Dhaka ০৮:৩৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
জাভা সাগরে উল্টে গেল যাত্রীবাহী জাহাজ, ৬ জনের মৃত্যু—নিখোঁজ ১৩০ গাইবান্ধায় সংঘাত সংবেদনশীলতা ও দ্বন্দ্ব নিরসনে চার দিনের কর্মশালা শুরু ঢাকা-রংপুর লংমার্চ: পলাশবাড়ীর পথসভা সফল করতে গাইবান্ধায় প্রস্তুতি সভা বাণিজ্য মেলাকে ঘিরে এনসিপির প্রস্তাবকে আমলে নিচ্ছে গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্স জুলাই যোদ্ধা ও শহিদ পরিবারের সাথে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর মত বিনিময় উত্তরসংযোগ: নদীর দুই পাড় আর একটি অপেক্ষার গল্প গাইবান্ধায় মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ কমিটির সমন্বয় সভা গাইবান্ধায় সড়ক দুর্ঘটনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক ও মেয়ে আহত ১০ মাস বিচারকহীন সাদুল্লাপুর সহকারী জজ আদালত, ঝুলে আছে প্রায় ৪ হাজার মামলা ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমার বড় অর্জন

প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার পেলেন গাইবান্ধার ‘এক টাকার মাস্টার’ লুৎফর রহমান

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:৫৫:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬
  • ২১৪ Time View

আফতাব হোসেন, গাইবান্ধা:

গাইবান্ধায় ‘এক টাকার মাস্টার’ খ্যাত লুৎফর রহমান প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো ঈদ উপহার পেয়েছেন। সদর উপজেলার বাগুড়িয়া গ্রামে তাঁর নিজ বাসভবনে এই উপহার সামগ্রী তুলে দেন গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা। উপহার পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে লুৎফর রহমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে বাগুড়িয়া গ্রাম। যমুনা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ধারে একটি টিনের ঘরে সপরিবারে বসবাস করেন লুৎফর রহমান। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা না করলেও এলাকাবাসীর কাছে তিনি ‘মাস্টার’ নামেই পরিচিত। ১৯৭২ সাল থেকে সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে ব্রতী হন তিনি। শুরুতে বিনা পারিশ্রমিকে পড়ালেও পরবর্তী সময়ে স্থানীয় অভিভাবকদের অনুরোধে শিক্ষার্থীপ্রতি দৈনিক মাত্র এক টাকা করে নিতে শুরু করেন। আর এ কারণেই লোকমুখে তাঁর নাম হয়ে যায় ‘এক টাকার মাস্টার’। দীর্ঘ পাঁচ দশকের শিক্ষকতা জীবনে তিনি প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি শিশুকে পাঠদান করেছেন।

লুৎফর রহমানের জন্ম ১৯৫০ সালের ৭ আগস্ট, ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া গ্রামে। ১৯৭২ সালে গুণভরি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করলেও চরম অর্থাভাবের কারণে কলেজে ভর্তি হতে পারেননি। নিজের সেই আক্ষেপ থেকেই অবহেলিত শিশুদের ঝরে পড়া রোধ ও আলোকিত মানুষ গড়ার নেশায় নেমে পড়েন তিনি। ১৯৭৪ সালের নদীভাঙনে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পর বাগুড়িয়া বাঁধের ধারে আশ্রয় নেন। বর্তমানে দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক লুৎফর রহমানের বড় ছেলে অভাবের কারণে পড়াশোনা করতে না পেরে অটোরিকশা চালান এবং ছোট ছেলে মাদ্রাসা থেকে দাওরা পাস করে বেকার রয়েছেন।

প্রতিদিন ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়ে পায়ে হেঁটে কিংবা সাইকেলে চড়ে বাগুড়িয়া, মদনেরপাড়া, পুলবন্দি, চন্দিয়া, ঢুলিপাড়া ও কঞ্চিপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের গাছতলায়, আঙিনায় কিংবা বাঁধের ধারে বসিয়ে পরম যত্নে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত শেখান তিনি। বর্তমানে তাঁর ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৬০-৭০ জন। তাঁর হাতে গড়া অনেক শিক্ষার্থী আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।

স্থানীয় সমাজকর্মী বদিয়াজ্জামান মিয়া তাঁর এই অনন্য পাঠদান পদ্ধতিকে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো ও সক্রেটিসের সাথে তুলনা করে বলেন, “তিনি যেভাবে গ্রামে ঘুরে জ্ঞান ছড়ান, তা সত্যিই অতুলনীয়।” স্থানীয় গিদারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ ইদু বলেন, “লুৎফর মাস্টার একজন ব্যতিক্রমী মানুষ, তিনি আমাদের অহংকার।”

গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস্ সালাম জানান, লুৎফর রহমান মাস্টারের এই অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে আগে ‘জিইউকে গুণিজন সম্মাননা’ দেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর এই ঈদ উপহার তাঁর মহান ত্যাগের প্রতি এক অনন্য সম্মান ও মর্যাদা।

পারিবারিক আর্থিক অবস্থার তেমন পরিবর্তন না হলেও, হাজারো শিক্ষার্থীকে সুশিক্ষায় আলোকিত করতে পারাকেই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে করেন গুণী এই শিক্ষক।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

জাভা সাগরে উল্টে গেল যাত্রীবাহী জাহাজ, ৬ জনের মৃত্যু—নিখোঁজ ১৩০

প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার পেলেন গাইবান্ধার ‘এক টাকার মাস্টার’ লুৎফর রহমান

Update Time : ১২:৫৫:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬

আফতাব হোসেন, গাইবান্ধা:

গাইবান্ধায় ‘এক টাকার মাস্টার’ খ্যাত লুৎফর রহমান প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো ঈদ উপহার পেয়েছেন। সদর উপজেলার বাগুড়িয়া গ্রামে তাঁর নিজ বাসভবনে এই উপহার সামগ্রী তুলে দেন গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা। উপহার পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে লুৎফর রহমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে বাগুড়িয়া গ্রাম। যমুনা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ধারে একটি টিনের ঘরে সপরিবারে বসবাস করেন লুৎফর রহমান। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা না করলেও এলাকাবাসীর কাছে তিনি ‘মাস্টার’ নামেই পরিচিত। ১৯৭২ সাল থেকে সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে ব্রতী হন তিনি। শুরুতে বিনা পারিশ্রমিকে পড়ালেও পরবর্তী সময়ে স্থানীয় অভিভাবকদের অনুরোধে শিক্ষার্থীপ্রতি দৈনিক মাত্র এক টাকা করে নিতে শুরু করেন। আর এ কারণেই লোকমুখে তাঁর নাম হয়ে যায় ‘এক টাকার মাস্টার’। দীর্ঘ পাঁচ দশকের শিক্ষকতা জীবনে তিনি প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি শিশুকে পাঠদান করেছেন।

লুৎফর রহমানের জন্ম ১৯৫০ সালের ৭ আগস্ট, ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া গ্রামে। ১৯৭২ সালে গুণভরি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করলেও চরম অর্থাভাবের কারণে কলেজে ভর্তি হতে পারেননি। নিজের সেই আক্ষেপ থেকেই অবহেলিত শিশুদের ঝরে পড়া রোধ ও আলোকিত মানুষ গড়ার নেশায় নেমে পড়েন তিনি। ১৯৭৪ সালের নদীভাঙনে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পর বাগুড়িয়া বাঁধের ধারে আশ্রয় নেন। বর্তমানে দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক লুৎফর রহমানের বড় ছেলে অভাবের কারণে পড়াশোনা করতে না পেরে অটোরিকশা চালান এবং ছোট ছেলে মাদ্রাসা থেকে দাওরা পাস করে বেকার রয়েছেন।

প্রতিদিন ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়ে পায়ে হেঁটে কিংবা সাইকেলে চড়ে বাগুড়িয়া, মদনেরপাড়া, পুলবন্দি, চন্দিয়া, ঢুলিপাড়া ও কঞ্চিপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের গাছতলায়, আঙিনায় কিংবা বাঁধের ধারে বসিয়ে পরম যত্নে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত শেখান তিনি। বর্তমানে তাঁর ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৬০-৭০ জন। তাঁর হাতে গড়া অনেক শিক্ষার্থী আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।

স্থানীয় সমাজকর্মী বদিয়াজ্জামান মিয়া তাঁর এই অনন্য পাঠদান পদ্ধতিকে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো ও সক্রেটিসের সাথে তুলনা করে বলেন, “তিনি যেভাবে গ্রামে ঘুরে জ্ঞান ছড়ান, তা সত্যিই অতুলনীয়।” স্থানীয় গিদারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ ইদু বলেন, “লুৎফর মাস্টার একজন ব্যতিক্রমী মানুষ, তিনি আমাদের অহংকার।”

গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস্ সালাম জানান, লুৎফর রহমান মাস্টারের এই অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে আগে ‘জিইউকে গুণিজন সম্মাননা’ দেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর এই ঈদ উপহার তাঁর মহান ত্যাগের প্রতি এক অনন্য সম্মান ও মর্যাদা।

পারিবারিক আর্থিক অবস্থার তেমন পরিবর্তন না হলেও, হাজারো শিক্ষার্থীকে সুশিক্ষায় আলোকিত করতে পারাকেই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে করেন গুণী এই শিক্ষক।