Dhaka ০৩:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
পত্নীতলায় ট্রাক্টরের চাকায় পিষ্ট হয়ে বৃদ্ধের মৃত্যু শ্বশুরবাড়িতে আম পাড়তে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে জামাইয়ের মৃত্যু  চিলমারীতে হঠাৎ দমকা হাওয়ায় ডুবে গেছে ৭টি নৌকা সুন্দরগঞ্জে বাড়ির যাতায়াতের রাস্তা বন্ধ করার প্রতিবাদে মানববন্ধন নওগাঁয় বাসের বক্সের ঢাকনার আঘাতে অটোরিকশার ১ যাত্রী নিহত, আহত ২ শিশু   সুপারকম্পিউটারের ভবিষ্যদ্বাণীতে বিশ্বকাপে জিতবে কোন দল? গোবিন্দগঞ্জে এক মানসিক রোগীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে পুড়ছে দেশ, জুনে ২-৩ দফা তাপপ্রবাহের আভাস মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা: ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া সতর্কবার্তা ইরানের মুক্তিযুদ্ধের সময় নিখোঁজ বাবা: ৫৪ বছর পর বাংলাদেশে জন্মভিটার সন্ধান পেল পাকিস্তানে বেড়ে ওঠা ছেলে

এইটা ছড়ার বই: সমকালীন পাঠ, পর্যালোচনা ও অবস্থান নির্ণয়

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:০৮:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
  • ৮১ Time View

মারুফা আক্তার আইভি

শিশুসাহিত্যের বিস্তৃত ভুবনে ছড়া এমন একটি মাধ্যম, যা কখনোই কেবল বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ছড়া একদিকে যেমন স্মৃতি ও লোকজ জীবনের ধারক, অন্যদিকে তেমনি সমাজ, রাজনীতি, কল্পনা ও ভাষার সৃজনশীল খেলাও বটে। চর্যাপদের ধ্বনিগত অনুরণন থেকে শুরু করে খনার বচনের কৃষিজ্ঞান, লোকমুখে প্রচলিত ছেলেভুলানো ছড়া, ব্রিটিশবিরোধী প্রতিরোধী ছন্দ কিংবা স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যঙ্গ—সব মিলিয়ে ছড়া হয়ে উঠেছে জনমানুষের সবচেয়ে সহজ অথচ গভীর অভিব্যক্তির মাধ্যম।

এই দীর্ঘ ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপটে আমির খসরু সেলিমের “এইটা ছড়ার বই” কেবল একটি শিশুতোষ সংকলন নয়; বরং ছড়ার পুনর্নির্মাণ ও আধুনিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বইটি পাঠ করতে গিয়ে স্পষ্ট হয়, এখানে ছড়া আর কেবল ছন্দ বা অন্ত্যমিলের অনুশীলন নয়; এটি কল্পনা, দৃশ্য, মনস্তত্ত্ব এবং সমকালীন শিশুবোধের এক বহুমাত্রিক প্রকাশভঙ্গি।

শিরোনাম থেকেই বইটি একটি অবস্থান ঘোষণা করে। “এইটা ছড়ার বই” নামটি সরল, অনাড়ম্বর এবং আত্মসচেতন। এটি কোনো আড়ম্বরপূর্ণ সাহিত্যিক ঘোষণা নয়; এ যেন পাঠকের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের একটি নির্ভার ভঙ্গি। এই নির্ভারতা বইটির ভেতরের ছড়াগুলোর কাঠামোতেও প্রতিফলিত হয়েছে। ছড়াগুলোতে জটিলতার চাপ নেই, অলংকারের অতিরিক্ত ভার নেই; বরং সহজ শব্দে কল্পনার বিস্তার ঘটানো হয়েছে।

তবে এই সরলতার মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঁকি দেয়—সরলতা কি ছড়ার ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে, নাকি কোথাও গিয়ে তার সামাজিক গভীরতাকে ক্ষীণ করেছে? এই দ্বন্দ্বই বইটির পাঠ-অভিজ্ঞতাকে জটিল ও অর্থবহ করে তোলে।

