Dhaka ০৯:৪৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমার বড় অর্জন চিলমারী-রৌমারী নৌ-পথে নাব্যতা ফিরলেও মিলছে না ফেরি জনপ্রিয়তা সত্যের মানদণ্ড নয়: পছন্দ, আবেগ ও বিশ্বাসের প্রকাশ মাত্র  হানিট্র্যাপে ফেলে শিক্ষককে জিম্মি, নারীসহ গ্রেপ্তার ৪ সাঘাটায় বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত নওগাঁয় হানিট্র্যাপে শিক্ষককে জিম্মি: নারীসহ গ্রেপ্তার ৪ লং মার্চ নির্যাতিত মানুষের পক্ষে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ : মাওলানা আবদুল হালিম গোবিন্দগঞ্জে ৩২ বছর আগের হত্যাকাণ্ড: পরকীয়া ঢাকতে স্বামীকে বিষ খাইয়ে হত্যার অভিযোগে থানায় এজাহার দলবাজি নয়, বালাসীঘাটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ করতে হবে: ওয়ার্কাস পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক রাজধানীর মহাখালী রেলগেট এলাকায় ৭ তলা ভবনে অগ্নিকাণ্ড

নারীর নকশায় পরিবার, সমাজ এগিয়ে চললেও রাষ্ট্রের নকশায় নারী কেন পিছিয়ে?

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৪:০১:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ মার্চ ২০২৫
  • ৩৪৭ Time View
রিকতু প্রসাদ:
প্রতি বছরের মতো এবারো শিমুল-পলাশ রাঙা বসন্তে হাজির হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ঋতুরাজ বসন্তে নানা রঙের ফুল যেমন প্রকৃতিতে পূর্ণতা আনে, নব পল্লবে-নবজাগরনে যেমন অহঙ্কারী হয় বসন্ত তেমনি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র আর অর্থীনীতিতে যাদের শ্রম-ঘামে সারা বছর বসন্তের বাতাস বয়ে যায় সেই নারীদের জীবনে কি বসন্ত আসে কখনো?
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি- নারীর প্রশ্নে প্রায় সব সূচকই যে নিম্নমুখী, তা প্রতিবার ৮ মার্চে পত্রিকার শিরোনামে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। বিশেষ দিনটিতে নারীর জন্য বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ হয় বটে, নারীন প্রতি ভালোবাসার বহি:প্রকাশে শ্রুতিমধুর শব্দের গাঁথুনী পত্রিকার পাতাতেই যে সীমাবদ্ধ থাকে, সমাজের বাঁকে বাঁকে ঠোকর খেয়ে বেড়ে ওঠা নারীদের প্রতি লাঞ্ছনা, বঞ্চণার করুণ চিত্রই তার উজ্জল উদাহরণ।
দুঃখজনক হলেও   সত্য যে, ২০১০ সালে নারী দিবস ঘোষণার  শতবর্ষ পার হলেও এখনো দেহ ও মনে পূর্ণ স্বাধীনতা উপভোগ করার সুযোগ ও ন্যায় বিচারের নিশ্চয়তা বিশ্বের বেশিরভাগ নারীর জীবনেই নেই। বিশ্বের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী আজও বৈষম্যের দায় বহন করে চলছে। জন্ম প্রাক্কালে ভ্রুণহত্যা হতে শুরু করে বাল্যবিবাহ, পাচার, যৌন নিপীড়ন, যৌতুকের কারণে অত্যাচার, আইনের সেবা, শিক্ষা,   স্বাস্থ্য সেবা, অনায়াসে চলাচল, ন্যায্য মজুরি, প্রজনন অধিকার সবটাতেই বৈষম্য ও বঞ্চনা নারীর জীবনে নিত্যকার ঘটনা, কিন্তু ঘটনাগুলো বিছিন্ন নয়, সভ্যতার এগিয়ে যাওয়ার পথে, নারীর বিকাশের পথে অসংখ্য বাধা, পথ চলতে বিড়ম্বনা, সমান কাজ করেও সমান মজুরি না পাওয়ার যন্ত্রণা নারীকে আজো কুড়ে কুড়ে খায়। একজন  নারী প্রতিনিয়ত সংসারের কাজে অংশগ্রহণ করে কিন্তু তার কাজের স্বীকৃতি নেই, কাজের মর্যাদা নেই, পারিশ্রমিক নেই উপরন্তু এ সকল কাজকে তাচ্ছিল্য করা হয়। স্বীকৃতিহীন, মর্যাদাহীন, পারিশ্রমিকহীন কাজের নাম গৃহস্থালি বেতনভুক্ত গৃহকর্মীর কাজের আর্থিকমূল্য বিবেচিত হয় কিন্তু গৃহকর্মের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ হয় না।
সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত। যাদের নকশায় স্থান পায় পরিবার, সমাজ। ঘর-গৃহস্থালী থেকে কৃষি- সর্বত্র- যাদের হাতের স্পর্শে মজবুত হয় অর্থনীতি। সেই নারীদের অধিকারের নকশাটা আজো অসম্পুর্ন। পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র কোথাও মুল্যায়িত হয় না নারীদের ঘামের ফোটা। উদয়াস্ত শ্রম বিলিয়ে দেয়া মা-বোনদের গল্প গিলে খায় পুরুষতান্ত্রিক পূঁজিবাদী এই সমাজ।
এবার একটু পরিসংখ্যানের দিকে নজড় দেয়া যাক, বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রাণী সম্পদ খাতে নারীর অংশগ্রহণ ৮৮ দশমিক ২ ও পুরুষের মাত্র ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও এ খাতে মালিকানায় বেশ পিছিয়ে নারীরা। যার ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ মালিকানা পুরুষের হাতে। ছোট গবাদি পশুর ক্ষেত্রেও পুরুষের মালিকানা ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে হাঁস-মুরগির ক্ষেত্রে নারীর মালিকানা ৮৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
অন্যদিকে কৃষি খাতেও বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আন্তর্জাতিক কৃষিব্যবস্থায় নারীর ভূমিকা নিয়ে ‘স্ট্যাটাস অব উইমেন ইন অ্যাগ্রিকালচার সিস্টেম-২০২৩’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের কৃষিতে ২০০৫ সালে নারীর ভূমিকা ছিল ৩৬ দশমিক দুই শতাংশ। ২০১৯ সালে তা ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়ায়। কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির হারের দিক থেকে বিশ্বে যা সর্বোচ্চ। কিন্তু এখনো মজুরী বৈষম্য অক্টোপাসের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে নারীদের।
অন্যদিকে দেশের কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে এখনো দৃশ্যমান করা হয়নি নারীর শ্রম। কৃষিতে ঘাম ঝড়ালেও জাতীয় অর্থনীতিতে গণনার বাইরে থাকায় অবমূল্যায়িতই থাকছে তাদের শ্রম। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত যাদের বিনিয়োগকৃত শ্রমে মজবুত হয় দেশের অর্থনীতি অধিকারের প্রশ্নে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হয় তাদের অপেক্ষার প্রহর।
সমকাজে সমমজুরি নেই, পিতা-মাতার  সম্পত্তিতে সমান অধিকার নেই, অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে যুক্ত বিশাল নারী সমাজের মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা নেই, নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই। অথচ মানব সভ্যতার শুরু থেকে সব কাজেই নারীর সমান অংশ গ্রহন ছিল। নারী জীবনের এ এক নির্মমতা যে নারী অধিকারের, নারী স্বাধীনতার ইস্যুটি প্রান্তিক ইস্যুই থেকে গেল, অনেকে নারী অধিকারের বিষয়টি ব্যক্তিগত বিষয় হিসাবে বিবেচনা করলেও আদতে নারীমুক্তির ইস্যুটি শুধুমাত্র বিশেষ গোষ্ঠীর ( নারী সমাজের) নয় এটি মানব সমাজের সকলের ইস্যু। আমাদের দেশে এমন কোন নারী খুঁজে পাওয়া যাবে কি যে জীবনে কোনদিন নিপীড়িত হওয়ার ভয় পায়নি? কন্যার শিশু বেলা হতে প্রৌঢ়কাল অবধি কোন না কোন সময় সামান্য “পদ শব্দেই”  চমকে উঠেছে কি এক আশঙ্কায়। যেকোনো  সময় আমার এই শরীরটা আক্রমণের শিকার হতে পারে এই ভীতি বা শঙ্কায় নারীর জীবনের স্বাধীনতা অর্জনের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। গৃহে, বিদ্যালয়ে, পথে- ঘাটে কোথাও নারী নিরাপদ নয়। অত্যাচার, দুর্ঘটনা, হত্যা, আগ্রাসন, সন্ত্রাসী আক্রমণ আমাদের সমাজে নারীদের জীবনে যেন নির্মম বাস্তবতা।