
রজতকান্তি বর্মন
বৈশাখ মাস শুরু হলেই একটাই চিন্তা থাকতো ঠাকুরবাড়ি মেলা থেকে কাইঠার বা কাঠার কিনতে হবে। ছোট্ট ছোট্ট চাকুকে আমাদের গ্রামে কাইঠার বলত। আম খাওয়ার জন্য মেলায় কেনা সেই কাঠার নিয়ে আমি সারাদিন ঘুরতাম। এজন্য কতো যে বকাঝকা সহ্য করতাম!
আমাদের বাড়ি থেকে জমির ওপর দিয়ে মাইলখানেক হেঁটে গেলেই ঠাকুরবাড়ি। শিশুবেলায় আজিমার (দিদিমা) হাত ধরে মেলায় যেতাম। অনেক দূর থেকেই মেলার গমগম শব্দ শোনা যেত, কাছে গেলেই মানুষের নানা আওয়াজ। বিশাল এলাকা জুড়ে মেলা। হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে আমি দিদিমার হাত ধরে থাকতাম।
বাবা বলতেন ঠাকুরবাড়িতে পান চিনি না দেওয়া পর্যন্ত নতুন পান খাওয়া যাবে না। আমরা মেলায় গিয়ে নতুন পান চিনি কিনে মন্দিরে বিগ্রহের সামনে অর্পণ করতাম। তাঁর কাছে শুনেছি ১৮শ খ্রিস্টাব্দ শুরুর দিকে জমিদার নরেন্দ্র লাহিড়ী কাঠের তৈরি গৌর নিতাই বিগ্রহ স্থাপনের মাধ্যমে ঠাকুরবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে গৌর নিতাই ঠাকুর প্রতিদিন পূজিত হন। এই ঠাকুরবাড়ি ঘিরেই বৈশাখ মাসে মেলা বসতে শুরু করে। সারাবছর পুজো হলেও বৈশাখ মাসের প্রতি রবিবার ও বৃহস্পতিবার মেলা বসে থাকে।
৪০-৪৫ বছর আগেও মেলাকে উপলক্ষ করে এলাকার প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে আত্মীয় স্বজন আসতেন। এলাকার প্রবীণদের কাছে শুনেছি একসময় ভারত এবং নেপাল থেকেও পুণ্যার্থীরা ঠাকুরবাড়ি মেলায় আসতেন।
বৈশাখ মাসজুড়ে মেলার আশেপাশের গ্রামগুলোতে উৎসবের আমেজ বিরাজ করতো। ঠাকুরবাড়ি মেলা বিশেষভাবে শ্যাকা আলু (মিষ্টি আলু), তরমুজ, বাঙ্গি, কানমুচরি ও মুড়কির জন্য বিখ্যাত ছিল। মেলাকে কেন্দ্র করেই এলাকার এবং আশেপাশের গ্রামের কৃষকরা মিষ্টি আলু, তরমুজ, বাঙ্গির প্রচুর আবাদ করতেন। অর্থনৈতিক লেনদেনে এই মেলা বিরাট ভূমিকা পালন করতো।
বাবার মুখে শোনা গল্প-একদিন মন্দিরের পূজারী ঠাকুরের ভোগের জন্য পার্শ্ববর্তী এক সরিষা ক্ষেতের মালিকের কাছে একমুঠো শাক চাইলেন। কিন্তু তিনি অনুরোধ প্রত্যাখান করে পূজারীকে কটূ কথা শুনিয়ে দেন। পূজারী মন খারাপ নিয়েই সেদিন ঠাকুরের পূজা শেষ করলেন। মালিক পরের দিন সকালে জমিতে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে যান। তিনি দেখতে পান কারা যেন জমির সব সরিষা গাছ পা দিয়ে মাড়িয়ে দিয়েছে। কৃষকের এ ক্ষতির খবর যায় জমিদারের কানে। তিনি অপরাধী খুঁজে বের করার জন্য তাঁর কর্মচারীদের নির্দেশ দেন।
এদিকে পূজার সময় হয়ে এলে পূজারী মন্দিরের দুয়ার খুলেই দেখেন ঠাকুরের পায়ে লেগে আছে সরিষা গাছ। এ খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। তখন থেকে ওই কৃষক আমৃত্যু প্রতি বছর সরিষার আবাদ করে ঠাকুরের ভোগের জন্য সরিষা শাক সরবরাহ করতেন।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের ঠাকুরবাড়ি মেলা আগের জৌলুষ অনেকখানি হারিয়ে ফেলেছে। মেলার জায়গা সংকীর্ণ হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে মেলার জায়গা বেদখল করেছে স্থানীয় প্রভাবশালী। জরাজীর্ণ বিল্ডিং টিকে আছে কোনোরকমে। ধ্বংসোন্মুখ মন্দিরভবনেই এখনও সারাবছরই তিনবেলা-সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায় ভোগ ও পূজা অর্চনা হয়।
তবে বৈশাখ, কার্তিক ও মাঘ মাসে প্রভাতী কীর্তনসহ আরও নানা আয়োজন থাকে। প্রায় আড়াইশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মেলার জায়গা দখলমুক্ত ও মন্দিরটি সংরক্ষণে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের হস্তক্ষেপ করা উচিত। কারণ ঠাকুরবাড়ি মেলা হয়ে ওঠে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের অনাবিল মিলনক্ষেত্র।

Reporter Name 























