
এম. আবদুস্ সালাম: বাংলাদেশে নদীভাঙন আর বিচ্ছিন্ন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি এখন দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতি, দারিদ্র্য, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং বাধ্যতামূলক অভিবাসনের অন্যতম প্রধান কারণ। নতুন স্যাটেলাইটভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলা নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায় এই সংকটের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস—CEGIS-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যমুনা, গঙ্গা ও পদ্মার ভাঙনে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৫৩ হেক্টর বা ১ হাজার ৫৮৫ বর্গকিলোমিটার জমি বিলীন হয়েছে। এই আয়তন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সম্মিলিত আয়তনের প্রায় পাঁচ গুণ।
একই সময়ে নদীতে প্রায় ৪৩৩ বর্গকিলোমিটার নতুন চর জেগে উঠলেও নিট ভূমি ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৫৩ বর্গকিলোমিটার। মোট ক্ষয় হওয়া জমির প্রায় ৬০ শতাংশই একা যমুনা নদী গ্রাস করেছে। CEGIS-এর স্যাটেলাইট বিশ্লেষণভিত্তিক সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৬ সালে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে গাইবান্ধা
CEGIS-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশের ছয় জেলার ১১টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে আরও প্রায় ৯১৫ হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। এর মধ্যে গাইবান্ধাতেই প্রায় ২২৩ হেক্টর জমি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে—চিহ্নিত জেলাগুলোর মধ্যে যা সর্বোচ্চ।
ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বসতভিটা, কৃষিজমি, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো। পূর্বাভাসে গাইবান্ধার দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে।
তবে এসব সংখ্যা কেবল জমি হারানোর পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি হেক্টরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু পরিবারের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, কর্মসংস্থান, সামাজিক সম্পর্ক এবং কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি। একটি পরিবার যখন বসতভিটা হারায়, তখন তাদের শুধু ঠিকানাই বদলায় না—বদলে যায় সামাজিক পরিচয়, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও।
সাঘাটায় ২৩ বছরে হারিয়েছে ২০.৮৪ বর্গকিলোমিটার জমি
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার নদীভাঙন নিয়ে আন্তর্জাতিক সাময়িকী Natural Hazards-এ ২০২৬ সালে প্রকাশিত সমকক্ষ-পর্যালোচিত গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে যমুনার গতিপথ পরিবর্তন ও তীরভাঙনে প্রায় ২০.৮৪ বর্গকিলোমিটার জমি ক্ষয় হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ০.১৫৮ বর্গকিলোমিটার বসতি এলাকা স্থানচ্যুত হয়েছে।
গবেষণায় ভারতখালী, সাঘাটা, হলদিয়া, কামালেরপাড়া ও মুক্তিনগর ইউনিয়নের নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত মানুষের পরিস্থিতি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব এলাকার বহু পরিবার একাধিকবার স্থানচ্যুত হয়েছে। জমি ও জীবিকা হারিয়ে তারা দারিদ্র্য, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের মধ্যে পড়েছে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, ভাঙনের পর পরিবারগুলোর মানবসম্পদ, আর্থিক সক্ষমতা, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সামাজিক পুঁজি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অর্থাৎ নদীভাঙনের ক্ষতি শুধু ভূমি বা ঘরবাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি মানুষের দক্ষতা, আয়, সামাজিক সম্পর্ক এবং ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতাকেও দুর্বল করে দেয়।
নদীতীর থেকে শহরের বস্তিতে
ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো প্রথমে নিকটবর্তী বাঁধ, নতুন চর, সরকারি জমি কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। কিন্তু বারবার স্থানচ্যুতি, কাজের অভাব এবং জমির মালিকানা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই শেষ পর্যন্ত ঢাকা ও অন্যান্য শহরের দিকে চলে যেতে বাধ্য হয়।
প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে তাদের একটি বড় অংশ রিকশাচালনা, দিনমজুরি, গৃহকর্ম কিংবা অন্য অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত হয়। তারা প্রায়ই শহরের নিম্নাঞ্চল ও দুর্যোগপ্রবণ বস্তিতে বসবাস শুরু করে। ফলে নদীতীরের দারিদ্র্য স্থানান্তরিত হয়ে শহরে নতুন দারিদ্র্য ও সামাজিক ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
CEGIS-এর আনুমানিক হিসাবে, প্রতি এক বর্গকিলোমিটার জমি নদীগর্ভে বিলীন হলে প্রায় এক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। অথচ বাংলাদেশে নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত মানুষের নিয়মিত, সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ জাতীয় তথ্যভান্ডার এখনো গড়ে ওঠেনি। সর্বশেষ সরকারি হিসাবও দেশের সব নদী ও জেলা অন্তর্ভুক্ত করে না। ফলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নদীভাঙনের কারণ বহুমাত্রিক
নদীভাঙনকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে দেখা বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন, পানির প্রবাহ, পলি পরিবহন, নদীর তলদেশ ও তীরের গঠন এবং মানুষের বিভিন্ন হস্তক্ষেপও ভাঙনের গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, পানিপ্রবাহের অস্বাভাবিকতা এবং দুর্যোগের তীব্রতা বাড়লে নদীভাঙনের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে। তাই নদীভাঙন মোকাবিলায় নদীবিজ্ঞান, পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন এবং সামাজিক সুরক্ষাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শুধু জিওব্যাগ ও ত্রাণে সমাধান নয়
ভাঙন শুরু হওয়ার পর সীমিত ত্রাণ বিতরণ কিংবা জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলা প্রয়োজনীয় হলেও এগুলো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। প্রয়োজন আগাম পূর্বাভাসের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার শনাক্তকরণ, গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ স্থানান্তর, নিরাপদ পুনর্বাসন এবং জীবিকা পুনর্গঠনের সমন্বিত কর্মসূচি।
বিশেষ করে গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সুন্দরগঞ্জের জন্য প্রয়োজন—
* ঝুঁকিপূর্ণ ও বাস্তুচ্যুত পরিবারের নিয়মিত ডিজিটাল নিবন্ধন;
* পূর্বাভাসভিত্তিক আগাম সতর্কতা ও সহায়তা;
* বসতভিটা, জমির দলিল এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত নথি সুরক্ষার ব্যবস্থা;
* নিরাপদ আবাসন, জমির অধিকার ও পরিকল্পিত পুনর্বাসন;
* স্থানান্তরযোগ্য সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা;
* বিকল্প জীবিকা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা;
* নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা;
* নদীভাঙনজনিত অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের নিরাপদ কর্মসংস্থান ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি।
নদীভাঙনকে কেবল পানি উন্নয়ন বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে ভূমিহীনতা, দারিদ্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন।
গাইবান্ধার জন্য এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন ও স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের পরিবর্তে নদীভাঙনপ্রবণ মানুষের আগাম সুরক্ষা, পরিকল্পিত পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি সমন্বিত কর্মসূচি। কারণ নদী যখন জমি কেড়ে নেয়, তখন শুধু মানচিত্র বদলায় না—বদলে যায় মানুষের পরিচয়, পেশা, সামাজিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ।
তথ্যসূত্র: CEGIS-এর তথ্যভিত্তিক নদীভাঙন বিশ্লেষণ এবং সাঘাটা উপজেলার নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতিবিষয়ক গবেষণা।

Reporter Name 



















