Dhaka ০৭:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
গণমাধ্যমের অন্দরমহলে নিঃশব্দ মৃত্যুমিছিল:কাল হয়তো আমরা কেউ… ব্যবসায়ীর মুখোশে ভয়ংকর প্রতারণা: হাতিয়েছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার দেড় লক্ষ টাকা স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু নভেম্বরের মাঝামাঝিতে খাটের নিচে লুকোচুরি: মামী-ভাগ্নের কাণ্ডে পলাশবাড়িতে তুলকালাম মেসির উদাহরণ টেনে ইয়ামালকে সতর্ক করলেন সাবেক বার্সা তারকা তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর ঘিরে প্রবাসীদের ব্যাপক প্রস্তুতি রুশ ড্রোনের নিশানায় সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক সিআইএ প্রধান ? ৫ কোটি টাকার পানি শোধনাগার দুই বছরেও চালু হয়নি , ১৫ দিনের মধ্যে চালুর আল্টিমেটাম সার্ভার হ্যাক করে এনআইডি-সিডিআরসহ গোপন তথ্য সরবরাহ; যুবক গ্রেপ্তার জাভা সাগরে উল্টে গেল যাত্রীবাহী জাহাজ, ৬ জনের মৃত্যু—নিখোঁজ ১৩০

শিশু রামিসার নির্মম হত্যাকাণ্ড—একটি জাতিগত বিবেকের প্রশ্ন

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৭:৫৩:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬
  • ১০২ Time View

সম্পাদকীয়: শিশু রামিসার ওপর যে বর্বরতা নেমে এসেছে, তা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়—এটি আমাদের গোটা সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামো এবং মানবিক মূল্যবোধের দেয়ালে এক চূড়ান্ত আঘাত। সাত বছরের একটি নিষ্পাপ শিশুর এমন নির্মম ও নৃশংস পরিণতি কোনোভাবেই একটি সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না।

এই ঘটনা আমাদের সামনে আবারও এক কঠিন ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ধরেছে—আমরা কি সত্যিই আমাদের শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি? বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, দেশে শিশু নির্যাতন ও শিশু হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনার পরই দেশজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে, বিচার চাওয়া হয়; কিন্তু কিছুদিন পর সবকিছু আবার থিতিয়ে যায়। আর এই বিচারহীনতা বা বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়ে একের পর এক রামিসাকে অকালে ঝরে পড়তে হচ্ছে।

অপরাধী যেই হোক, তার সামাজিক পরিচয়, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে দ্রুততম ট্রাইব্যুনালে বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। আমাদের দেশে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ এবং ‘শিশু আইন, ২০১৩’-এর মতো কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও কেবল যথাযথ প্রয়োগের অভাব ও আইনি দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় বা সাহস পায়। বিচার ব্যবস্থার এই মন্থর গতি ন্যায়বিচারকে শুধু দুর্বলই করে না, বরং অপরাধী চক্রকে আরও বেশি বেপরোয়া করে তোলে।

তবে রামিসাদের বাঁচাতে হলে শুধু অপরাধের পর কঠোর শাস্তির দাবি তোলাই যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন আমাদের মনস্তাত্ত্বিক জগতের আমূল পরিবর্তন ও দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। আমাদের সমাজ কাঠামোর ভেতরে যে গভীর পচন ধরেছে, তা দূর করতে হবে গোড়া থেকে। শিশু, কন্যা বা নারী যে, কোনো ‘ভোগের বস্তু’ নয়, বরং সমান মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ—এই মৌলিক মানবিক শিক্ষা পরিবার এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই বাধ্যতামূলকভাবে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সাথে শিশুর প্রতি সঠিক আচরণ, জেন্ডার সংবেদনশীলতা, পারস্পরিক সম্মানবোধ এবং সহমর্মিতার শিক্ষা ছোটবেলা থেকেই মগজে গেঁথে দিতে হবে, যাতে একটি সুস্থ, সংবেদনশীল ও মানবিক প্রজন্ম তৈরি হয়।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর নজরদারি, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সক্রিয়তা এবং সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় নজরদারি বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।

