Dhaka ০৫:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের অভাব, পেশা বদলাচ্ছেন জেলেরা

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৪:৫৯:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৮ Time View

চিলমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: পেশায় তারা জেলে। মাছ না ধরলে এক বেলা পেটে ভাত জুটেনা তাদের। মাছ আর ব্রহ্মপুত্র নদ দুটোই তাদের জীবনের সাথে জড়িত। প্রাচীন প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্র নদ বর্তমানে তার সেই উত্তাল রূপ হারাতে বসেছে। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদের বুকজুড়ে সৃষ্ট
অসংখ্য চর এবং নাব্যতা সংকটের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদের সেই চিরচেনা রুপ আজ নেই। ফলে নদে কাঙ্খিত পরিমাণ মাছ না পাওয়ায় চরম দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী শতাধিক জেলে। অভাবের তাড়নায় বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন তারা।

​জানা গেছে, কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন পয়েন্টে বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। আগের দিনে এরকম সময়ে বড় ছোট নানা প্রজাতির মাছে জেলের জাল ভরপুর থাকলেও এখন সারাদিন জাল ফেলে সংসার চালানোর মতো মাছ পাওয়াই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে করে নদীপাড়ের মৎস্যজীবি পরিবারগুলোতে সব সময় অভাব-অনটন লেগেই রয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন ঘাটে মাছ ধরা নৌকাগুলো অলস পড়ে রয়েছে।অনেক জেলে জাল বুনছেন আবার অনেকে পুরাতন জাল ঠিক করছেন ঠিকই, কিন্তু নদীতে নামার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন অনেকটাই। নদের ভিতরে জেগে ওঠা বালুচর গুলোতে মাছ ধরার কোলাহল ও ব্যস্ততার পরিবর্তে নিরব নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। এ সময় রমনা ইউনিয়নের জোড়গাছ পুরাতন বাজার জেলে পল্লীর অঞ্জলী দেবী বলেন, আগের মত নদীতে মাছ নাই,যে মাছ পাওয়া যায় তা বিক্রি করে সংসার চলে না। তিনি আরও বলেন, নদীতে যখন ইলিশ মাছ ধরা নিষেধ থাকে। সেই সময়ে কার্ডধারী জেলেদের সরকারী সহায়তা হিসাবে কিছু পরিমাণ চাল দেয়া হয়।

সুশান্ত কুমার নামে এক জেলে আক্ষেপ করে জানান, বাপ-দাদার আমল থ্যাকি আমাগো বংশের সবাই নদীত মাছ ধরিই সংসার চলাইছে। কিন্তু এ্যালা নদীত আর মাছ নাই বল্লেই চলে। সারাদিন জাল টানিও তেলের দাম উঠছে না। পোলাপান লিয়াই তো বিপদে আছি, পেটের দায়ে বাধ্য হয়া অন্য কামকাজ শুরু করছি। শুনীল চন্দ্র নামে অপর এক জেলে জানায়, আগে নদীতে জাল ফেললে মাছ পাওয়া যেত। আর এখন আগের দিনের মত মাছ পাওয়া যায়। সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছে। এর জন্য অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য দিকে আয়ের পথ খুজছে।

জেলেদের দাবী, নদীতে আগের মতো মাছ না পাওয়ায় জাল-নৌকা মেরামত ও সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে।ঋণ করে কিংবা অন্য পেশার মানুষের কাছে হাত পেতে তাদের দিন পার করতে হচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে পেটের দায়ে রাজমিস্ত্রির জোগালি, দিনমজুর কিংবা রিকশা চালানোর মতো ভিন্ন পেশা বেছে নিচ্ছেন। নিজ পেশায় থেকে শিল্পটিকে বাচিয়ে রাখতে সরকারীভাবে সহযোগীতা কামনা করেন তারা।

আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক শামছুদ্দোহা সৌমিক বলেন, গত দুই-তিন বছরে মৌসুমি বন্যার স্থলে আকস্মিক স্বল্পস্থায়ী সাময়িক বন্যার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জেলার নদ-নদী অববাহিকায় মৌসুমি বড় বন্যার জন্য টানা এক থেকে দুই সপ্তাহ ভারী বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বৃষ্টির ধরনে একটা পরিবর্তন এসেছে। যখন যতটা হওয়ার কথা তখন ততটা হচ্ছে না। অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত বৃষ্টি হচ্ছে। বাকি সময় থাকছে বৃষ্টিহীন। এতে মাছের প্রজনন কার্য ব্যাহত হচ্ছে বলে নদ নদীগুলোতে মাছ কমে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে চিলমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অ.দা.) মোঃ এমদাদুল হক জানান, ব্রহ্মপুত্র নদে পানি কমে যাওয়া এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে মাছের প্রজনন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। তবে মৎস্য সম্পদ রক্ষায় আমরা নিয়মিত নদীতে অভিযান চালাচ্ছি এবং অবৈধ কারেন্ট ও চায়না দুয়ারী জাল জব্দের পাশাপাশি ধ্বংস করা হচ্ছে।তাছাড়া জেলেদের বিকল্প আয়ের পথ তৈরিতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সহায়তার কার্যক্রম অব্যাহত
রয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের অভাব, পেশা বদলাচ্ছেন জেলেরা

