Dhaka ০১:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
নটর ডেম ও সেন্ট যোসেফে পলাশবাড়ী গ্রীন ফিল্ড স্কুলের ৭ শিক্ষার্থীর ভর্তির সুযোগ ঢাকা-রংপুর লংমার্চ ও পলাশবাড়ী পথসভা উপলক্ষে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রেস ব্রিফিং ৭ ধাপে ইউপি নির্বাচন শুরু ১২ নভেম্বর: প্রথম ধাপে ভোট ৮০ উপজেলার ইউনিয়নে গণমাধ্যমের অন্দরমহলে নিঃশব্দ মৃত্যুমিছিল:কাল হয়তো আমরা কেউ… ব্যবসায়ীর মুখোশে ভয়ংকর প্রতারণা: হাতিয়েছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার দেড় লক্ষ টাকা স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু নভেম্বরের মাঝামাঝিতে খাটের নিচে লুকোচুরি: মামী-ভাগ্নের কাণ্ডে পলাশবাড়িতে তুলকালাম মেসির উদাহরণ টেনে ইয়ামালকে সতর্ক করলেন সাবেক বার্সা তারকা তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর ঘিরে প্রবাসীদের ব্যাপক প্রস্তুতি রুশ ড্রোনের নিশানায় সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক সিআইএ প্রধান ?

ঘোড়াহাটে হাজারো ভক্তের সমাগমে ঐতিহ্যবাহী ঋষিঘাট গঙ্গা স্নান ও বারুণী মেলা

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:৫৭:২৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
  • ১৫২ Time View

ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:

পূজা-আরাধনা, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ঐতিহ্যবাহী ঋষিঘাট গঙ্গা স্নান ও বারুণী মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার ভোর থেকেই করতোয়া নদীর ঋষিঘাট প্রাঙ্গণে জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা হাজার হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী পুণ্যার্থী ও ভক্তদের ঢল নামে। দীর্ঘদিনের পুরোনো এই উৎসবটি স্থানীয় জনসাধারণের কাছে এক অনন্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে সুপরিচিত।

ভোর হতেই পুণ্যার্থীরা সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস মতে পাপমুক্তি ও আত্মশুদ্ধির আশায় নদীতে পবিত্র স্নান সম্পন্ন করেন। স্নান শেষে তারা সারিবদ্ধভাবে পূজা-করেছেন, ধূপ আরতি, প্রার্থনা ও নানা ধর্মীয় আচার-ানুষ্ঠানে অংশ নেন। এ সময় ভক্তদের কণ্ঠে সমবেত ধর্মীয় সংগীত, কীর্তন ও ভজন ধ্বনিতে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় এক গভীর আধ্যাত্মিক ভাবাবেগের সৃষ্টি হয়।

ধর্মীয় এই উৎসবকে কেন্দ্র করে করতোয়া নদীর তীরে আগের দিন থেকেই বসেছে বিশাল লোকজ মেলা। মেলা প্রাঙ্গণে স্থান পেয়েছে ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈরি জিনিসপত্র, হস্তশিল্প সামগ্রী, খেলনা, শাঁখা-সিঁদুর, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি ও খাবারের স্টল। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের জন্য নাগরদোলাসহ নানা বিনোদনের ব্যবস্থা থাকায় মেলাটি শুধু ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি সর্বজনীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় রূপ নেয়। পরিবার-পরিজন নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের কেনাকাটা ও আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে, যা মেলার পরের দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

মেলায় আগত বিপুল সংখ্যক মানুষের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই মেলাটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি মেলা কমিটির নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবক দল সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করে। এছাড়া পুণ্যার্থীদের তাৎক্ষণিক সেবায় প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র, বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা এবং নিখোঁজ ও তথ্য সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়।

ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব ও মেলা প্রাঙ্গণ পরিদর্শনে আসেন ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুবানা তানজিন, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল আল মামুন কাওসার শেখ, ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ মিয়া, ৩নং সিংড়া ইউপি চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন এবং উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি মনোরঞ্জন মোহন্ত ভুট্টুসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

মেলা কমিটির সভাপতি অরুণ কুমার সরকার ও সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার সরকার বিধান জানান, সকলের সহযোগিতা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবারের বারুণী গঙ্গা স্নান মেলা অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মেলার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় আগত ভক্ত ও দর্শনার্থীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা আশা প্রকাশ করেন, আগামী বছরগুলোতে এই উৎসব আরও বৃহৎ পরিসরে আয়োজন করা সম্ভব হবে।

উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি মনোরঞ্জন মোহন্ত ভুট্টু বলেন, “গঙ্গা স্নান সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অত্যন্ত পবিত্র একটি ধর্মীয় আচার। এই স্নানের মধ্য দিয়ে পুণ্যার্থীরা নিজেদের আত্মশুদ্ধি ও জগতের কল্যাণ প্রার্থনা করেন। তবে এই বারুণী মেলা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য অংশ। যুগ যুগ ধরে এই মেলা এখানে সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের বার্তা দিয়ে আসছে।”

স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা মন্তব্য করেন, এ ধরনের শতবর্ষী মেলা গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণে অনন্য ভূমিকা পালন করে। ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে বিভিন্ন স্তরের মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ গ্রামীণ বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

নটর ডেম ও সেন্ট যোসেফে পলাশবাড়ী গ্রীন ফিল্ড স্কুলের ৭ শিক্ষার্থীর ভর্তির সুযোগ

ঘোড়াহাটে হাজারো ভক্তের সমাগমে ঐতিহ্যবাহী ঋষিঘাট গঙ্গা স্নান ও বারুণী মেলা

Update Time : ১১:৫৭:২৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:

পূজা-আরাধনা, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ঐতিহ্যবাহী ঋষিঘাট গঙ্গা স্নান ও বারুণী মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার ভোর থেকেই করতোয়া নদীর ঋষিঘাট প্রাঙ্গণে জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা হাজার হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী পুণ্যার্থী ও ভক্তদের ঢল নামে। দীর্ঘদিনের পুরোনো এই উৎসবটি স্থানীয় জনসাধারণের কাছে এক অনন্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে সুপরিচিত।

ভোর হতেই পুণ্যার্থীরা সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস মতে পাপমুক্তি ও আত্মশুদ্ধির আশায় নদীতে পবিত্র স্নান সম্পন্ন করেন। স্নান শেষে তারা সারিবদ্ধভাবে পূজা-করেছেন, ধূপ আরতি, প্রার্থনা ও নানা ধর্মীয় আচার-ানুষ্ঠানে অংশ নেন। এ সময় ভক্তদের কণ্ঠে সমবেত ধর্মীয় সংগীত, কীর্তন ও ভজন ধ্বনিতে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় এক গভীর আধ্যাত্মিক ভাবাবেগের সৃষ্টি হয়।

ধর্মীয় এই উৎসবকে কেন্দ্র করে করতোয়া নদীর তীরে আগের দিন থেকেই বসেছে বিশাল লোকজ মেলা। মেলা প্রাঙ্গণে স্থান পেয়েছে ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈরি জিনিসপত্র, হস্তশিল্প সামগ্রী, খেলনা, শাঁখা-সিঁদুর, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি ও খাবারের স্টল। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের জন্য নাগরদোলাসহ নানা বিনোদনের ব্যবস্থা থাকায় মেলাটি শুধু ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি সর্বজনীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় রূপ নেয়। পরিবার-পরিজন নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের কেনাকাটা ও আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে, যা মেলার পরের দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

মেলায় আগত বিপুল সংখ্যক মানুষের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই মেলাটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি মেলা কমিটির নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবক দল সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করে। এছাড়া পুণ্যার্থীদের তাৎক্ষণিক সেবায় প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র, বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা এবং নিখোঁজ ও তথ্য সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়।

ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব ও মেলা প্রাঙ্গণ পরিদর্শনে আসেন ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুবানা তানজিন, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল আল মামুন কাওসার শেখ, ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ মিয়া, ৩নং সিংড়া ইউপি চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন এবং উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি মনোরঞ্জন মোহন্ত ভুট্টুসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

মেলা কমিটির সভাপতি অরুণ কুমার সরকার ও সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার সরকার বিধান জানান, সকলের সহযোগিতা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবারের বারুণী গঙ্গা স্নান মেলা অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মেলার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় আগত ভক্ত ও দর্শনার্থীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা আশা প্রকাশ করেন, আগামী বছরগুলোতে এই উৎসব আরও বৃহৎ পরিসরে আয়োজন করা সম্ভব হবে।

উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি মনোরঞ্জন মোহন্ত ভুট্টু বলেন, “গঙ্গা স্নান সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অত্যন্ত পবিত্র একটি ধর্মীয় আচার। এই স্নানের মধ্য দিয়ে পুণ্যার্থীরা নিজেদের আত্মশুদ্ধি ও জগতের কল্যাণ প্রার্থনা করেন। তবে এই বারুণী মেলা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য অংশ। যুগ যুগ ধরে এই মেলা এখানে সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের বার্তা দিয়ে আসছে।”

স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা মন্তব্য করেন, এ ধরনের শতবর্ষী মেলা গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণে অনন্য ভূমিকা পালন করে। ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে বিভিন্ন স্তরের মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ গ্রামীণ বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।