
বিনোদন মানুষের জীবনে বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ জীবনযাপনের এক অপরিহার্য অংশ। দৈনন্দিন কাজের ক্লান্তি মোছা, মানসিক প্রশান্তি, সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করা এবং সৃজনশীলতাকে বাঁচিয়ে রাখার মূলে থাকে অবসরের অর্থবহ ব্যবহার। ঘাঘট, করতোয়া আর তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রের পলিমাটিতে গড়ে ওঠা গাইবান্ধা জেলার বিনোদন ও সংস্কৃতির রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। অতীতের সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমানের বাস্তবতা মিলিয়ে দেখলে যেমন গর্বের জায়গাগুলো স্পষ্ট হয়, তেমনি ধরা পড়ে সমকালের নানা সীমাবদ্ধতাও।
পৌরপার্ক: শতবর্ষী স্মৃতির খোলা প্রাঙ্গণ
গাইবান্ধা শহরের প্রাচীনতম ও চিরচেনা বিনোদনকেন্দ্র পৌরপার্ক। সদর উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শহরবাসীর মুক্ত বাতাসের কথা ভেবে ১৯২৭ সালে জমিদার গোবিন্দলাল রায়ের দান করা প্রায় এক একর সাত শতক জমিতে এই পার্কের যাত্রা শুরু হয়। পৌরসভা পরিচালিত এই প্রাঙ্গণটি আজও শহরের প্রধান সামাজিক-সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও গণজমায়েতের প্রাণকেন্দ্র।
পার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফোয়ারা ও সানবাঁধানো ঘাটসহ ঐতিহ্যবাহী পুকুর। চারপাশের সবুজ, সারি সারি বেঞ্চ, ফুড ক্যান্টিন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আর পশুপাখির প্রতিকৃতি মিলিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নানা বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে এই চত্বর। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে পুকুরের জলে আলোর খেলা, প্রবীণদের আড্ডা আর শিশুদের দুরন্তপনা মিলেমিশে এক চিরচেনা আবহ তৈরি করে। শুধু চিত্তবিনোদনই নয়, প্রায় এক শতাব্দী ধরে গাইবান্ধার নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনেরও নীরব সাক্ষী এই পার্ক।
সিনেমা হল: রুপালি পর্দার জৌলুস ও ফিকে হওয়া ভিড়
একসময় গাইবান্ধা জেলা ও উপজেলা শহরগুলোতে সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল সিনেমা হল। ঈদ বা যেকোনো উৎসবে নতুন ছবি দেখতে পরিবার কিংবা বন্ধুদের নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার রীতি ছিল সামাজিক জীবনের অংশ। স্মৃতিচারণে আজও উঠে আসে চৌধুরী টকিজ, নূপুর কিংবা মায়াহলের নাম। তবে কালের আবর্তে এসব হলের অধিকাংশ বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা বদলে গেছে ভবনের চরিত্র। বর্তমানে জেলা সদরে কেবল তাজ সিনেমা হলের মতো হাতে গোনা কয়েকটি হল টিকে রয়েছে।
প্রেক্ষাগৃহ শুধু ছবি দেখার জায়গা ছিল না, তা ছিল স্থানীয় অর্থনীতি ও সামাজিক মেলামেশার এক বড় মাধ্যম। ঘরে বসে মুঠোফোন ও ইন্টারনেটনির্ভর বিনোদনের সহজলভ্যতায় এই সংস্কৃতি অনেকটাই ম্লান। তবে রুচিশীল চলচ্চিত্র প্রদর্শন, পারিবারিক পরিবেশ এবং আধুনিক মাল্টিপ্লেক্স সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে দর্শককে ফের বড় পর্দামুখী করার সুযোগ এখনও ফুরিয়ে যায়নি।
