
আফতাব হোসেন, গাইবান্ধা:
একসময়ের প্রমত্তা যমুনা তার যৌবন হারিয়ে এখন শীর্ণকায় খালে পরিণত হয়েছে। বর্ষায় যে নদী দুকূল ছাপিয়ে ভয়াল রূপ ধারণ করে, শুষ্ক মৌসুমে সেই যমুনাই এখন ধুধু বালুচর। পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় জেগে উঠেছে অসংখ্য চর, যার ফলে ভেঙে পড়েছে নৌকানির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা। জীবিকার তাগিদে চরাঞ্চলের মানুষকে এখন মাইলের পর মাইল বালুচর ও হাঁটুজল পাড়ি দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
সরেজমিনে যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। নদীর বুকে এখন পানির চেয়ে চরের বিস্তৃতিই বেশি। বিশাল জলরাশি শুকিয়ে সরু খালে পরিণত হয়েছে। যেখানে একসময় বড় বড় নৌকা ও ট্রলার চলত, সেখানে এখন হেঁটেই নদী পার হচ্ছেন মানুষ। বিশেষ করে চরাঞ্চলের কৃষকদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। কাঁধে লাঙল ও হাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে হাঁটুজল পেরিয়ে গন্তব্যে ছুটছেন তারা।
গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ব্রহ্মপুত্র-যমুনার চরাঞ্চলে প্রায় ১৩৪টি চর গ্রামে ৪ লাখেরও বেশি মানুষের বসবাস। জীবন-জীবিকার তাগিদে এদের প্রতিনিয়ত মূল ভূখণ্ডের সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়। বর্ষা মৌসুমে নৌপথের সুবিধা থাকলেও, শুষ্ক মৌসুমে যাতায়াত হয়ে ওঠে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
স্থানীয়দের কণ্ঠেও ঝরে পড়ছে দীর্ঘশ্বাস। সদর উপজেলার কামারজানি চরের বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, “চরের মানুষের জন্য নদী ও পানিই উত্তম। পানি না থাকায় আমাদের ভোগান্তি বেড়ে গেছে।” কাপাসিয়া গ্রামের হুরমুজ আলী আক্ষেপ করে বলেন, “এক সময়ের রাক্ষুসে নদীগুলোর বর্তমান চেহারা দেখলে এখন মায়া লাগে।”
নাব্য সংকটে মৎস্যজীবীদের জীবিকাও আজ হুমকির মুখে। সাঘাটার দিঘলকান্দি চরের মৎস্যজীবী আজগর আলী বলেন, “পানি না থাকায় নদীতে মাছও নেই। আমাদের মতো পেশাজীবীদের জন্য এখন সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”
কৃষকরা জানান, নদীতে পানি না থাকায় সেচ কাজ দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া চরে উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতেও পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি। নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পায়ে হেঁটে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
নদী ও পরিবেশ বিশ্লেষক ড. আইনুন নিশাত মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং উজানের পানির প্রবাহ কমে যাওয়াই যমুনার এই নাব্য সংকটের মূল কারণ। তিনি সতর্ক করে বলেন, “দ্রুত নদী ড্রেজিং এবং পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে যমুনা তার অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে। এটি উত্তরের কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।”

Reporter Name 







