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান উপস্থিত সবাই। এরপর মোহনার কার্যনির্বাহী সদস্য, গীতিকবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক অমিতাভ দাশ হিমুনের উপস্থাপনায় শুরু হয় মূল পর্ব। সোনালী ব্যাংকের সাবেক জিএম শেখ শাহ আলী মোসাদ্দেক মোহনার পক্ষ থেকে অতিথি শিল্পীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান।

মঞ্চে অনন্যার সঙ্গে ছিলেন একদল বাদ্য শিল্পী। মাহমুদ সাগর মহব্বতের তবলার সঙ্গে মিশে যায় এস.এম স্বাধীনের কী-বোর্ড, মানিক বর্মনের অক্টো-প্যাডের তাল, তানভীর মাহাতাবের গিটার ও ইমতিয়াজ অভিনের বেজ-গিটার। এই সম্মিলিত বাদ্যের মূর্ছনায় অনন্যা একের পর এক গেয়ে শোনান গান।

নজরুলগীতি ও ঠুমরির পাশাপাশি তাঁর কণ্ঠে উঠে আসে ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘ও আমার ময়না গো’, ‘চিঠি দিও প্রতিদিন- চিঠি দিও’, ‘নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা’, ‘জ্যোৎস্না করেছে আড়ি’, ‘ওই গাছের পাতায় রোদের ঝিকিমিকি’ এবং ‘শোনো গো দখিনো হাওয়া’। ছিল চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানও। সব মিলিয়ে ১৪টি জনপ্রিয় গান পরিবেশন করে ভরা মিলনায়তনের দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন তিনি। হৃদয় উজাড় করে গাওয়া এসব গানে শ্রোতাদের মনে ছড়িয়ে পড়ে ভালোলাগার অনুভূতি।

পরিবেশনা শেষে অনন্যাকে উত্তরীয় পরিয়ে ক্রেস্ট তুলে দেন প্রধান অতিথি, গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক ড. মো. মনিরুজ্জামান। জেলা প্রশাসককেও ফুলেল শুভেচ্ছা ও উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করেন মোহনার সভাপতি শাহ মশিউর রহমান। সংকলন লাইব্রেরির স্বত্বাধিকারী যামিনি রঞ্জন সেন অনন্যাকে উপহার দেন একটি সৃজনশীল বই।

অনুষ্ঠানের এক বিশেষ মুহূর্ত তৈরি হয়, যখন উপস্থাপক অমিতাভ দাশ হিমুন দর্শকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন জেলা প্রশাসকের কবি-পরিচয়ের। ড. মনিরুজ্জামানের কাব্যগ্রন্থ ‘চোখের ভেতর যে নদী’, ‘অনিরুদ্ধ পঙত্তিমালা’, ‘সমুদ্র সংলাপ’ ও ‘হঠাৎ সন্ধ্যা আসে এক’-এর কথা তুলে ধরেন তিনি এবং তাঁর একটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনান।

বক্তব্যে জেলা প্রশাসক বলেন, ৩৩ বছর ধরে যেভাবে এই সংগঠন সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। তাঁর মতে, শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চার মধ্য দিয়েই একটি সৃজনশীল প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি মোহনার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেন।

অনন্যা আচার্য্যের জন্ম ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পোপাদিয়ায়। বাবা প্রবীর আচার্য্য, মা কণা আচার্য্য। সংগীতে হাতেখড়ি মায়ের কাছেই। মাত্র তিন বছর বয়সে মায়ের শিক্ষক শীতল ঘোষালের কাছে তালিম নেওয়া শুরু করেন। পরে চাঁদপুরে শঙ্কর আচার্য্যের কাছেও শেখেন।