Update Time : ০৪:৫৯:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চিলমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: পেশায় তারা জেলে। মাছ না ধরলে এক বেলা পেটে ভাত জুটেনা তাদের। মাছ আর ব্রহ্মপুত্র নদ দুটোই তাদের জীবনের সাথে জড়িত। প্রাচীন প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্র নদ বর্তমানে তার সেই উত্তাল রূপ হারাতে বসেছে। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদের বুকজুড়ে সৃষ্ট
অসংখ্য চর এবং নাব্যতা সংকটের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদের সেই চিরচেনা রুপ আজ নেই। ফলে নদে কাঙ্খিত পরিমাণ মাছ না পাওয়ায় চরম দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী শতাধিক জেলে। অভাবের তাড়নায় বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন তারা।

​জানা গেছে, কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন পয়েন্টে বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। আগের দিনে এরকম সময়ে বড় ছোট নানা প্রজাতির মাছে জেলের জাল ভরপুর থাকলেও এখন সারাদিন জাল ফেলে সংসার চালানোর মতো মাছ পাওয়াই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে করে নদীপাড়ের মৎস্যজীবি পরিবারগুলোতে সব সময় অভাব-অনটন লেগেই রয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন ঘাটে মাছ ধরা নৌকাগুলো অলস পড়ে রয়েছে।অনেক জেলে জাল বুনছেন আবার অনেকে পুরাতন জাল ঠিক করছেন ঠিকই, কিন্তু নদীতে নামার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন অনেকটাই। নদের ভিতরে জেগে ওঠা বালুচর গুলোতে মাছ ধরার কোলাহল ও ব্যস্ততার পরিবর্তে নিরব নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। এ সময় রমনা ইউনিয়নের জোড়গাছ পুরাতন বাজার জেলে পল্লীর অঞ্জলী দেবী বলেন, আগের মত নদীতে মাছ নাই,যে মাছ পাওয়া যায় তা বিক্রি করে সংসার চলে না। তিনি আরও বলেন, নদীতে যখন ইলিশ মাছ ধরা নিষেধ থাকে। সেই সময়ে কার্ডধারী জেলেদের সরকারী সহায়তা হিসাবে কিছু পরিমাণ চাল দেয়া হয়।

সুশান্ত কুমার নামে এক জেলে আক্ষেপ করে জানান, বাপ-দাদার আমল থ্যাকি আমাগো বংশের সবাই নদীত মাছ ধরিই সংসার চলাইছে। কিন্তু এ্যালা নদীত আর মাছ নাই বল্লেই চলে। সারাদিন জাল টানিও তেলের দাম উঠছে না। পোলাপান লিয়াই তো বিপদে আছি, পেটের দায়ে বাধ্য হয়া অন্য কামকাজ শুরু করছি। শুনীল চন্দ্র নামে অপর এক জেলে জানায়, আগে নদীতে জাল ফেললে মাছ পাওয়া যেত। আর এখন আগের দিনের মত মাছ পাওয়া যায়। সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছে। এর জন্য অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য দিকে আয়ের পথ খুজছে।

জেলেদের দাবী, নদীতে আগের মতো মাছ না পাওয়ায় জাল-নৌকা মেরামত ও সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে।ঋণ করে কিংবা অন্য পেশার মানুষের কাছে হাত পেতে তাদের দিন পার করতে হচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে পেটের দায়ে রাজমিস্ত্রির জোগালি, দিনমজুর কিংবা রিকশা চালানোর মতো ভিন্ন পেশা বেছে নিচ্ছেন। নিজ পেশায় থেকে শিল্পটিকে বাচিয়ে রাখতে সরকারীভাবে সহযোগীতা কামনা করেন তারা।

আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক শামছুদ্দোহা সৌমিক বলেন, গত দুই-তিন বছরে মৌসুমি বন্যার স্থলে আকস্মিক স্বল্পস্থায়ী সাময়িক বন্যার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জেলার নদ-নদী অববাহিকায় মৌসুমি বড় বন্যার জন্য টানা এক থেকে দুই সপ্তাহ ভারী বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বৃষ্টির ধরনে একটা পরিবর্তন এসেছে। যখন যতটা হওয়ার কথা তখন ততটা হচ্ছে না। অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত বৃষ্টি হচ্ছে। বাকি সময় থাকছে বৃষ্টিহীন। এতে মাছের প্রজনন কার্য ব্যাহত হচ্ছে বলে নদ নদীগুলোতে মাছ কমে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে চিলমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অ.দা.) মোঃ এমদাদুল হক জানান, ব্রহ্মপুত্র নদে পানি কমে যাওয়া এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে মাছের প্রজনন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। তবে মৎস্য সম্পদ রক্ষায় আমরা নিয়মিত নদীতে অভিযান চালাচ্ছি এবং অবৈধ কারেন্ট ও চায়না দুয়ারী জাল জব্দের পাশাপাশি ধ্বংস করা হচ্ছে।তাছাড়া জেলেদের বিকল্প আয়ের পথ তৈরিতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সহায়তার কার্যক্রম অব্যাহত
রয়েছে।