
মিঠাপুকুর (রংপুর) প্রতিনিধি:
বিশেষ ভৌগোলিক নির্দেশক ( জিআই পণ্য) হিসাবে খ্যাত (হাড়িভাঙ্গা আম) সারাদেশেসহ বহিবিশ্বেও বেশ সুনাম অর্জন করেছে। এই আম রংপুরের মিঠাপুকুরের এখন অন্যতম অর্থকারী ফল হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছে।গতকাল রবিবার (১৫ জুন) থেকে বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসছে দেশসেরা ‘হাঁড়িভাঙা’ আম। সে লক্ষে ইতোমধ্যেই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে জেলা-উপজেলা প্রশাসন।
চলতি মৌসুমে আবহাওয়া প্রতিকূলতার কারণে, বাগান মালিকসহ পাইকাররা বাগান থেকে,অগ্রীম আম সংগ্রহ শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। প্রচন্ড খরতাপ ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে হাঁড়িভাঙা, আম বাগানে পাকতে শুরু করেছে। তাই, নির্ধারিত সময়ের আগেই বাজারে উঠতে শুরু করেছে।
বৃহওর রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পশ্চিমে,টকটকে লাল মাটি ও এঁটেলমাটি বিধৌত অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ‘হাঁড়িভাঙা’ আমের সারিসারি বাগান রয়েছে। এসব বাগানে গতবারের তুলনায়, অনেকটা কম হয়েছে। এই দেশসেরা আম স্বাদে-গন্ধে অনন্য, দেশ ছাড়া ও বাহিবিশ্বে কদর রয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে, এই আমের বাগান গড়ে তুলেছেন স্থানীয় আম চাষিরা। স্বাদে-গন্ধে-মানে অনন্য এই আম, ইতোমধ্যে ‘জিআই’ স্বীকৃতি পেয়েছে।
- উৎপাদন লক্ষমাত্রা ২৬ হাজার মেট্রিক টন।
- দেড়’শ কোটি টাকা বিক্রির আশা।
- অল্প পরিমাণে রপ্তানি হবে ৩ দেশে,ভারত, জার্মানি ও মালোশিয়া।
মিঠাপুকুর উপজেলা সদর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরত্বে, ফুলবাড়ি-মিঠাপুকুর আঞ্চলিক মহাসড়ক হয়ে,মুসলিম বাজার থেকে, শুকুরের হাট, রানীপুকুর -এরশাদমোড় সড়ক ধরে গেলে খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানী গ্রামের দেখা মিলবে আম এর বাগান। তেকানি গ্রামের নফেল উদ্দিনের হাত ধরে ২০ বছর আগে প্রথম হাঁড়িভাঙা আমের জন্ম হয়। তারপর ধীরে ধীরে পাশের ইউপি ময়েনপুর, চেংমারী, রানিপুকুর, লতিবপুর, বালুয়া মাসিমপুর, মিলনপুর,দৃর্গাপুর, পায়রাবন্দ ইউনিয়নসহ গোটা মিঠাপুকুর সহ বাহিরের, জেলা উপজেলাতে, এই আম এখন বানিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে।
গত রবিবার হাঁড়িভাঙা আমের রাজ্য খ্যাত খোড়াগাছ, ময়েনপুর, চেংমারী, সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বাগানে বাগানে আম পাড়ার (সংগ্রহ) ধুম চলতেছে। আমবাগানের মালিক, ব্যবসায়ী, পাইকার, মৌসুমি আম বিক্রেতা, পরিবহন ব্যবসায়ী-সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এই আম প্রতিবারই জুনের মধ্যেম সময়ে ১৫ থেকে ২০ জুনের মধ্যে জেলা-উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে হাঁড়িভাঙা আমের বাজারজাত করার ঘোষণা করলেও এবার নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। তবে, আনুষ্ঠানিকভাবে ১৫ জুন থেকে বাজারজাত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল আবেদীন।
মিঠাপুকুর কৃষি অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মিঠাপুকুর উপজেলায় এবার ১ হাজার ২৬৮ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে হাঁড়িভাঙা আমের বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। এর বাইরেও বাড়ির আশে-পাশে পতিত জমি, রাস্তার দুই ধারেও রোপন করা হয়েছে হাঁড়িভাঙা আম গাছ। এবার শুরুতে প্রতি কেজি হাঁড়িভাঙা আম ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এবং ১ মণ বাছাইকৃত আম নেওয়া হচ্ছে ১৪শ-১৬শ টাকা।
