Dhaka ০৩:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
এ কেমন অমানুষের দেশ!’: শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে কাঠগড়ায় সমাজ ও রাষ্ট্র! উন্নত প্রযুক্তির নামে গ্রাহকের পকেট কাটছে বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার ১৮ কোটি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্যই এই লংমার্চ: পলাশবাড়ীতে ডা. শফিকুর রহমান  ট্রাক-অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে সওজ প্রকৌশলী নিহত গোবিন্দগঞ্জে দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভবন উদ্বোধন করলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়নে ফ্রেন্ডশিপের উদ্যোগে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সাদুল্লাপুর শিক্ষক-কর্মচারী ক্রেডিট ইউনিয়নের নির্বাচনে হারুন চেয়ারম্যান, শহিদুল সেক্রেটারি নির্বাচিত রৌমারীতে দেড় লাখ টাকাসহ ১৪ জুয়াড়ি গ্রেপ্তার অবৈধভাবে রাসায়নিক সার বিক্রির দায়ে ব্যবসায়ীকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপলক্ষে বিএনপির মতবিনিময় সভা

এ কেমন অমানুষের দেশ!’: শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে কাঠগড়ায় সমাজ ও রাষ্ট্র!

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:৩২:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২৩ Time View

আফতাব হোসেন:

মায়ের কাছ থেকে আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল ১৩ বছরের অপ্রতিম। যে বয়সে একটি শিশুর জগৎজুড়ে থাকার কথা স্কুল, খেলাধুলা আর সোনালি স্বপ্ন—সেই বয়সেই শুক্রবার বিকেলে ঘর থেকে বেরিয়ে আর ফেরেনি সে। পরদিন শনিবার কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় তার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ; খোঁজ মেলেনি সঙ্গে থাকা ফোনটিরও।

নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও লেখক নাহিদা নাহিদের একমাত্র সন্তান। নিখোঁজের পর সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়েছিলেন মা। তবে পরদিন মরদেহ উদ্ধারের খবরে সেই আর্তি রূপ নিয়েছে তীব্র জাতীয় ক্ষোভে।

পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে তদন্ত চলছে এবং সন্দেহভাজন কয়েকজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এদিকে অপ্রতিমের এমন নৃশংস মৃত্যু নাড়া দিয়েছে সারা দেশকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কবি, লেখক, শিক্ষক, অধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন।

লেখক তুহিন ওয়াদুদ ফেসবুকে লিখেছেন, “গতকাল মধ্যরাতে অপ্রতিম নামের যে ছেলেটির খোঁজ চেয়ে পোস্ট শেয়ার করেছিলাম, আজ তার মরদেহ উদ্ধার করা হলো। নিখোঁজের খবরে ঘুম আসছিল না, আর মৃত্যুর খবরে চোখ ভিজে উঠছে। আমি কোনোভাবেই এই খবর মানতে পারছি না।”

উন্নয়ন গবেষক ও গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস্‌ সালাম গভীর শোক প্রকাশ করে জানান, “আমি স্তব্ধ, হতবাক! মাত্র ১৩ বছরের একটি শিশুর এমন করুণ পরিণতি ভাবতেই বুক ভেঙে যায়। একজন মায়ের কাছে এর চেয়ে বড় শোক আর কী হতে পারে! অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক।”

তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন লিখেছেন, “এ কোন অমানুষের দেশ! এ কেমন বর্বর, হিংস্র, নৃশংস নরপিশাচের দেশ!” অন্যদিকে লেখক শামস সাঈদের প্রশ্ন, “এই মৃত্যুর দায় আপনি কাকে দেবেন? সমাজ, রাষ্ট্র, নাকি পরিবারকে?”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, শিশুর ওপর সহিংসতা কেবল পারিবারিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি সামাজিক অবক্ষয়, মাদক, দারিদ্র্য ও আইনের দুর্বল প্রয়োগের মতো কাঠামোগত সংকটের সম্মিলিত ফল। ফলে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টি কেবল পরিবারের একার নয়, সমষ্টিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।

সাম্প্রতিক এক তথ্যে জানা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই দেশে প্রায় ১৫ হাজার শিশুর নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডি হয়েছে। সমন্বিত ও কার্যকর জাতীয় ডেটাবেসের অভাবে নিখোঁজদের কতজন উদ্ধার হয়েছে বা কতজন অপরাধের শিকার হয়েছে, তার স্পষ্ট হিসাব মেলে না। এই পরিসংখ্যান নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে সামগ্রিক নজরদারি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।

সামাজিক মাধ্যমের এই প্রতিবাদ শেষ পর্যন্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। অতীতেও এমন বহু নির্মম ঘটনা সাময়িক ক্ষোভের পর নতুন সংবাদের আড়ালে হারিয়ে গেছে। অপ্রতিমের ঘটনা যেন সেই বৃত্তে বন্দি না হয়; একে অর্থবহ করতে হলে প্রয়োজন জবাবদিহিতা ও কাঠামোগত সংস্কার। বিশেষ করে নিখোঁজের প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুলিশের তৎপরতা, দ্রুত উদ্ধার কৌশল এবং প্রযুক্তিগত নজরদারি জোরদার করা জরুরি।

অপ্রতিমের মা নাহিদা নাহিদ আজ কেবল একজন শিক্ষক বা লেখক নন, তিনি সন্তানহারা এক মা। এই শূন্যতা কোনো সান্ত্বনা বা বিচারের বিনিময়ে পূরণ হওয়ার নয়। তবে এই ট্র্যাজেডি যেন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে না যায়। আর কোনো মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না হয়, সেজন্য এখনই রাষ্ট্র ও সমাজকে শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায় নিতে হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

এ কেমন অমানুষের দেশ!’: শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে কাঠগড়ায় সমাজ ও রাষ্ট্র!

