Dhaka ০৭:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমার বড় অর্জন চিলমারী-রৌমারী নৌ-পথে নাব্যতা ফিরলেও মিলছে না ফেরি জনপ্রিয়তা সত্যের মানদণ্ড নয়: পছন্দ, আবেগ ও বিশ্বাসের প্রকাশ মাত্র  হানিট্র্যাপে ফেলে শিক্ষককে জিম্মি, নারীসহ গ্রেপ্তার ৪ সাঘাটায় বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত নওগাঁয় হানিট্র্যাপে শিক্ষককে জিম্মি: নারীসহ গ্রেপ্তার ৪ লং মার্চ নির্যাতিত মানুষের পক্ষে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ : মাওলানা আবদুল হালিম গোবিন্দগঞ্জে ৩২ বছর আগের হত্যাকাণ্ড: পরকীয়া ঢাকতে স্বামীকে বিষ খাইয়ে হত্যার অভিযোগে থানায় এজাহার দলবাজি নয়, বালাসীঘাটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ করতে হবে: ওয়ার্কাস পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক রাজধানীর মহাখালী রেলগেট এলাকায় ৭ তলা ভবনে অগ্নিকাণ্ড

নদীভাঙনে শীর্ষে সাঘাটা: ৫২ বছরে যমুনার পেটে ২১ বর্গকিলোমিটার

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৫:৫১:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৬৮ Time View

আফতাব হোসেন, গাইবান্ধা

নদীভাঙনে মানচিত্র থেকে দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে গাইবান্ধার জনপদ। বিশেষ করে যমুনার করাল গ্রাসে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে জেলার সাঘাটা উপজেলা। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ন্যাচারাল হ্যাজার্ডস’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণা ও সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)-এর স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নদীভাঙনে ক্ষতির দিক থেকে দেশের শীর্ষে রয়েছে এ উপজেলা। ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে যমুনার ভাঙনে সাঘাটার প্রায় ২০ দশমিক ৮৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে হাজারো পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতি ও জলবায়ুজনিত অভিবাসনের শিকার হচ্ছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সাঘাটার ভারতখালী, সাঘাটা সদর, হলদিয়া, কামালেরপাড়া, ঘুড়িদহ, জুমারবাড়ি ও মুক্তিনগর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে গেছে ভাঙনের মূল তাণ্ডব। বহু পরিবার চার-পাঁচবার পর্যন্ত ভাঙনের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছে। আবাদি জমি ও জীবিকা হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।

সিইজিআইএসের হিসাবে, প্রতি এক বর্গকিলোমিটার জমি নদীগর্ভে গেলে গড়ে এক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। সে হিসাবে শুধু সাঘাটায়ই ভিটেমাটি হারিয়েছেন ২০ সহস্রাধিক মানুষ। সহায়-সম্বলহীন এসব পরিবার প্রথমে বাঁধ, সড়কের পাশ কিংবা অন্যের জমিতে আশ্রয় নিলেও পরে জীবিকার তাগিদে বড় শহরের বস্তিতে পাড়ি জমাচ্ছে। ফলে গ্রামীণ দারিদ্র্য রূপ নিচ্ছে নগরের বস্তিকেন্দ্রিক সংকটে। অথচ নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া এসব বাস্তুচ্যুত মানুষের কোনো কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার এখনো গড়ে ওঠেনি।

সিইজিআইএসের তথ্যমতে, গত ৫২ বছরে (১৯৭৩–২০২৫) দেশের প্রধান তিন নদী ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও পদ্মার ভাঙনে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৫৩ হেক্টর জমি বিলীন হয়েছে—যা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মোট আয়তনের প্রায় পাঁচ গুণ। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষয় করেছে যমুনা। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালেও ছয় জেলার ১১টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে প্রায় ৯১৫ হেক্টর জমি নদীগর্ভে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যার মধ্যে গাইবান্ধায় সর্বোচ্চ প্রায় ২২৩ হেক্টর। এর আওতায় সাঘাটার বসতভিটা, আবাদি জমি, সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও জেলার দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্পূর্ণ বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীভাঙন কেবল প্রাকৃতিক নয়; উজানের ঢল, অতিবৃষ্টি এবং অপরিকল্পিত মানবসৃষ্ট হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। এ প্রসঙ্গে উন্নয়ন গবেষক ও গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) প্রতিষ্ঠাতা এম. আবদুস্ সালাম বলেন, “নদীভাঙন সাঘাটাসহ পুরো গাইবান্ধার জীবন-জীবিকাকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। শুধু ভাঙন মৌসুমে কিছু জিওব্যাগ ফেলা বা নামমাত্র ত্রাণ বিতরণ করে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়। ভাঙন রোধে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার তৈরি, পূর্বাভাসভিত্তিক আগাম পদক্ষেপ এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।”