বাংলা ছড়ার ঐতিহ্যগত কাঠামোয় আমরা একটি দ্বৈত চরিত্র লক্ষ করি। একদিকে রয়েছে লোকজ আনন্দ, ঘুমপাড়ানি সুর এবং কৃষিভিত্তিক জীবনের প্রতিচ্ছবি; অন্যদিকে রয়েছে সামাজিক বাস্তবতার প্রতীকী উপস্থাপন—যেখানে যুদ্ধ, দারিদ্র্য, শোষণ, প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গ একসঙ্গে অবস্থান করে। উদাহরণ হিসেবে “খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে” কিংবা খনার বচনের মতো ছড়াগুলো এই দ্বৈত চরিত্রকে স্পষ্ট করে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে “এইটা ছড়ার বই” তুলনামূলকভাবে ভিন্ন পথে হাঁটে। এখানে সামাজিক ইতিহাসের ভার কম, কল্পনার স্বাধীনতা বেশি। বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর কল্পনার নির্মাণ। প্রতিটি ছড়া বাস্তবতার নিয়ম ভেঙে নতুন এক জগৎ তৈরি করে। হাতি ওড়ে, বইয়ের ভেতর থেকে পাখির বাসা বের হয়, রেলগাড়ি হাসে, মেঘ বন্ধুর মতো আচরণ করে।

এই ধরনের কল্পনা শিশুর মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ এটি বাস্তবতার সীমা ছাড়িয়ে ভাবতে শেখায়। শিশুমন স্বভাবতই সীমাহীন, আর এই বই সেই সীমাহীনতাকে স্বীকৃতি দেয়। বিশেষ করে “আমি যদি হাতি এঁকে জুড়ে দিই ডানা” ধরনের ছড়াগুলোতে বাস্তব ও কল্পনার সীমারেখা সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যায়। এখানে বড়দের যুক্তির বাইরে গিয়ে শিশুর ইচ্ছাই প্রধান হয়ে ওঠে।

বইটি মনস্তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী। তবে একই সঙ্গে একটি সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়—কল্পনার এই বিস্তার প্রায়ই সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন। পুরনো ছড়াগুলো যেখানে সমাজের দলিল হিসেবে কাজ করত, সেখানে এই বইয়ের ছড়াগুলো অনেকটাই ব্যক্তিক কল্পনার জগতে সীমাবদ্ধ। ফলে পাঠক একদিকে আনন্দিত হলেও অন্যদিকে এক ধরনের শূন্যতাও অনুভব করতে পারেন।

ছড়াগুলোর ভাষা বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ভাষা সহজ, সরল এবং মুখে উচ্চারণযোগ্য। এটি মূলত মৌখিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে, যা শিশুরা সহজেই মনে রাখতে পারে। শব্দের পুনরাবৃত্তি, অনুপ্রাস এবং ধ্বনিগত ছন্দ ছড়াগুলোকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। “ঝমঝম”, “তুতুল”, “ফুডুৎ ফাড়ুৎ” ইত্যাদি শব্দ শ্রবণযোগ্যতার আনন্দ তৈরি করে।

তবে কিছু ছড়ায় দেখা যায়, ছন্দের খেলাই অর্থের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে কোথাও কোথাও ভাবের গভীরতা কমে গেছে। ছড়ার শক্তি আসলে ছন্দ ও অর্থের সমন্বয়ে; যেখানে এই ভারসাম্য দুর্বল হয়, সেখানে ছড়া কেবল শব্দের খেলায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

বইটির অলংকরণও উল্লেখযোগ্য। আশরাফুল ইসলাম রানার আঁকা ছবিগুলো ছড়ার জগতকে দৃশ্যমান করে তুলেছে। সীমিত রঙের ব্যবহার থাকলেও রেখার মাধ্যমে প্রাণসঞ্চার করা হয়েছে। অলংকরণ এখানে কেবল ব্যাখ্যা নয়; বরং ছড়ার সহযাত্রী হিসেবে কাজ করেছে।
বিশেষ করে জড়বস্তুকে জীবন্ত করার কৌশল—যেমন হাতি ওড়ে, রেলগাড়ি হাসে, বইয়ের ভেতর ফুল ফোটে—শিশুর কল্পনাকে আরও বিস্তৃত করে। এই anthropomorphism কৌশল শিশুসাহিত্যে নতুন নয়, তবে এখানে এটি সচেতনভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, যা পাঠ-অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

