
কায়সার রহমান রোমেল
একটি পত্রিকার বয়স শুধু বছরের হিসাবে মাপা যায় না। কতজন পাঠক তাকে নিজের মনে করেছেন, কতবার সে সত্য বলতে গিয়ে চাপে পড়েছে, কতবার ভুল করে শুধরে নিয়েছে, এসবই তার প্রকৃত বয়স। দৈনিক আজকের জনগণ: বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার অঙ্গীকার নিয়ে ২০০৩ সালে গাইবান্ধা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। সেই অঙ্গীকারের তেইশ বছর পূর্ণ করে পত্রিকাটি এবার চব্বিশ বর্ষে পা রাখছে। এ উপলক্ষ্যে পেছনে তাকানোর, হিসাব মেলানোর এবং নতুন প্রত্যয়ে সামনের পথ নিয়ে ভাবার সুযোগ এসেছে।
অঙ্গীকারের যাত্রা
উত্তরের এই জনপদে একটি স্থানীয় দৈনিক টিকিয়ে রাখা সহজ কাজ নয়। বিজ্ঞাপননির্ভর অর্থনীতি, সীমিত বাজার, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, রাজনৈতিক চাপ, কোনোটিই স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের জন্য সহজ নয়। এসবের মধ্যেও আজকের জনগণ মুদ্রিত পত্রিকা হিসেবে প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে। তেইশ বছর ধরে ছাপার অক্ষরে নিয়মিত বের হওয়াটাই একটি প্রাপ্তি।
শুরু থেকেই পত্রিকাটি গাইবান্ধা ও উত্তরাঞ্চলের মানুষের কথা, সমস্যা, সম্ভাবনা ও প্রত্যাশাকে সংবাদের কেন্দ্রে রাখার চেষ্টা করেছে। এই অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ লেখা, প্রকৃতি, জীবন ও কৃষিবিষয়ক ফিচার এবং বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন ছেপে সে পাঠকের প্রশংসা কুড়িয়েছে। যে অঞ্চলের অর্থনীতি ও জীবন কৃষির সঙ্গে এত গভীরভাবে জড়িত, সেখানে কৃষি ও প্রকৃতি নিয়ে লেখার গুরুত্ব বলে শেষ করা যায় না।
তেইশ বছরের প্রাপ্তি
সরকারি হিসাবে আজকের জনগণ হয়ত এখনো জেলার সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকের আসনে পৌঁছাতে পারেনি। কথাটা অকপটে স্বীকার করাই ভালো। তবু প্রচার সংখ্যাই একমাত্র মাপকাঠি নয়। যখন দেখি একজন মুচি কিংবা রিকশাচালক পত্রিকাটি হাতে নিয়ে পড়ছেন, তখন মনে হয় এটি সত্যিই গণমানুষের পত্রিকা হয়ে উঠেছে। সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড়ো সার্থকতা সেখানেই, যেখানে সাধারণ মানুষ নিজের কথা খুঁজে পান।
এ অর্জন কোনো একজন ব্যক্তির নয়। পরিচালনা পর্ষদ, সংবাদকর্মী, লেখক, মুদ্রণকর্মী, হকার, বিজ্ঞাপনদাতা আর অগণিত পাঠকের নীরব পরিশ্রমে তেইশ বছরের এই পথ তৈরি হয়েছে। গাইবান্ধার মানুষের হৃদয়ে পত্রিকাটি যে জায়গা করে নিয়েছে, তার পেছনে এই সম্মিলিত নিষ্ঠা আছে।
অঙ্গীকারের পরীক্ষা : সমালোচনার জায়গাও আছে
এই দীর্ঘ যাত্রা মসৃণ ছিল না। আলোচনা-সমালোচনা, বিতর্ক, ভুল-শুদ্ধ, নানা চ্যালেঞ্জ সবকিছুই সঙ্গী করে পত্রিকাটি এগিয়েছে। এই সমালোচনাকে আমি দুর্বলতার চিহ্ন মনে করি না। যে পত্রিকা নিয়ে মানুষ কথা বলে, তর্ক করে, ভুল ধরে, তার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও সজীব। আসল প্রশ্ন হলো, সমালোচনা থেকে শেখা হচ্ছে কিনা।
স্থানীয় সাংবাদিকতার কিছু পুরোনো সংকট এখানেও প্রাসঙ্গিক। সংবাদকর্মীদের পেশাগত প্রশিক্ষণ ও ন্যায্য সম্মানী, তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি, ক্ষমতাবান মহলের সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্ব রক্ষা, বিজ্ঞাপনদাতার প্রভাব থেকে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা বাঁচিয়ে রাখা, এগুলো প্রতিদিনের লড়াই। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার অঙ্গীকার মুখে বলা সহজ, কিন্তু প্রতিটি সংবাদ, প্রতিটি শিরোনামে তা রক্ষা করাই আসল পরীক্ষা। এসব ক্ষেত্রে নিজেদের দিকে আরও কঠোরভাবে তাকানোর সুযোগ সব সময়ই থাকে।
গণমাধ্যম : সমাজের দর্পণ, গণতন্ত্রের প্রহরী