বাবার কর্মসূত্রে পরিবার কুমিল্লায় এলে সেখানে অলকা দাশের কাছে তালিম নেন তিনি। তবে বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিল মেয়েকে ঢাকায় গান শেখানোর। তাই প্রতি শুক্রবার কুমিল্লা থেকে ঢাকায় যেতেন অনন্যা। সেখানে একে একে প্রয়াত সঞ্জীব দে, রুমানা মোর্শেদ, কনকচাঁপা, মইনুল ইসলাম খান, ফেরদৌস আরা ও ফরিদা পারভীনের কাছে তালিম নেন। ২০১১ সালে পরিবার ঢাকায় স্থায়ী হলে ঢাকা ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজে পূর্ণ বৃত্তি পেয়ে পড়ার সুযোগ পান। ঢাকায় বিজন চন্দ্র মিন্ত্রী, অনীল কুমার সাহা, অসিত দে, প্রিয়াংকা গোপ, পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী, সমরজিৎ রায় ও সংগীতাচার্য আলী এফ এম রেজোয়ানের কাছেও তালিম নিয়েছেন তিনি।

শৈশব থেকেই সাফল্যের ধারা অব্যাহত তাঁর। ২০০৬ সালে জাতীয় শিশু কিশোর প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক জেতেন। একই বছর চট্টগ্রাম আর্য সংগীত প্রতিযোগিতায় ৫টি বিভাগে প্রথম হয়ে চ্যাম্পিয়ান হিসেবে স্বর্ণপদক পান। ২০০৭ সালেও জাতীয় শিশুকিশোর প্রতিযোগিতায় প্রথম হন এবং আরশীনগর প্রতিযোগিতায় ৩টি বিষয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ২০০৮ সালে চ্যানেল আই ক্ষুদে গানরাজ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মিডিয়ায় পা রাখেন এবং ১৬তম স্থান অধিকার করেন, পরের বছর ওই প্রতিযোগিতায় হন ৬ষ্ঠ।

বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও শিল্পকলা একাডেমির তালিকাভুক্ত শিল্পী। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শাস্ত্রীয় সংগীতে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করে এখন রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। গানের মধ্য দিয়েই মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই পেতে চান অনন্যা, তাঁর স্বপ্ন, তাঁর গান থাকবে সবার মুখে মুখে।

গাইবান্ধার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মোহনা আজ ৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী নাম। সংগঠনের নামেই পরিচিত এর মাসিক সংগীতানুষ্ঠান। আয়োজকদের দাবি, মোহনা দেশের একমাত্র সংগঠন, যারা প্রতি মাসে নিয়মিত সংগীতানুষ্ঠান আয়োজন করে। তাঁদের ভাষ্যমতে, দেশ-বিদেশে এই আসরের পরিচিতি বেড়েছে এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রতি মাসেই সংগঠনটিকে অভিনন্দন জানান।

মোহনার কর্মকর্তারা বলেন, এ সাফল্য গাইবান্ধাবাসীর সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। ‘মোহনা মাটির কথা বলে, বাঙালির শেকড়ের সংস্কৃতির কথা বলে’- এই বিশ্বাস থেকেই তাঁরা পথ চলছেন। প্রতিবার আমন্ত্রিত শিল্পীরা সাড়া দিয়ে আসরকে সমৃদ্ধ করেছেন বলেও জানান তাঁরা।

আয়োজকদের মতে, মোহনার আরেকটি বড়ো দায়িত্ব নতুন প্রজন্মকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত করা, যাতে মানবিক মূল্যবোধের চর্চার মধ্য দিয়ে সমাজের কল্যাণ নিশ্চিত হয়। সংগীতপিপাসু দর্শকদের চাহিদা মেটাতে ভবিষ্যতেও এই আয়োজন অব্যাহত থাকবে, এমনটাই প্রত্যাশা তাঁদের।

রাত সাড়ে নয়টায় যখন পর্দা নামল, তখনো মিলনায়তনের বাতাসে লেগে ছিল সুরের রেশ। শরতের সেই সন্ধ্যায় গাইবান্ধার সংস্কৃতিপ্রেমীরা ঘরে ফিরলেন, অপেক্ষায় রইলেন পরবর্তী আসরের।