ছড়ার ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করলে বইটির অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়। লোকছড়া ছিল সামাজিক স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার ধারক। চর্যাপদ থেকে শুরু করে খনার বচন, বাউল ও লোকজ ধারার ছড়ায় জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতা প্রতিফলিত হতো। সেখানে কৃষি, ধর্ম, দারিদ্র্য, যুদ্ধ ও প্রতিরোধ একসঙ্গে উপস্থিত ছিল।
আধুনিক যুগে এসে ছড়া অনেকটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। “এইটা ছড়ার বই” সেই প্রবণতারই অংশ। এটি সমাজের পরিবর্তে ব্যক্তির কল্পনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনকে সরাসরি ইতিবাচক বা নেতিবাচক বলা কঠিন, কারণ সাহিত্য সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই রূপান্তরিত হয়।
তবে সমালোচনার জায়গা হলো, এই রূপান্তরের ফলে ছড়ার ঐতিহাসিক ও সামাজিক গভীরতা কিছুটা ক্ষীণ হয়েছে। পুরনো ছড়াগুলো যেখানে সমাজের দলিল ছিল, সেখানে এই বইয়ের ছড়াগুলো প্রধানত কল্পনার আনন্দে সীমাবদ্ধ।

তবুও বইটির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। কারণ এটি নতুন প্রজন্মের ছড়া-পাঠের অভ্যাসকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছে। আধুনিক শিশুরা এখন আর কেবল লোকজ পরিবেশে বড় হচ্ছে না; তারা প্রযুক্তি, শহর এবং ভিন্নতর অভিজ্ঞতার মধ্যে বেড়ে উঠছে। সেই বাস্তবতার সঙ্গে ছড়াকে যুক্ত করার চেষ্টা এই বইয়ে স্পষ্ট।
বাংলা শিশুসাহিত্যের ধারায় “এইটা ছড়ার বই” একটি কল্পনাশ্রয়ী, আনন্দমুখর এবং আধুনিক সংযোজন। এটি ছড়াকে কঠোর কাঠামো থেকে মুক্ত করে কল্পনার উন্মুক্ত পরিসরে নিয়ে গেছে। তবে একই সঙ্গে এটি ছড়ার ঐতিহ্যগত সামাজিক গভীরতার সঙ্গে পুরোপুরি সংযোগ স্থাপন করতে পারেনি।
ফলে বইটির অবস্থান দ্বৈত—একদিকে এটি সফল শিশুতোষ কল্পনার বই, অন্যদিকে ঐতিহ্য থেকে কিছুটা বিচ্যুত আধুনিক প্রয়াস।

তবুও সাহিত্য হিসেবে এর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, এটি ছড়াকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। আর এই নতুন করে ভাবনার মধ্যেই একটি ভালো সাহিত্যকর্মের সার্থকতা নিহিত থাকে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

পত্নীতলায় ট্রাক্টরের চাকায় পিষ্ট হয়ে বৃদ্ধের মৃত্যু

এইটা ছড়ার বই: সমকালীন পাঠ, পর্যালোচনা ও অবস্থান নির্ণয়

Update Time : ০২:০৮:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬

মারুফা আক্তার আইভি

শিশুসাহিত্যের বিস্তৃত ভুবনে ছড়া এমন একটি মাধ্যম, যা কখনোই কেবল বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ছড়া একদিকে যেমন স্মৃতি ও লোকজ জীবনের ধারক, অন্যদিকে তেমনি সমাজ, রাজনীতি, কল্পনা ও ভাষার সৃজনশীল খেলাও বটে। চর্যাপদের ধ্বনিগত অনুরণন থেকে শুরু করে খনার বচনের কৃষিজ্ঞান, লোকমুখে প্রচলিত ছেলেভুলানো ছড়া, ব্রিটিশবিরোধী প্রতিরোধী ছন্দ কিংবা স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যঙ্গ—সব মিলিয়ে ছড়া হয়ে উঠেছে জনমানুষের সবচেয়ে সহজ অথচ গভীর অভিব্যক্তির মাধ্যম।

এই দীর্ঘ ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপটে আমির খসরু সেলিমের “এইটা ছড়ার বই” কেবল একটি শিশুতোষ সংকলন নয়; বরং ছড়ার পুনর্নির্মাণ ও আধুনিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বইটি পাঠ করতে গিয়ে স্পষ্ট হয়, এখানে ছড়া আর কেবল ছন্দ বা অন্ত্যমিলের অনুশীলন নয়; এটি কল্পনা, দৃশ্য, মনস্তত্ত্ব এবং সমকালীন শিশুবোধের এক বহুমাত্রিক প্রকাশভঙ্গি।

