
স্টাফ রিপোর্টার: নদীভাঙন ও মৌসুমি বন্যায় বিপর্যস্ত গাইবান্ধার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের চিত্র বদলাতে শুরু হয়েছে বহুমুখী উন্নয়নযজ্ঞ। সরকারের ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’ ধারণাকে মাঠপর্যায়ে রূপ দিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) যৌথ উদ্যোগে গৃহীত ‘পাইলট গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্পে’ চরাঞ্চল ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ফুলছড়ি উপজেলার ফুলছড়ি ইউনিয়ন। এর মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি গতিশীল করার পাশাপাশি নদীভাঙা প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে আধুনিক নাগরিক সেবা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, দেশের বৈচিত্র্যময় ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ১৫টি গ্রামে পাইলট প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ে সব কাজ শেষ না হওয়ার শঙ্কায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রকল্পে অবকাঠামো ও জীবনমান উন্নয়নে খাতভিত্তিক বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে চরাঞ্চলসহ নির্বাচিত গ্রামগুলোর সড়ক, ছোট সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে সর্বোচ্চ প্রায় ১৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার বাসিন্দাদের টেকসই বাসস্থানের জন্য ‘নিজেদের জমিতে আবাসন’ মডেলে ঘর ও উঁচু প্ল্যাটফর্ম নির্মাণে ১১০ কোটি, তরুণদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ৬২ কোটি এবং বন্যাসহনশীল গভীর নলকূপ ও পাইপলাইনে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে ৪৩ কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে আধুনিক হাটবাজার ও বিপণন কেন্দ্র নির্মাণে ৩৮ থেকে ৫১ কোটি, যুবসমাজের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানে ২০ কোটি এবং গ্রিডবিহীন চরে সৌরবিদ্যুৎ ও সড়কবাতি স্থাপনে সাড়ে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
ভৌগোলিক বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়ে ফুলছড়ির চরাঞ্চলে নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করতে আধুনিক ঘাট ও জেটি নির্মাণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চলাচলের জন্য তৈরি হচ্ছে টেকসই সাবমার্সিবল সড়ক। এছাড়া চরে উৎপাদিত মরিচ, ভুট্টা ও বাদাম সংরক্ষণে শেড ও কালেকশন সেন্টার স্থাপন, কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে সরকারি সেবা ঘরে বসেই পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্রকল্পের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে ফুলছড়ি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় সড়ক পাকাকরণ ও কালভার্ট নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। তবে নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে সব কাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।’
ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এটি চরাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। চরের মানুষকে এখন আর নাগরিক সুবিধার জন্য দূরে যেতে হবে না, চর থেকেই সব সুবিধা মিলবে।’
উন্নয়ন গবেষক এম আবদুস সালাম বলেন, ‘দেশের প্রতিটি নাগরিকেরই আধুনিক নাগরিক সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সে দিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে একটি মডেল প্রকল্প। প্রকল্পটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে চরাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান সুফল আসবে।’
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গ্রামকে নগরে রূপান্তর করা নয়, বরং গ্রামীণ পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রেখেই শহরের সব নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। ফুলছড়ির চরাঞ্চলে প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙা মানুষের জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তন ঘটবে এবং জীবিকার তাগিদে শহরমুখী হওয়ার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।

Reporter Name 



