নাট্যচর্চা: শতবর্ষের মঞ্চ ও লড়াই
গাইবান্ধার সাংস্কৃতিক অহংকার এর শতাব্দীপ্রাচীন নাট্যচর্চা। শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর শহরের পুরাতন বাজার এলাকায় ঘাঘট নদীর তীরে সোয়া এক একর জমিতে গড়ে ওঠে ‘জর্জ করোনেশন ক্লাব’। বসন্ত কুমার মুখার্জি, হেরম্বনাথ মল্লিক, কিশোরীবল্লভ চৌধুরী ও আহম্মদ উদ্দিন তালুকদারসহ একদল সংস্কৃতিপ্রাণ মানুষের উদ্যোগে এবং স্থানীয় জমিদারের পৃষ্ঠপোষকতায় এর যাত্রা শুরু। ১৯১৪ সালে সংগঠনটির নাম হয় ‘গাইবান্ধা নাট্য সংস্থা’ এবং ২০০৮ সালে তা রূপ নেয় বর্তমান ‘গাইবান্ধা নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংস্থা’য়। শতবর্ষ পেরিয়েও সংগঠনটি নাটক, আবৃত্তি ও সংগীতের মশাল জ্বালিয়ে রেখেছে।
পাশাপাশি জেলা শিল্পকলা একাডেমিও নাট্যোৎসব, সাংস্কৃতিক মেলা, সংগীত-নৃত্য প্রশিক্ষণ এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পধারাকে বেগবান রাখছে। পারিবারিক সংকট, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক বৈষম্য কিংবা মানুষের স্বপ্নকে মঞ্চে জীবন্ত রূপ দেয় নাটক। তবে নিয়মিত মহড়ার উপযুক্ত পরিবেশ, আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং নতুন দর্শক তৈরির সংকট কাটাতে না পারলে এই গৌরবময় ঐতিহ্য ধরে রাখা কঠিন হবে।
সাহিত্য ও প্রকাশনা: মাটির গভীর থেকে আসা সুর
তুলসী লাহিড়ী, বেণোয়ারীলাল গোস্বামী কিংবা দৌলতুন্নেছা খাতুনের মতো বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বদের স্মৃতিধন্য গাইবান্ধার সাহিত্য অঙ্গন। জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও স্থানীয় বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন গান, নৃত্য, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে যুক্ত রাখছে। বর্তমান ডিজিটাল মাধ্যমে লেখালেখির প্রচার বাড়লেও তা বই, পাঠচক্র, সাহিত্য আড্ডা কিংবা লাইব্রেরির বিকল্প হতে পারে না। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক পাঠচর্চাই একটি জনপদের মনন ও আত্মাকে টিকিয়ে রাখে।
যাত্রাপালা ও লোকনাট্য: শেকড়ের শিল্পে টান
একসময় গ্রামবাংলার শীতের রাত মুখর থাকত যাত্রাপালায়। নীতিশিক্ষা, সমাজবাস্তবতা ও লোকগাথার মিশ্রণে যাত্রা ছিল গণমানুষের প্রধান বিনোদন। আধুনিক প্রযুক্তির আগ্রাসনে যাত্রাশিল্প আজ কোণঠাসা। তবে জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে নতুন পাণ্ডুলিপি রচনা ও মঞ্চায়ন প্রমাণ করে—সময়ের উপযোগী বিষয়বস্তু ও আধুনিক পরিবেশনা পেলে ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা এখনও নতুন প্রজন্মকে মুগ্ধ করতে সক্ষম।
ক্রীড়াঙ্গন: মাঠের লড়াই ও সম্ভাবনা
গাইবান্ধার ক্রীড়া কাঠামোর ভিত্তিও বেশ পুরোনো। ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত গাইবান্ধা মহকুমা ক্রীড়া সংস্থা ১৯৮৪ সালে জেলা ক্রীড়া সংস্থায় রূপ নেয়। জেলা সদরের শাহ আব্দুল হামিদ স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন গ্রামীণ মাঠ আজও তরুণদের ঘাম ঝরানোর জায়গা। তবে দিন দিন মাঠ কমে যাওয়া, নিয়মিত টুর্নামেন্টের অভাব এবং প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় হারিয়ে যাচ্ছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে খেলার মাঠ দখলমুক্ত রাখা এবং নিয়মিত বয়স ভিত্তিক লিগ চালু করা এখন সময়ের দাবি।
