
আফতাব হোসেন, গাইবান্ধা:
নদীমাতৃক বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী লোকক্রীড়া নৌকা বাইচ। নদীপাড়ের জনপদে এ আয়োজন ঘিরে আজও তৈরি হয় বাঁধভাঙা উৎসবের আমেজ। আধুনিক বিনোদনের যুগেও যমুনার দুই তীরে আবালবৃদ্ধবনিতার উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে, শেকড়ের এই লোকজ সংস্কৃতির আবেদন এতটুকু কমেনি।
গত প্রায় দেড় যুগ ধরে গাইবান্ধার সাঘাটায় যমুনা নদীতে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। প্রতি বছর এ আসরকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জড়ো হয় এক ডজনেরও বেশি বাইচের নৌকা। প্রতিযোগিতা উপলক্ষে দলগুলো অন্তত এক সপ্তাহ আগেই এসে নদীপাড়ে আস্তানা গড়ে। প্রতিটি নৌকার সঙ্গে আসেন অন্তত পাঁচ শতাধিক বাইচাল ও সমর্থক। তাঁদের উপস্থিতিতে পুরো যমুনাপাড় পরিণত হয় এক বিশাল মিলনমেলায়।
বিপুল জনপ্রিয় এই ঐতিহ্যটি আজও টিকে রয়েছে মূলত স্থানীয় উদ্যোগ ও নৌকাপ্রেমীদের ব্যক্তিগত ভালোবাসার ওপর ভর করে। একেকটি বাইচের নৌকা তৈরি, সংস্কার, বছরজুড়ে পরিচর্যা এবং প্রতিযোগিতাকালীন দলগুলোর থাকা-খাওয়ার পেছনে নিজস্ব তহবিল থেকে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করেন নৌকার মালিকেরা। অন্যদিকে প্রতিযোগিতার সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও বিজয়ীদের আকর্ষণীয় পুরস্কারের বড় অঙ্কের ব্যয়ভারও বহন করতে হয় স্থানীয় আয়োজকদের। সরকারি কোনো সহযোগিতা ছাড়াই স্থানীয় ব্যক্তি ও শুভানুধ্যায়ীদের অনুদানে কোনোমতে সচল রাখা হচ্ছে এই ঐতিহ্য।
তবে শেকড়ের এই খেলাকে টিকিয়ে রাখতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা মিলছে না বলে ক্ষোভ ও আক্ষেপ জানিয়েছেন আয়োজক ও নৌকা মালিকেরা। কোনো আর্থিক অনুদান বা কাঠামোগত সহায়তা না থাকায় দিন দিন ব্যক্তিগত ব্যয়ের এই বোঝা টানা তাঁদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
সাঘাটার যমুনায় নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান সংগঠক কাইয়ুম বলেন, “সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তির আর্থিক সহযোগিতায় দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আমরা নৌকা বাইচের আয়োজন করে আসছি। কিন্তু মানুষের সামান্য অনুদানের ওপর নির্ভর করে প্রতি বছর এত বড় একটি আয়োজন চালিয়ে নেওয়া এখন খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।”
সাঘাটার ঘুড়িদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেলিম আহম্মেদ তুলিপ বলেন, “নৌকা বাইচ যে গ্রামীণ মানুষের কাছে কতটা জনপ্রিয়, তা নদীর দুই তীরের দর্শকের উপস্থিতিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, এত বড় একটি লোকজ উৎসবে কোনো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নেই।”
এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা ক্রীড়া অফিসার আলমগীর হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী সরকারিভাবে সরাসরি নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার কোনো বরাদ্দ বা সুযোগ নেই। তবে স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার আয়োজনে উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জাতীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নৌকা বাইচকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কেবল ব্যক্তির আগ্রহ বা দানের ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না। গ্রামবাংলার এই লোকজ উৎসব ও নদীকেন্দ্রিক ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই প্রয়োজন সরকারের সরাসরি তদারকি, সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং নিয়মিত আর্থিক প্রণোদনা।

Reporter Name 


