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের যে গ্রহণযোগ্যতা আজ কম-বেশি দেশে দেশে মান্যতা পেয়েছে, তার ইতিহাস একদিনের নয়। মানব সভ্যতার শুরু থেকেই নারীর ওপর পুরুষের সহিংস আধিপত্য হাজার হাজার বছরের। কত নারীর কত কোটি যন্ত্রণা ও বেদনার ইতিহাস অলিখিত, অশ্রুত রয়ে গেছে। সেই সাথে কত নারীর প্রতিবাদ-  ক্ষোভ- লড়াইয়ের কাহিনীও  অজানাই রয়ে গেছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এই দিবস পালনের মধ্যে যতটা বাগাড়ম্বর দেখা যায়, ততটা যুক্তিবাদী মুক্তচিন্তা অনেকের মধ্যেই বাস্তবে নেই। অন্তরে অন্তরে আমরা অসামাজিক পশ্চাৎপদ মানসিকতা লালন ও ধারণ করি বেশি । শুধু আমাদের দেশেই নয় বিশ্বের দেশে দেশে নারীর মানবাধিকার নানাভাবে লঙ্ঘনের ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে।  বিশ্ব বাজার ব্যবস্থায় চেতনে বা অবচেতনে নারী অনেক ক্ষেত্রেই পণ্যে পরিণত হচ্ছে। নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপনে নারীর অংশ গ্রহন দেখে কেউ কেউ বেশ উৎফুল্ল হয়, এর আড়ালে নারীর মুখশ্রী খানা যে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করে ব্যাবসা-বাণিজ্য প্রসারের বড় কোন কৌশল আছে সেদিকটা কি ভেবে দেখেছি কখনো? সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের চিন্তা – চেতনা আর কর্পোরেট দুনিয়ায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মাঝে নারীর মানবাধিকার আদায়ের প্রশ্নটা ক্রমশ দ্বন্দ্ব – সংকুল হয়ে উঠছে। ক্ষেত্রবিশেষে শিশুর হাতে লজেন্স দিয়ে ভুলিয়ে রাখার মতোই নারীর সামনে অসংখ্য অগ্রগতির ছবি তুলে ধরা হচ্ছে।বাস্তবে সমতার প্রশ্নে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। সেইসাথে পাল্লা দিয়ে অধিকাংশ দেশেই বাড়ছে ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তি। সেখানেও নারীসমাজকে চেতনে – অবচেতনে অন্ধকারকেই পরম বাতিঘর হিসেবে মনে করতে বাধ্য করা হচ্ছে। সমাজ সভ্যতা অনেক এগিয়েছে সেই এগোনোর পথেই যেন নারীরা পিছিয়েছে। অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন নারীর সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষিত নারীর সংখ্যা তেমন বাড়েনি। ফলে  এখনো  পুরুষদের অঙ্গুলিহেলনে নারীদের চলতে হয়, নিপীড়ন -নির্যাতনের শিকার হতে হয়।এজন্য নারীদেরকে শিক্ষিত, সচেতন ও প্রতিবাদী হবার পথ রুদ্ধ করার কুটকৌশল সব সময় যেমন ছিলো, এখনো তা অব্যাহত আছে। তারপরও নারী দিবসের চেতনা ধারন করে সকল বাধাঁর পাহাড় ডিঙিয়ে প্রতিবাদ- প্রতিরোধ -আন্দোলন জারি রেখে আগামীর সম্ভাবনাময় কোন এক নতুন ভোরের পথে এগিয়ে যাবে আমাদের মা-বোনেরা। বিদ্রোহী কবি নজরুলের কবিতার সেই পঙ্কতি নিশ্চয়ই বাস্তব হয়ে ধরা দেবে-
সেদিন সুদূর নয়, যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়!
-লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ গাইবান্ধা জেলা শাখা।
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমার বড় অর্জন

নারীর নকশায় পরিবার, সমাজ এগিয়ে চললেও রাষ্ট্রের নকশায় নারী কেন পিছিয়ে?

Update Time : ০৪:০১:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ মার্চ ২০২৫
রিকতু প্রসাদ:
প্রতি বছরের মতো এবারো শিমুল-পলাশ রাঙা বসন্তে হাজির হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ঋতুরাজ বসন্তে নানা রঙের ফুল যেমন প্রকৃতিতে পূর্ণতা আনে, নব পল্লবে-নবজাগরনে যেমন অহঙ্কারী হয় বসন্ত তেমনি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র আর অর্থীনীতিতে যাদের শ্রম-ঘামে সারা বছর বসন্তের বাতাস বয়ে যায় সেই নারীদের জীবনে কি বসন্ত আসে কখনো?
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি- নারীর প্রশ্নে প্রায় সব সূচকই যে নিম্নমুখী, তা প্রতিবার ৮ মার্চে পত্রিকার শিরোনামে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। বিশেষ দিনটিতে নারীর জন্য বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ হয় বটে, নারীন প্রতি ভালোবাসার বহি:প্রকাশে শ্রুতিমধুর শব্দের গাঁথুনী পত্রিকার পাতাতেই যে সীমাবদ্ধ থাকে, সমাজের বাঁকে বাঁকে ঠোকর খেয়ে বেড়ে ওঠা নারীদের প্রতি লাঞ্ছনা, বঞ্চণার করুণ চিত্রই তার উজ্জল উদাহরণ।
দুঃখজনক হলেও   সত্য যে, ২০১০ সালে নারী দিবস ঘোষণার  শতবর্ষ পার হলেও এখনো দেহ ও মনে পূর্ণ স্বাধীনতা উপভোগ করার সুযোগ ও ন্যায় বিচারের নিশ্চয়তা বিশ্বের বেশিরভাগ নারীর জীবনেই নেই। বিশ্বের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী আজও বৈষম্যের দায় বহন করে চলছে। জন্ম প্রাক্কালে ভ্রুণহত্যা হতে শুরু করে বাল্যবিবাহ, পাচার, যৌন নিপীড়ন, যৌতুকের কারণে অত্যাচার, আইনের সেবা, শিক্ষা,   স্বাস্থ্য সেবা, অনায়াসে চলাচল, ন্যায্য মজুরি, প্রজনন অধিকার সবটাতেই বৈষম্য ও বঞ্চনা নারীর জীবনে নিত্যকার ঘটনা, কিন্তু ঘটনাগুলো বিছিন্ন নয়, সভ্যতার এগিয়ে যাওয়ার পথে, নারীর বিকাশের পথে অসংখ্য বাধা, পথ চলতে বিড়ম্বনা, সমান কাজ করেও সমান মজুরি না পাওয়ার যন্ত্রণা নারীকে আজো কুড়ে কুড়ে খায়। একজন  নারী প্রতিনিয়ত সংসারের কাজে অংশগ্রহণ করে কিন্তু তার কাজের স্বীকৃতি নেই, কাজের মর্যাদা নেই, পারিশ্রমিক নেই উপরন্তু এ সকল কাজকে তাচ্ছিল্য করা হয়। স্বীকৃতিহীন, মর্যাদাহীন, পারিশ্রমিকহীন কাজের নাম গৃহস্থালি বেতনভুক্ত গৃহকর্মীর কাজের আর্থিকমূল্য বিবেচিত হয় কিন্তু গৃহকর্মের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ হয় না।
সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত। যাদের নকশায় স্থান পায় পরিবার, সমাজ। ঘর-গৃহস্থালী থেকে কৃষি- সর্বত্র- যাদের হাতের স্পর্শে মজবুত হয় অর্থনীতি। সেই নারীদের অধিকারের নকশাটা আজো অসম্পুর্ন। পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র কোথাও মুল্যায়িত হয় না নারীদের ঘামের ফোটা। উদয়াস্ত শ্রম বিলিয়ে দেয়া মা-বোনদের গল্প গিলে খায় পুরুষতান্ত্রিক পূঁজিবাদী এই সমাজ।