শিরোনাম থেকেই বইটি একটি অবস্থান ঘোষণা করে। “এইটা ছড়ার বই” নামটি সরল, অনাড়ম্বর এবং আত্মসচেতন। এটি কোনো আড়ম্বরপূর্ণ সাহিত্যিক ঘোষণা নয়; এ যেন পাঠকের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের একটি নির্ভার ভঙ্গি। এই নির্ভারতা বইটির ভেতরের ছড়াগুলোর কাঠামোতেও প্রতিফলিত হয়েছে। ছড়াগুলোতে জটিলতার চাপ নেই, অলংকারের অতিরিক্ত ভার নেই; বরং সহজ শব্দে কল্পনার বিস্তার ঘটানো হয়েছে।

তবে এই সরলতার মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঁকি দেয়—সরলতা কি ছড়ার ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে, নাকি কোথাও গিয়ে তার সামাজিক গভীরতাকে ক্ষীণ করেছে? এই দ্বন্দ্বই বইটির পাঠ-অভিজ্ঞতাকে জটিল ও অর্থবহ করে তোলে।

বাংলা ছড়ার ঐতিহ্যগত কাঠামোয় আমরা একটি দ্বৈত চরিত্র লক্ষ করি। একদিকে রয়েছে লোকজ আনন্দ, ঘুমপাড়ানি সুর এবং কৃষিভিত্তিক জীবনের প্রতিচ্ছবি; অন্যদিকে রয়েছে সামাজিক বাস্তবতার প্রতীকী উপস্থাপন—যেখানে যুদ্ধ, দারিদ্র্য, শোষণ, প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গ একসঙ্গে অবস্থান করে। উদাহরণ হিসেবে “খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে” কিংবা খনার বচনের মতো ছড়াগুলো এই দ্বৈত চরিত্রকে স্পষ্ট করে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে “এইটা ছড়ার বই” তুলনামূলকভাবে ভিন্ন পথে হাঁটে। এখানে সামাজিক ইতিহাসের ভার কম, কল্পনার স্বাধীনতা বেশি। বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর কল্পনার নির্মাণ। প্রতিটি ছড়া বাস্তবতার নিয়ম ভেঙে নতুন এক জগৎ তৈরি করে। হাতি ওড়ে, বইয়ের ভেতর থেকে পাখির বাসা বের হয়, রেলগাড়ি হাসে, মেঘ বন্ধুর মতো আচরণ করে।

এই ধরনের কল্পনা শিশুর মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ এটি বাস্তবতার সীমা ছাড়িয়ে ভাবতে শেখায়। শিশুমন স্বভাবতই সীমাহীন, আর এই বই সেই সীমাহীনতাকে স্বীকৃতি দেয়। বিশেষ করে “আমি যদি হাতি এঁকে জুড়ে দিই ডানা” ধরনের ছড়াগুলোতে বাস্তব ও কল্পনার সীমারেখা সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যায়। এখানে বড়দের যুক্তির বাইরে গিয়ে শিশুর ইচ্ছাই প্রধান হয়ে ওঠে।

বইটি মনস্তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী। তবে একই সঙ্গে একটি সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়—কল্পনার এই বিস্তার প্রায়ই সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন। পুরনো ছড়াগুলো যেখানে সমাজের দলিল হিসেবে কাজ করত, সেখানে এই বইয়ের ছড়াগুলো অনেকটাই ব্যক্তিক কল্পনার জগতে সীমাবদ্ধ। ফলে পাঠক একদিকে আনন্দিত হলেও অন্যদিকে এক ধরনের শূন্যতাও অনুভব করতে পারেন।

ছড়াগুলোর ভাষা বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ভাষা সহজ, সরল এবং মুখে উচ্চারণযোগ্য। এটি মূলত মৌখিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে, যা শিশুরা সহজেই মনে রাখতে পারে। শব্দের পুনরাবৃত্তি, অনুপ্রাস এবং ধ্বনিগত ছন্দ ছড়াগুলোকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। “ঝমঝম”, “তুতুল”, “ফুডুৎ ফাড়ুৎ” ইত্যাদি শব্দ শ্রবণযোগ্যতার আনন্দ তৈরি করে।