নদী ও পর্যটনের উন্মুক্ত দিগন্ত
বিনোদন কেবল চার দেয়াল বা নির্দিষ্ট পার্কে আটকে নেই; গাইবান্ধার রয়েছে সুবিশাল প্রাকৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ক্যানভাস। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের বালাসী ঘাট, গোবিন্দগঞ্জের ঐতিহাসিক বর্ধনকুঠি জমিদারবাড়ি এবং বিশ্বখ্যাত স্থাপত্যকর্ম ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার প্রকৃতি ও নান্দনিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এছাড়া পলাশবাড়ীর ড্রিমল্যান্ড এডুকেশনাল পার্ক কিংবা কলেজ রোডের এসকেএস ইন—যেখানে সুইমিংপুল, বোটিং ও ইনডোর গেমসের সুযোগ রয়েছে—পারিবারিক ভ্রমণের ক্ষেত্র বাড়িয়েছে।
সংকট ও রূপান্তরের বাস্তবতা
সমস্যার তালিকাও ছোট নয়। জেলায় পরিকল্পিত ও নিরাপদ আধুনিক পার্কের অভাব প্রকট। শিশু-কিশোরদের জন্য খেলার উন্মুক্ত জায়গা দিন দিন কমছে। অন্যদিকে স্ক্রিননির্ভর একাকী বিনোদন পারিবারিক যোগাযোগ ও সামাজিক সংহতিকে সংকুচিত করে ফেলছে। বিনোদন যখন শরীর ও মনের সুস্থ বিকাশের বদলে কেবল নিস্ক্রিয় সময় কাটানোর মাধ্যম হয়, তখন সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
আগামীর পথরেখা: ঐতিহ্য রক্ষা ও টেকসই পরিকল্পনা
পরিকল্পিত বিনোদন ব্যবস্থা স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা করতে পারে। উন্নত পার্ক, পর্যটন স্পট এবং নদীকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড বাড়লে পরিবহন, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় হস্তশিল্প ও কুটির শিল্পের বড় বাজার তৈরি হয়। গাইবান্ধা জেলা ব্র্যান্ডিং পরিকল্পনায় চর ও নদীতীরে পরিবেশবান্ধব পর্যটন স্পট, নদী-সংস্কৃতি কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং নিয়মিত ‘ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক মাস’ উদযাপনের যে রূপরেখা রয়েছে, তার দ্রুত বাস্তবায়ন দরকার।
গাইবান্ধার বিনোদনের মূল শক্তি কোনো ইট-পাথরের দালান নয়; বরং শত বছর আগে ঘাঘটের পাড়ে প্রোথিত নাট্যমঞ্চের সেই খুঁটি, যা আজও শিল্পপিপাসুদের প্রেরণা জোগায়। পুরোনো সিনেমা হলের নিয়ন আলো নিভে যেতে পারে, কমে যেতে পারে শীতের যাত্রার আসর—কিন্তু যে উদারতায় একদিন জমিদার গোবিন্দলাল রায় সাধারণ মানুষের জন্য জমি লিখে দিয়েছিলেন, সেই দায়বদ্ধতার আধুনিক রূপ এখন প্রয়োজন।
একটি প্রাণবন্ত গাইবান্ধা মানেই এমন এক জনপদ—যেখানে শিশুর হাতে প্রযুক্তির পাশাপাশি থাকবে মাঠের ধুলো ও বইয়ের ঘ্রাণ, তরুণের চোখে থাকবে মঞ্চের আলো, আর সন্ধ্যার বাতাসে অনুরণিত হবে গান ও কবিতার সুর। এর জন্য চাই সঠিক পরিকল্পনা, সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং আন্তরিক নাগরিক উদ্যোগ।

Reporter Name 
