এবার একটু পরিসংখ্যানের দিকে নজড় দেয়া যাক, বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রাণী সম্পদ খাতে নারীর অংশগ্রহণ ৮৮ দশমিক ২ ও পুরুষের মাত্র ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও এ খাতে মালিকানায় বেশ পিছিয়ে নারীরা। যার ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ মালিকানা পুরুষের হাতে। ছোট গবাদি পশুর ক্ষেত্রেও পুরুষের মালিকানা ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে হাঁস-মুরগির ক্ষেত্রে নারীর মালিকানা ৮৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
অন্যদিকে কৃষি খাতেও বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আন্তর্জাতিক কৃষিব্যবস্থায় নারীর ভূমিকা নিয়ে ‘স্ট্যাটাস অব উইমেন ইন অ্যাগ্রিকালচার সিস্টেম-২০২৩’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের কৃষিতে ২০০৫ সালে নারীর ভূমিকা ছিল ৩৬ দশমিক দুই শতাংশ। ২০১৯ সালে তা ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়ায়। কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির হারের দিক থেকে বিশ্বে যা সর্বোচ্চ। কিন্তু এখনো মজুরী বৈষম্য অক্টোপাসের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে নারীদের।
অন্যদিকে দেশের কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে এখনো দৃশ্যমান করা হয়নি নারীর শ্রম। কৃষিতে ঘাম ঝড়ালেও জাতীয় অর্থনীতিতে গণনার বাইরে থাকায় অবমূল্যায়িতই থাকছে তাদের শ্রম। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত যাদের বিনিয়োগকৃত শ্রমে মজবুত হয় দেশের অর্থনীতি অধিকারের প্রশ্নে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হয় তাদের অপেক্ষার প্রহর।
সমকাজে সমমজুরি নেই, পিতা-মাতার  সম্পত্তিতে সমান অধিকার নেই, অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে যুক্ত বিশাল নারী সমাজের মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা নেই, নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই। অথচ মানব সভ্যতার শুরু থেকে সব কাজেই নারীর সমান অংশ গ্রহন ছিল। নারী জীবনের এ এক নির্মমতা যে নারী অধিকারের, নারী স্বাধীনতার ইস্যুটি প্রান্তিক ইস্যুই থেকে গেল, অনেকে নারী অধিকারের বিষয়টি ব্যক্তিগত বিষয় হিসাবে বিবেচনা করলেও আদতে নারীমুক্তির ইস্যুটি শুধুমাত্র বিশেষ গোষ্ঠীর ( নারী সমাজের) নয় এটি মানব সমাজের সকলের ইস্যু। আমাদের দেশে এমন কোন নারী খুঁজে পাওয়া যাবে কি যে জীবনে কোনদিন নিপীড়িত হওয়ার ভয় পায়নি? কন্যার শিশু বেলা হতে প্রৌঢ়কাল অবধি কোন না কোন সময় সামান্য “পদ শব্দেই”  চমকে উঠেছে কি এক আশঙ্কায়। যেকোনো  সময় আমার এই শরীরটা আক্রমণের শিকার হতে পারে এই ভীতি বা শঙ্কায় নারীর জীবনের স্বাধীনতা অর্জনের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। গৃহে, বিদ্যালয়ে, পথে- ঘাটে কোথাও নারী নিরাপদ নয়। অত্যাচার, দুর্ঘটনা, হত্যা, আগ্রাসন, সন্ত্রাসী আক্রমণ আমাদের সমাজে নারীদের জীবনে যেন নির্মম বাস্তবতা।