তবে কিছু ছড়ায় দেখা যায়, ছন্দের খেলাই অর্থের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে কোথাও কোথাও ভাবের গভীরতা কমে গেছে। ছড়ার শক্তি আসলে ছন্দ ও অর্থের সমন্বয়ে; যেখানে এই ভারসাম্য দুর্বল হয়, সেখানে ছড়া কেবল শব্দের খেলায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

বইটির অলংকরণও উল্লেখযোগ্য। আশরাফুল ইসলাম রানার আঁকা ছবিগুলো ছড়ার জগতকে দৃশ্যমান করে তুলেছে। সীমিত রঙের ব্যবহার থাকলেও রেখার মাধ্যমে প্রাণসঞ্চার করা হয়েছে। অলংকরণ এখানে কেবল ব্যাখ্যা নয়; বরং ছড়ার সহযাত্রী হিসেবে কাজ করেছে।
বিশেষ করে জড়বস্তুকে জীবন্ত করার কৌশল—যেমন হাতি ওড়ে, রেলগাড়ি হাসে, বইয়ের ভেতর ফুল ফোটে—শিশুর কল্পনাকে আরও বিস্তৃত করে। এই anthropomorphism কৌশল শিশুসাহিত্যে নতুন নয়, তবে এখানে এটি সচেতনভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, যা পাঠ-অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

ছড়ার ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করলে বইটির অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়। লোকছড়া ছিল সামাজিক স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার ধারক। চর্যাপদ থেকে শুরু করে খনার বচন, বাউল ও লোকজ ধারার ছড়ায় জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতা প্রতিফলিত হতো। সেখানে কৃষি, ধর্ম, দারিদ্র্য, যুদ্ধ ও প্রতিরোধ একসঙ্গে উপস্থিত ছিল।
আধুনিক যুগে এসে ছড়া অনেকটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। “এইটা ছড়ার বই” সেই প্রবণতারই অংশ। এটি সমাজের পরিবর্তে ব্যক্তির কল্পনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনকে সরাসরি ইতিবাচক বা নেতিবাচক বলা কঠিন, কারণ সাহিত্য সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই রূপান্তরিত হয়।
তবে সমালোচনার জায়গা হলো, এই রূপান্তরের ফলে ছড়ার ঐতিহাসিক ও সামাজিক গভীরতা কিছুটা ক্ষীণ হয়েছে। পুরনো ছড়াগুলো যেখানে সমাজের দলিল ছিল, সেখানে এই বইয়ের ছড়াগুলো প্রধানত কল্পনার আনন্দে সীমাবদ্ধ।

তবুও বইটির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। কারণ এটি নতুন প্রজন্মের ছড়া-পাঠের অভ্যাসকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছে। আধুনিক শিশুরা এখন আর কেবল লোকজ পরিবেশে বড় হচ্ছে না; তারা প্রযুক্তি, শহর এবং ভিন্নতর অভিজ্ঞতার মধ্যে বেড়ে উঠছে। সেই বাস্তবতার সঙ্গে ছড়াকে যুক্ত করার চেষ্টা এই বইয়ে স্পষ্ট।
বাংলা শিশুসাহিত্যের ধারায় “এইটা ছড়ার বই” একটি কল্পনাশ্রয়ী, আনন্দমুখর এবং আধুনিক সংযোজন। এটি ছড়াকে কঠোর কাঠামো থেকে মুক্ত করে কল্পনার উন্মুক্ত পরিসরে নিয়ে গেছে। তবে একই সঙ্গে এটি ছড়ার ঐতিহ্যগত সামাজিক গভীরতার সঙ্গে পুরোপুরি সংযোগ স্থাপন করতে পারেনি।
ফলে বইটির অবস্থান দ্বৈত—একদিকে এটি সফল শিশুতোষ কল্পনার বই, অন্যদিকে ঐতিহ্য থেকে কিছুটা বিচ্যুত আধুনিক প্রয়াস।

তবুও সাহিত্য হিসেবে এর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, এটি ছড়াকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। আর এই নতুন করে ভাবনার মধ্যেই একটি ভালো সাহিত্যকর্মের সার্থকতা নিহিত থাকে।