নদী জমি গ্রাস করলে কেবল মানচিত্রই বদলায় না, বদলে যায় মানুষের ভবিষ্যৎও। তাই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের বদলে সাঘাটাসহ নদীতীরবর্তী জনপদ রক্ষা ও ক্ষতিগ্রস্তদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে সমন্বিত জাতীয় মহাপরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমার বড় অর্জন

নদীভাঙনে শীর্ষে সাঘাটা: ৫২ বছরে যমুনার পেটে ২১ বর্গকিলোমিটার

Update Time : ০৫:৫১:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আফতাব হোসেন, গাইবান্ধা

নদীভাঙনে মানচিত্র থেকে দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে গাইবান্ধার জনপদ। বিশেষ করে যমুনার করাল গ্রাসে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে জেলার সাঘাটা উপজেলা। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ন্যাচারাল হ্যাজার্ডস’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণা ও সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)-এর স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নদীভাঙনে ক্ষতির দিক থেকে দেশের শীর্ষে রয়েছে এ উপজেলা। ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে যমুনার ভাঙনে সাঘাটার প্রায় ২০ দশমিক ৮৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে হাজারো পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতি ও জলবায়ুজনিত অভিবাসনের শিকার হচ্ছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সাঘাটার ভারতখালী, সাঘাটা সদর, হলদিয়া, কামালেরপাড়া, ঘুড়িদহ, জুমারবাড়ি ও মুক্তিনগর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে গেছে ভাঙনের মূল তাণ্ডব। বহু পরিবার চার-পাঁচবার পর্যন্ত ভাঙনের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছে। আবাদি জমি ও জীবিকা হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।

সিইজিআইএসের হিসাবে, প্রতি এক বর্গকিলোমিটার জমি নদীগর্ভে গেলে গড়ে এক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। সে হিসাবে শুধু সাঘাটায়ই ভিটেমাটি হারিয়েছেন ২০ সহস্রাধিক মানুষ। সহায়-সম্বলহীন এসব পরিবার প্রথমে বাঁধ, সড়কের পাশ কিংবা অন্যের জমিতে আশ্রয় নিলেও পরে জীবিকার তাগিদে বড় শহরের বস্তিতে পাড়ি জমাচ্ছে। ফলে গ্রামীণ দারিদ্র্য রূপ নিচ্ছে নগরের বস্তিকেন্দ্রিক সংকটে। অথচ নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া এসব বাস্তুচ্যুত মানুষের কোনো কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার এখনো গড়ে ওঠেনি।

সিইজিআইএসের তথ্যমতে, গত ৫২ বছরে (১৯৭৩–২০২৫) দেশের প্রধান তিন নদী ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও পদ্মার ভাঙনে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৫৩ হেক্টর জমি বিলীন হয়েছে—যা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মোট আয়তনের প্রায় পাঁচ গুণ। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষয় করেছে যমুনা। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালেও ছয় জেলার ১১টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে প্রায় ৯১৫ হেক্টর জমি নদীগর্ভে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যার মধ্যে গাইবান্ধায় সর্বোচ্চ প্রায় ২২৩ হেক্টর। এর আওতায় সাঘাটার বসতভিটা, আবাদি জমি, সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও জেলার দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্পূর্ণ বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীভাঙন কেবল প্রাকৃতিক নয়; উজানের ঢল, অতিবৃষ্টি এবং অপরিকল্পিত মানবসৃষ্ট হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। এ প্রসঙ্গে উন্নয়ন গবেষক ও গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) প্রতিষ্ঠাতা এম. আবদুস্ সালাম বলেন, “নদীভাঙন সাঘাটাসহ পুরো গাইবান্ধার জীবন-জীবিকাকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। শুধু ভাঙন মৌসুমে কিছু জিওব্যাগ ফেলা বা নামমাত্র ত্রাণ বিতরণ করে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়। ভাঙন রোধে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার তৈরি, পূর্বাভাসভিত্তিক আগাম পদক্ষেপ এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।”

নদী জমি গ্রাস করলে কেবল মানচিত্রই বদলায় না, বদলে যায় মানুষের ভবিষ্যৎও। তাই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের বদলে সাঘাটাসহ নদীতীরবর্তী জনপদ রক্ষা ও ক্ষতিগ্রস্তদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে সমন্বিত জাতীয় মহাপরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।