
নজরুল ইসলাম
সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবনকে সময়ের ক্যালেন্ডারে আবদ্ধ করা যায় না। তাঁরা কোনো একটি শতকের নন; তাঁরা হাজার বছরের আলোকবর্তিকা। তাঁদের চিন্তা যুগের সীমা অতিক্রম করে জাতির চেতনায় স্থায়ী আশ্রয় নেয়। বাংলা ভাষা ও বাঙালির বৌদ্ধিক ইতিহাসে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সেই বিরল উচ্চতার একজন মনীষী। তাঁর জন্মবার্ষিকী আমাদের কাছে কেবল শ্রদ্ধা নিবেদনের উপলক্ষ নয়; এটি আত্মসমালোচনার, আত্মপরিচয় পুনর্নির্মাণের এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও দিন।
উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ ও পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯) ছিলেন বহুভাষাবিদ, শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক। ১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার পেয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তিনি ১৮টিরও বেশি ভাষা জানতেন এবং বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ব্যাকরণ নিয়ে তাঁর অসামান্য গবেষণা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
পিতার নাম মফিজউদ্দিন আহমদ। মাতার নাম হুরুন্নেসা। শহীদুল্লাহ নামটি তাঁর মা পছন্দ করে রেখেছিলেন। আকীকা হয়েছিল ‘মুহম্মদ ইব্রাহিম’ নামে। তাঁর মা মনে করলেন শহীদে কারবালার চাঁদে তাঁর ছেলে গর্ভে এসেছিল। কাজেই তাঁর নাম ‘শহীদুল্লাহ’ হলেই ক্ষণজন্মা হবে। পরবর্তীকালে তাঁর মায়ের ধারণা সত্যি বলে পরিগণিত হয়েছিল।
ভাষা কখনো কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়। একটি ভাষার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকে হাজার বছরের ইতিহাস, মানুষের হাসি-কান্না, লোকসংস্কৃতি, দর্শন, বিশ্বাস, প্রতিবাদ ও স্বপ্ন। নদীর উৎস যেমন পাহাড়ের অদৃশ্য ঝরনায়, তেমনি একটি জাতির শক্তির উৎস তার ভাষা। যে জাতি তার ভাষার শেকড় ভুলে যায়, সে ধীরে ধীরে তার ইতিহাসের মানচিত্রও হারিয়ে ফেলে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এই গভীর সত্য উপলব্ধি করেছিলেন বলেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি, বিবর্তন ও সাহিত্যিক ঐতিহ্য নিয়ে আজীবন গবেষণা করেছেন। তাঁর অনুসন্ধান ছিল শব্দের নয়, সভ্যতার; ধ্বনির নয়, মানুষের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার।
তাঁর গবেষণা বাংলা ভাষাকে একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি দেখিয়েছেন, বাংলা কোনো আকস্মিক ভাষা নয়; এটি বহু শতাব্দীর সাংস্কৃতিক বিনিময়, সামাজিক বিবর্তন এবং মানবিক অভিজ্ঞতার সম্মিলিত সৃষ্টি। ভাষার ভেতরে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন মানুষের চলার ইতিহাস। তাই তাঁর কাছে ভাষাবিজ্ঞান ছিল কেবল একাডেমিক শাস্ত্র নয়; জাতিসত্তা অনুধাবনের এক গভীর মানবিক পদ্ধতি।
ড. শহীদুল্লাহর বিদ্যা ছিল বিস্ময়কর, কিন্তু তাঁর বিনয় ছিল আরও বিস্ময়কর। বহু ভাষায় অনায়াস পাণ্ডিত্য থাকা সত্ত্বেও তিনি মাতৃভাষাকে জ্ঞানের কেন্দ্রস্থলে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন—যে জাতি নিজের ভাষায় জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারে না, সে জাতি অনুবাদনির্ভর হয়ে পড়ে; আর যে জাতি কেবল ধার করা জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে, তার সৃজনশীল স্বাধীনতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই বাংলা ভাষাকে তিনি আবেগের নয়, জ্ঞানসৃষ্টির ভাষা হিসেবে কল্পনা করেছিলেন।
এই দর্শন আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক যোগাযোগের যুগে ভাষা শুধু সংস্কৃতির বাহন নয়; এটি জ্ঞান, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতারও ভিত্তি। যে ভাষায় গবেষণা হয়, যে ভাষায় নতুন ধারণা জন্ম নেয়, যে ভাষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পরিভাষা তৈরি হয়, সেই ভাষাই ভবিষ্যৎ নির্মাণে নেতৃত্ব দেয়। বাংলা ভাষার সামনে আজ এই বড় চ্যালেঞ্জ—আমরা কি তাকে কেবল আবেগের ভাষা হিসেবে রেখে দেব, নাকি গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ ভাষায় উন্নীত করব?
এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজ—সবার সম্মিলিত উদ্যোগে নিহিত। বাংলা ভাষায় উচ্চমানের গবেষণা, বৈজ্ঞানিক পরিভাষা, ডিজিটাল সম্পদ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-উপযোগী ভাষা-প্রযুক্তির উন্নয়ন আজ আর বিলাসিতা নয়; এটি জাতীয় প্রয়োজন। এই প্রয়োজনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জীবন আমাদের পথনির্দেশক।
তবে ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে গেলে আমাদের আরেকটি বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। তথ্যের বিপুল বিস্তার সত্ত্বেও আমাদের সমাজে গভীর পাঠ, গবেষণা এবং মননশীল বিতর্কের পরিসর সংকুচিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সংস্কৃতি এখনও প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছায়নি; বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে ক্ষীণ হয়েছে; দ্রুত মতামত দেওয়ার প্রবণতা গভীর অনুসন্ধিৎসাকে আড়াল করছে। এই বৌদ্ধিক সংকট কেবল শিক্ষার সংকট নয়; এটি জাতীয় সৃজনশীলতারও সংকট।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জীবন এই সংকটের বিপরীতে এক অনন্য প্রতীক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, জ্ঞান কখনো তাড়াহুড়োর ফসল নয়; এটি ধৈর্য, শ্রম, বিনয় ও সত্যের প্রতি অঙ্গীকারের দীর্ঘ সাধনা। তিনি প্রমাণ করেছেন, গবেষণা কেবল ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়; এটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী স্থাপনা ইট-পাথরের নয়, জ্ঞান ও চিন্তার।
আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি হবে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার, যেখানে মাতৃভাষা হবে গবেষণার ভাষা, বিশ্ববিদ্যালয় হবে নতুন চিন্তার উর্বর ভূমি, গ্রন্থাগার হবে নাগরিক জীবনের প্রাণকেন্দ্র, আর প্রযুক্তি হবে বাংলা ভাষার বিকাশের সহযাত্রী। বাংলা ভাষাকে যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিজ্ঞান ও বৈশ্বিক জ্ঞানব্যবস্থার সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে নেওয়া যায়, তবে সেটিই হবে তাঁর স্বপ্নের সবচেয়ে অর্থবহ বাস্তবায়ন।
মহান মানুষদের স্মরণ করার প্রকৃত অর্থ তাঁদের নামে অনুষ্ঠান আয়োজন নয়; তাঁদের অসমাপ্ত স্বপ্নকে নিজের সময়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন, ভাষা রক্ষা মানে কেবল শব্দ রক্ষা নয়; মুক্তবুদ্ধি, গবেষণা, সংস্কৃতি এবং মানবিক সভ্যতার ধারাবাহিকতাকে রক্ষা করা।
আজ ১০ জুলাই তাই শুধু একটি জন্মদিন নয়; এটি জ্ঞানের কাছে ফিরে যাওয়ার আহ্বান, ভাষার গভীরে ফিরে যাওয়ার আহ্বান এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের অঙ্গীকার। যতদিন বাংলা ভাষা বেঁচে থাকবে, যতদিন জ্ঞানকে জাতীয় শক্তি হিসেবে মূল্য দেওয়া হবে, ততদিন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আমাদের মননের আকাশে এক অনির্বাণ নক্ষত্র হয়ে জ্বলতে থাকবেন।
লেখক: গণমাধ্যম ও সমাজকর্মী

Reporter Name 
