গণমাধ্যম আধুনিক সমাজের দর্পণ এবং গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও সুস্থ বিনোদন দেওয়ার পাশাপাশি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও সম্ভাবনা তুলে ধরাও তার দায়িত্ব। তবে অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতা সমান জরুরি। স্বাধীনতা মানে যা খুশি লেখার অধিকার নয়। স্বাধীনতা মানে সত্য বলার সাহস এবং সেই সত্যের দায় নেওয়ার সক্ষমতা। জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম সবার জন্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ। যে মাধ্যম যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়, তার দায়ও তত বেশি।
বদলে যাওয়া সময়, নতুন দায়
এখন গণমাধ্যমের পরিসর বহুমাত্রিক। মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর মতো আজকের জনগণও ছাপা ও সম্প্রচারের পাশাপাশি অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও সক্রিয়। তথ্য পাওয়া ও বিনোদনের সুযোগ আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে গুজব, বিভ্রান্তি ও অর্ধসত্যের ঝুঁকিও বেড়েছে।
এই বাস্তবতায় আজকের জনগণের কাছে আমার বিনীত আহ্বান, ছাপা কাগজ হোক বা অনলাইন, ফেসবুক পেজ হোক বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যম, সংবাদ ও তথ্য প্রচারে সর্বত্র একই মান, একই যাচাই-বাছাই এবং একই দায়িত্ববোধ বজায় রাখতে হবে। প্রতিযোগিতার তাড়ায় আগে প্রকাশের চেয়ে সঠিকভাবে প্রকাশ করাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রত্যয়ের চব্বিশ : যা প্রত্যাশা করি
নতুন বছরে পত্রিকাটির কাছে আমার প্রত্যাশা কয়েকটি।
প্রথমত, সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতাকে সবকিছুর ওপরে রাখা। সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের কথা নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা এবং সব অন্যায়-নিপীড়নের প্রতিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
দ্বিতীয়ত, উন্নয়নের সহযোগী হওয়া। গাইবান্ধার মানুষের কল্যাণে কাজ করার পাশাপাশি সচেতনতামূলক লেখা ও প্রতিবেদনে আরও জোর দেওয়া। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, নদীভাঙন, বন্যা, জলবায়ু ও নারীর অধিকারের মতো বিষয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধান ও সচেতনতার কাজ দরকার।
তৃতীয়ত, এ অঞ্চলের মানুষের জন্য কল্যাণকর সংবাদ যথাযথ সময়ে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
চতুর্থত, স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির চর্চাকে আরও প্রসারিত করা, যাতে নতুন প্রজন্ম নিজের শেকড়কে চিনতে পারে।
পঞ্চমত, ছাপা, অনলাইন ও ডিজিটাল মাধ্যমে সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে গণমানুষের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা এবং রাষ্ট্রের সহযোগী শক্তি হিসেবে দেশের কল্যাণে ভূমিকা রাখা।
শেষ কথা
ব্যক্তিগতভাবে আমি তেইশ বছর ধরে এই পত্রিকার আশপাশে আছি, কখনো পাঠক হিসেবে, কখনো শুভানুধ্যায়ী হিসেবে। যখন কাছাকাছি এসেছিলাম, তখন বয়সে তরুণ ছিলাম। সময়ের সঙ্গে বয়স বেড়েছে, অভিজ্ঞতাও। আজ পরিণত বয়সে এসে মনে হয়, আজকের জনগণের কাছ থেকে যা শিখেছি, যা জেনেছি, তার জন্য কৃতজ্ঞতা ও ঋণ স্বীকার করা আমার কর্তব্য।
চব্বিশ বর্ষে পদার্পণের এই বিশেষ মুহূর্তে দৈনিক আজকের জনগণের পরিচালনা পর্ষদ, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও পাঠকদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা। সত্য, সুন্দর ও মানবিক মূল্যবোধকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে মানুষের মহত্ত্বের সম্ভাবনা বিকাশে পত্রিকাটির প্রয়াস অব্যাহত থাকুক। দৈনিক আজকের জনগণ; বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার অঙ্গীকার নিয়ে সামনের পথ হোক আরও সমৃদ্ধ ও গৌরবময়।
কায়সার রহমান রোমেল, লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী

Reporter Name 


