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের যে গ্রহণযোগ্যতা আজ কম-বেশি দেশে দেশে মান্যতা পেয়েছে, তার ইতিহাস একদিনের নয়। মানব সভ্যতার শুরু থেকেই নারীর ওপর পুরুষের সহিংস আধিপত্য হাজার হাজার বছরের। কত নারীর কত কোটি যন্ত্রণা ও বেদনার ইতিহাস অলিখিত, অশ্রুত রয়ে গেছে। সেই সাথে কত নারীর প্রতিবাদ-  ক্ষোভ- লড়াইয়ের কাহিনীও  অজানাই রয়ে গেছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এই দিবস পালনের মধ্যে যতটা বাগাড়ম্বর দেখা যায়, ততটা যুক্তিবাদী মুক্তচিন্তা অনেকের মধ্যেই বাস্তবে নেই। অন্তরে অন্তরে আমরা অসামাজিক পশ্চাৎপদ মানসিকতা লালন ও ধারণ করি বেশি । শুধু আমাদের দেশেই নয় বিশ্বের দেশে দেশে নারীর মানবাধিকার নানাভাবে লঙ্ঘনের ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে।  বিশ্ব বাজার ব্যবস্থায় চেতনে বা অবচেতনে নারী অনেক ক্ষেত্রেই পণ্যে পরিণত হচ্ছে। নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপনে নারীর অংশ গ্রহন দেখে কেউ কেউ বেশ উৎফুল্ল হয়, এর আড়ালে নারীর মুখশ্রী খানা যে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করে ব্যাবসা-বাণিজ্য প্রসারের বড় কোন কৌশল আছে সেদিকটা কি ভেবে দেখেছি কখনো? সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের চিন্তা – চেতনা আর কর্পোরেট দুনিয়ায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মাঝে নারীর মানবাধিকার আদায়ের প্রশ্নটা ক্রমশ দ্বন্দ্ব – সংকুল হয়ে উঠছে। ক্ষেত্রবিশেষে শিশুর হাতে লজেন্স দিয়ে ভুলিয়ে রাখার মতোই নারীর সামনে অসংখ্য অগ্রগতির ছবি তুলে ধরা হচ্ছে।বাস্তবে সমতার প্রশ্নে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। সেইসাথে পাল্লা দিয়ে অধিকাংশ দেশেই বাড়ছে ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তি। সেখানেও নারীসমাজকে চেতনে – অবচেতনে অন্ধকারকেই পরম বাতিঘর হিসেবে মনে করতে বাধ্য করা হচ্ছে। সমাজ সভ্যতা অনেক এগিয়েছে সেই এগোনোর পথেই যেন নারীরা পিছিয়েছে। অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন নারীর সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষিত নারীর সংখ্যা তেমন বাড়েনি। ফলে  এখনো  পুরুষদের অঙ্গুলিহেলনে নারীদের চলতে হয়, নিপীড়ন -নির্যাতনের শিকার হতে হয়।এজন্য নারীদেরকে শিক্ষিত, সচেতন ও প্রতিবাদী হবার পথ রুদ্ধ করার কুটকৌশল সব সময় যেমন ছিলো, এখনো তা অব্যাহত আছে। তারপরও নারী দিবসের চেতনা ধারন করে সকল বাধাঁর পাহাড় ডিঙিয়ে প্রতিবাদ- প্রতিরোধ -আন্দোলন জারি রেখে আগামীর সম্ভাবনাময় কোন এক নতুন ভোরের পথে এগিয়ে যাবে আমাদের মা-বোনেরা। বিদ্রোহী কবি নজরুলের কবিতার সেই পঙ্কতি নিশ্চয়ই বাস্তব হয়ে ধরা দেবে-
সেদিন সুদূর নয়, যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়!
-লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ গাইবান্ধা জেলা শাখা।