ময়েনপুর ইউনিয়নের গেনারপাড়া গ্রামে একটি হাঁড়িভাঙা আমের বাগান কিনে নিয়েছেন, আম ব্যবসায়ী আমিনুর রহমান। তিনি জানায়, দেড় একর আয়তনের বাগান মোট ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকায় কিনেছি। সব খরচ বাদ দিয়ে ৩ লাখ ৫০টাকা বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি।
ময়েনপুর ইউনিয়নের ফুলচৌকি গ্রামের আম বাগান মালিক মাসুদ চৌধুরী ৬ একর জমিতে আম বাগান করেছেন। তিন তার জমিতে উৎপাদন মাত্রা ধরেছেন, ১৮শ থেকে ২ হাজার মণ।তিনি আরও বলেন, এবার আম গতবারের তুলনায়, অনেকটা কম ফলন হয়েছে। কারণ জানতে চাইলে তিনি জানায়,আমের মুকুল আসার সময় বৃষ্টি ও খরা তাপের কারণে এই অবস্থা।
হাঁড়িভাঙা আমের অন্যতম উৎপাদন এলাকা খোড়াগাছ ইউনিয়নের পদাগঞ্জ বাজারে প্রতি বছর সবচেয়ে বড় হাঁড়িভাঙা আমের হাট বসে। এই হাটে আমের আকার ও মানভেদে প্রতিমন আম দেড় থেকে দুই হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ী মন্ডল মিয়া, শাকিল আহমেদ ও মোফাজ্জল, আমিনুর ইসলাম বলেন, আমরা পদাগঞ্জ ও এর আশপাশের এলাকা থেকে হাঁড়িভাঙা আম বাগান, পাইকাড়ি আম কিনি। এগুলো কুরিয়ার সার্ভিস ও ট্রাক ও পিকাপের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরগুলোতে পাঠানো হয়। প্রতি মৌসুমে এমনটা করে থাকি। কখনও লাভ বেশি , কখনও কম। আমজাদ হোসেন নামে একজন হাঁড়িভাঙা আমের বাগান মালিক বলেন, এবার অত্যধিক গরম। তাই, সময়ের আগেই গাছে আম পাকতে শুরু করেছে। এ কারণে আম পেড়ে বিক্রি করা হচ্ছে। আখিরাহাট এলাকার বাসিন্দা ও দয়ারদান আম্রকাণনের মালিক আব্দুস সালাম সরকার বলেন, আমি ১০ একর জমিতে হাঁড়িভাঙা আমের বাগান করেছি। আম গাছের পাশে লটকনসহ আরও বিভিন্ন প্রজাতির আমের গাছ লাগিয়েছি। এবার হাঁড়িভাঙা আমের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। তবে, খরায় একটু ক্ষতি হয়েছে। দাম ভালো। তাই পুষিয়ে নেওয়া যাবে।
মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার এই উপজেলায় ২৬ হাজার মেট্রিক টন হাঁড়িভাঙা ফলনের লক্ষমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। সব কিছু ঠিক থাকলে এ মৌসুমে দেড় কোটি টাকার কেনাবেচা হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। এবার ৩টি দেশ ভারত, জার্মানি ও মালযেশিযায় রপ্তানী হবে ২০ থেকে ৩০ টন হাঁড়িভাঙা।
উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল আবেদীন বলেন, এবার শেষ সময়ে যথেষ্ট বৃস্টিপাত হয়েছে। তাই, হাঁড়িভাঙা আমের আকারও বেশ বড় হয়েছে১৫ই জুন থেকেই বাণিজ্যিকভাবে হাঁড়িভাঙা কেনাবেচা শুরু হচ্ছে। কৃষক ও বাগান মালিকদের কাছে গিয়ে আম সংরক্ষণ ও বিক্রির ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি বছর বিভিন্ন দেশে রপ্তানী হয়ে থাকে। এবারও ভারত, জার্মানি ও মালযেশিযায় রপ্তানী কিছু আম রপ্তানী হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তবে, এখনও অর্ডার পাওয়া যায়নি। কয়েকেদিন পর পাওয়া যেতে পারে। এবার অল্প পরিমাণে ২৫ থেকে ৩০ টন হাঁড়িভাঙা রপ্তানী হবে।
উপজেলা ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুলতামিস বিল্লাহ বলেন, ‘আমাদের মিঠাপুকুর এলাকার উৎপাদিত হাঁড়িভাঙা আম স্বাদে, গুনে-মানে অনন্য। সারাদেশে এই আমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাণিজ্যিভাবে পাঠানো হয়ে থাকে। এই আমের সুখ্যাতি বিদেশেও। জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পয়েছে। হাঁড়িভাঙা আমের বাজারজাতে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, এ জন্য তদারকি অব্যাহত আছে।

Reporter Name 











