
নওগাঁ প্রতিনিধি: ধানের মাঠে ফসল আছে, কিন্তু কৃষকের চোখে এখন হিসাবের খাতা। কত টাকা খরচ হবে, কত দামে ধান বিক্রি হবে। এই দুইয়ের ব্যবধান নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন নওগাঁর কৃষকেরা। লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ২০ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা হওয়ায় জমি তৈরি থেকে সেচ, মাড়াই ও ফসল পরিবহন, কৃষির প্রায় প্রতিটি ধাপেই বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়েছেন তারা।
নওগাঁর অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-জীবিকার বড় একটি অংশ কৃষিনির্ভর। জেলার বিস্তীর্ণ মাঠে ধান, সবজি ও বিভিন্ন ফসল উৎপাদনে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র, ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার ও মাড়াইযন্ত্রের ব্যবহার রয়েছে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে উৎপাদন খরচে।
জেলার কৃষকেরা বলছেন, শুধু ডিজেলের দাম নয়। সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরিসহ প্রায় সব কৃষি উপকরণের ব্যয়ই আগের তুলনায় বেশি। এর বিপরীতে বাজারে উৎপাদিত ফসলের দাম একই হারে বাড়ছে না। ফলে নতুন করে ডিজেলের দাম বাড়ায় লাভের জায়গা আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জমির ধরন ও সেচের প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজেলের বাড়তি দামে বিঘাপ্রতি সেচ খরচ কয়েক শ থেকে প্রায় দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর সঙ্গে জমি প্রস্তুত, মাড়াই ও পরিবহন ব্যয় যোগ হলে প্রতি বিঘায় সামগ্রিক উৎপাদন খরচ আরও ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।
বিশেষ করে সামনে বোরো মৌসুম নিয়ে বেশি চিন্তিত তারা। বোরো আবাদে দীর্ঘ সময় ধরে সেচ দিতে হয়। ফলে ডিজেলের বর্তমান দাম বহাল থাকলে মৌসুমজুড়ে সেচনির্ভর কৃষকের ব্যয় কতটা বাড়বে, তা নিয়েই এখন হিসাব কষছেন অনেকে।
নওগাঁ সদর উপজেলার গোয়ালী এলাকার কৃষক জামিলুর রহমান বলেন, সার-বীজ আর কীটনাশক কিনতেই আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা লাগে। এখন আবার তেলের দাম বেড়েছে। জমি তৈরি থেকে ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রতিটি কাজেই এর প্রভাব পড়বে।
তিনি বলেন, আমরা যে দামে ফসল উৎপাদন করি, বাজারে গিয়ে সেই হিসাব অনুযায়ী দাম পাই না। খরচ যদি এভাবে বাড়তেই থাকে, তাহলে বোরো আবাদ করে শেষ পর্যন্ত লাভ থাকবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।
রাণীনগর উপজেলার আবাদপুকুর এলাকার কৃষক গোলাম হোসেন বলেন, তাদের এলাকার অনেক জমিতে সেচের জন্য বেশি পানি তুলতে হয়। তাই ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব তাদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়বে।
তিনি বলেন, একবার তেলের দাম বাড়লে শুধু সেচের খরচ বাড়ে না। ট্রাক্টর দিয়ে জমি তৈরি, মই দেওয়া, পরে মাড়াই। সব জায়গাতেই বাড়তি টাকা দিতে হয়। আমাদের মতো ছোট কৃষকের জন্য এই বাড়তি ব্যয় সামলানো কঠিন।
মান্দা উপজেলা মৈণম এলাকার কৃষক সুধির চন্দ্র বর্গা জমিতে চাষাবাদ করেন। তার ভাষায়, উৎপাদিত ফসলের ভাগ দেওয়ার পর যে অংশ থাকে, সেখান থেকেও সেচ, চাষ, মাড়াই ও পরিবহনের খরচ মেটাতে হয়।
তিনি বলেন, বর্গা জমিতে চাষ করে কৃষকের হাতে খুব বেশি কিছু থাকে না। এখন তেলের দাম বাড়ায় ট্রাক্টর আর সেচের খরচও বাড়বে। ধান ঘরে ওঠার আগেই মনে হচ্ছে লোকসানের হিসাব শুরু হয়ে গেছে।
বদলগাছী উপজেলা ভান্ডারপুর এলাকার কৃষক রুবেল হোসেন বলেন, কৃষকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে উৎপাদন খরচ আর বিক্রয়মূল্যের মধ্যে সমন্বয় না থাকা।
তিনি বলেন, ধান উৎপাদনে যত টাকা খরচ হয়, বিক্রি করার সময় সেই খরচের হিসাব কেউ দেখে না। জমি চাষ, সেচ, মাড়াই। সবকিছুর খরচ বাড়ছে। কিন্তু ধানের দাম সেইভাবে না বাড়লে কৃষক কীভাবে টিকে থাকবে।
সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) নওগাঁ জেলা সমন্বয়ক জয়নাল আবেদিন মুকুল বলেন, নওগাঁর উৎপাদিত কৃষিপণ্য জেলার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও যায়। ফলে এখানকার কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার প্রভাব শুধু কৃষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
তিনি বলেন, কৃষক যদি উৎপাদন খরচ তুলতে না পারেন, তাহলে একসময় চাষাবাদে আগ্রহ কমে যেতে পারে। কৃষিকে সচল রাখতে জ্বালানি ব্যয়ের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করে কৃষকদের জন্য বিশেষ সহায়তা বা জ্বালানি ভর্তুকির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে ব্যয় বাড়তে থাকলে একসময় জমিতে ফসল ফলানোই কঠিন হয়ে পড়বে। আর উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজারদরের সমন্বয় না হলে সেই চাপ শেষ পর্যন্ত কৃষকের ঘাড়েই থেকে যাবে। সামনে বোরো মৌসুমে সেই চাপ কতটা বাড়ে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
কথা হলে নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষিতে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। তবে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমাতে বিভিন্ন সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সেচে সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎনির্ভর সেচব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের প্রযুক্তি কৃষকের সেচ ব্যয় কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

Reporter Name 


