এ কেমন অমানুষের দেশ!’: শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে কাঠগড়ায় সমাজ ও রাষ্ট্র!

Update Time : ০২:৩২:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আফতাব হোসেন:

মায়ের কাছ থেকে আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল ১৩ বছরের অপ্রতিম। যে বয়সে একটি শিশুর জগৎজুড়ে থাকার কথা স্কুল, খেলাধুলা আর সোনালি স্বপ্ন—সেই বয়সেই শুক্রবার বিকেলে ঘর থেকে বেরিয়ে আর ফেরেনি সে। পরদিন শনিবার কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় তার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ; খোঁজ মেলেনি সঙ্গে থাকা ফোনটিরও।

নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও লেখক নাহিদা নাহিদের একমাত্র সন্তান। নিখোঁজের পর সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়েছিলেন মা। তবে পরদিন মরদেহ উদ্ধারের খবরে সেই আর্তি রূপ নিয়েছে তীব্র জাতীয় ক্ষোভে।

পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে তদন্ত চলছে এবং সন্দেহভাজন কয়েকজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এদিকে অপ্রতিমের এমন নৃশংস মৃত্যু নাড়া দিয়েছে সারা দেশকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কবি, লেখক, শিক্ষক, অধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন।

লেখক তুহিন ওয়াদুদ ফেসবুকে লিখেছেন, “গতকাল মধ্যরাতে অপ্রতিম নামের যে ছেলেটির খোঁজ চেয়ে পোস্ট শেয়ার করেছিলাম, আজ তার মরদেহ উদ্ধার করা হলো। নিখোঁজের খবরে ঘুম আসছিল না, আর মৃত্যুর খবরে চোখ ভিজে উঠছে। আমি কোনোভাবেই এই খবর মানতে পারছি না।”

উন্নয়ন গবেষক ও গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস্‌ সালাম গভীর শোক প্রকাশ করে জানান, “আমি স্তব্ধ, হতবাক! মাত্র ১৩ বছরের একটি শিশুর এমন করুণ পরিণতি ভাবতেই বুক ভেঙে যায়। একজন মায়ের কাছে এর চেয়ে বড় শোক আর কী হতে পারে! অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক।”

তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন লিখেছেন, “এ কোন অমানুষের দেশ! এ কেমন বর্বর, হিংস্র, নৃশংস নরপিশাচের দেশ!” অন্যদিকে লেখক শামস সাঈদের প্রশ্ন, “এই মৃত্যুর দায় আপনি কাকে দেবেন? সমাজ, রাষ্ট্র, নাকি পরিবারকে?”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, শিশুর ওপর সহিংসতা কেবল পারিবারিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি সামাজিক অবক্ষয়, মাদক, দারিদ্র্য ও আইনের দুর্বল প্রয়োগের মতো কাঠামোগত সংকটের সম্মিলিত ফল। ফলে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টি কেবল পরিবারের একার নয়, সমষ্টিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।

সাম্প্রতিক এক তথ্যে জানা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই দেশে প্রায় ১৫ হাজার শিশুর নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডি হয়েছে। সমন্বিত ও কার্যকর জাতীয় ডেটাবেসের অভাবে নিখোঁজদের কতজন উদ্ধার হয়েছে বা কতজন অপরাধের শিকার হয়েছে, তার স্পষ্ট হিসাব মেলে না। এই পরিসংখ্যান নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে সামগ্রিক নজরদারি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।

সামাজিক মাধ্যমের এই প্রতিবাদ শেষ পর্যন্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। অতীতেও এমন বহু নির্মম ঘটনা সাময়িক ক্ষোভের পর নতুন সংবাদের আড়ালে হারিয়ে গেছে। অপ্রতিমের ঘটনা যেন সেই বৃত্তে বন্দি না হয়; একে অর্থবহ করতে হলে প্রয়োজন জবাবদিহিতা ও কাঠামোগত সংস্কার। বিশেষ করে নিখোঁজের প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুলিশের তৎপরতা, দ্রুত উদ্ধার কৌশল এবং প্রযুক্তিগত নজরদারি জোরদার করা জরুরি।

অপ্রতিমের মা নাহিদা নাহিদ আজ কেবল একজন শিক্ষক বা লেখক নন, তিনি সন্তানহারা এক মা। এই শূন্যতা কোনো সান্ত্বনা বা বিচারের বিনিময়ে পূরণ হওয়ার নয়। তবে এই ট্র্যাজেডি যেন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে না যায়। আর কোনো মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না হয়, সেজন্য এখনই রাষ্ট্র ও সমাজকে শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায় নিতে হবে।