
আফতাব হোসেন, গাইবান্ধা
দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে গবরের ঘুঁটে আর গাছের ডালপালা দিয়েই রান্নাবান্নার কাজ চালাচ্ছেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ভাঙ্গা মোড় গ্রামের রহিমা বেগম। গাছে ডালপালা সবসময় সহজলভ্য না হলেও বাড়ির দুটি গরুর গবরই তার পরিবারের রান্নার প্রধান ভরসা। রহিমার মতো গ্রামীণ জনপদের অসংখ্য নারীকে প্রতিদিন সকালে রাস্তার পাশে গবরের ঘুঁটে শুকাতে দেখা যায়।
যুগ যুগ ধরে গ্রামীণ বাংলাদেশে রান্নাবান্নার প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে গবরের ঘুঁটে ও খড়ি। আপাতদৃষ্টিতে এসব জ্বালানিকে সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য মনে হলেও, জলবায়ু পরিবর্তন ও বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ‘ব্র্যাক’ এবং গাইবান্ধার শীর্ষস্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘গণ উন্নয়ন কেন্দ্র (জিইউকে)’-এর যৌথ মাঠপর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, ঐতিহ্যবাহী বায়োমাস পোড়ানোর ফলে গ্রামীণ অঞ্চলে বিপজ্জনক পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যসংকট তৈরি হচ্ছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার গ্রামীণ জনপদের প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবার আজও রান্না ও গৃহস্থালির কাজে প্রধানত গবরের ঘুঁটে ও খড়ির ওপর নির্ভর করে। এসব জ্বালানি ব্যবহারের কারণে প্রতিদিন প্রতিটি পরিবার থেকে গড়ে প্রায় ১২ থেকে ১৫ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে উন্মুক্ত হচ্ছে। এছাড়া অপরিশোধিত ও খোলামেলা উনানে দীর্ঘ সময় রান্না করার ফলে বিশেষ করে নারীদের মধ্যে ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী রোগ, হাঁপানি এবং চোখের ছানি পড়ার মতো স্বাস্থ্য সমস্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
জ্বালানির রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুকনো গবরের ঘুঁটের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই কার্বন। প্রতি কেজি শুকনো ঘুঁটে পোড়ালে বায়ুমণ্ডলে প্রায় ১.৩ থেকে ১.৫ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। পাশাপাশি, গবর জমিয়ে রাখা ও শুকানোর প্রক্রিয়ায় নির্গত হয় শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস মিথেন, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় বায়ুমণ্ডলে ২৮ গুণ বেশি তাপ আটকে রাখতে সক্ষম। অন্যদিকে, কাঠে কার্বনের উপস্থিতি প্রায় ৫০ শতাংশ হওয়ায় প্রতি কেজি শুকনো খড়ি পোড়ালে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে প্রায় ১.৫ থেকে ১.৮ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড।
এই বিষাক্ত ধোঁয়ায় প্রচুর পরিমাণে সূক্ষ্ম ধূলিকণা এবং ব্ল্যাক কার্বন বা কালিগ্যাস থাকে। ব্ল্যাক কার্বন সূর্যের আলো শোষণ করে স্থানীয় তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি করছে, যা সামগ্রিক জলবায়ু পরিবর্তনের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করে। একই সাথে বিষাক্ত ধোঁয়ায় ঘরোয়া বায়ুদূষণ তীব্র হওয়ায় তা গ্রামীণ জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব ঘাতক হয়ে উঠেছে।
ঐতিহ্যবাহী এই জ্বালানির ব্যবহার প্রকৃতিকে দ্বিমুখী ক্ষতির মুখে ফেলছে। গবর পুড়িয়ে ফেলায় মাটির স্বাভাবিক জৈব উপাদান ও উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে, যার ফলে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। উল্লেখ্য, এসব রাসায়নিক সার উৎপাদনেও প্রচুর পরিমাণে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রয়োজন হয়। একই সাথে খড়ি সংগ্রহের জন্য অনবরত গাছের ডালপালা ও ছোট গাছ কেটে ফেলার কারণে পরিবেশের স্বাভাবিক কার্বন শোষণ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে গণ উন্নয়ন কেন্দ্র (জিইউকে)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস্ সালাম বলেন, গ্রামীণ জনপদে ঘুঁটে ও খড়ি পোড়ানোকে সাধারণ বিষয় মনে করা হলেও এটি পরিবেশ, মাটি এবং জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। একদিকে কার্বন নিঃসরণে জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রামীণ নারীরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, গবরকে না পুড়িয়ে পরিকল্পিতভাবে বায়োগ্যাস তৈরি এবং পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এতে যেমন পরিচ্ছন্ন জ্বালানি পাওয়া যাবে, তেমনি মাটির উর্বরতা রক্ষা করাও সম্ভব হবে। টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে গ্রামীণ পর্যায়ের এই নীরব ট্র্যাজেডি রোধে এখনই দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

Reporter Name 