রামিসার এই অকাল ও নির্মম মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের আজীবনের কান্না নয়—এটি পুরো ৫৬ হাজার বর্গমাইলের একটি জাতির যৌথ ব্যর্থতার এক কালো প্রতিচ্ছবি। এই জাতীয় ব্যর্থতা থেকে যদি আমরা এখনই শিক্ষা নিয়ে ব্যবস্থা না নিই, তবে এই অন্ধকার নির্মমতা আরও বহু শিশুর জীবন কেড়ে নেবে। আর কোনো রামিসাকে যেন এমন পৈশাচিক পরিণতির মুখোমুখি হতে না হয়, তার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজকে এখনই আপসহীন ও কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
বিবেকের এই গভীর ঘুম ভাঙানোর দায় আমাদের সবার।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গণমাধ্যমের অন্দরমহলে নিঃশব্দ মৃত্যুমিছিল:কাল হয়তো আমরা কেউ…

শিশু রামিসার নির্মম হত্যাকাণ্ড—একটি জাতিগত বিবেকের প্রশ্ন

Update Time : ০৭:৫৩:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬

সম্পাদকীয়: শিশু রামিসার ওপর যে বর্বরতা নেমে এসেছে, তা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়—এটি আমাদের গোটা সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামো এবং মানবিক মূল্যবোধের দেয়ালে এক চূড়ান্ত আঘাত। সাত বছরের একটি নিষ্পাপ শিশুর এমন নির্মম ও নৃশংস পরিণতি কোনোভাবেই একটি সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না।

এই ঘটনা আমাদের সামনে আবারও এক কঠিন ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ধরেছে—আমরা কি সত্যিই আমাদের শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি? বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, দেশে শিশু নির্যাতন ও শিশু হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনার পরই দেশজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে, বিচার চাওয়া হয়; কিন্তু কিছুদিন পর সবকিছু আবার থিতিয়ে যায়। আর এই বিচারহীনতা বা বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়ে একের পর এক রামিসাকে অকালে ঝরে পড়তে হচ্ছে।

অপরাধী যেই হোক, তার সামাজিক পরিচয়, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে দ্রুততম ট্রাইব্যুনালে বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। আমাদের দেশে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ এবং ‘শিশু আইন, ২০১৩’-এর মতো কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও কেবল যথাযথ প্রয়োগের অভাব ও আইনি দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় বা সাহস পায়। বিচার ব্যবস্থার এই মন্থর গতি ন্যায়বিচারকে শুধু দুর্বলই করে না, বরং অপরাধী চক্রকে আরও বেশি বেপরোয়া করে তোলে।

তবে রামিসাদের বাঁচাতে হলে শুধু অপরাধের পর কঠোর শাস্তির দাবি তোলাই যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন আমাদের মনস্তাত্ত্বিক জগতের আমূল পরিবর্তন ও দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। আমাদের সমাজ কাঠামোর ভেতরে যে গভীর পচন ধরেছে, তা দূর করতে হবে গোড়া থেকে। শিশু, কন্যা বা নারী যে, কোনো ‘ভোগের বস্তু’ নয়, বরং সমান মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ—এই মৌলিক মানবিক শিক্ষা পরিবার এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই বাধ্যতামূলকভাবে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সাথে শিশুর প্রতি সঠিক আচরণ, জেন্ডার সংবেদনশীলতা, পারস্পরিক সম্মানবোধ এবং সহমর্মিতার শিক্ষা ছোটবেলা থেকেই মগজে গেঁথে দিতে হবে, যাতে একটি সুস্থ, সংবেদনশীল ও মানবিক প্রজন্ম তৈরি হয়।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর নজরদারি, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সক্রিয়তা এবং সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় নজরদারি বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।

রামিসার এই অকাল ও নির্মম মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের আজীবনের কান্না নয়—এটি পুরো ৫৬ হাজার বর্গমাইলের একটি জাতির যৌথ ব্যর্থতার এক কালো প্রতিচ্ছবি। এই জাতীয় ব্যর্থতা থেকে যদি আমরা এখনই শিক্ষা নিয়ে ব্যবস্থা না নিই, তবে এই অন্ধকার নির্মমতা আরও বহু শিশুর জীবন কেড়ে নেবে। আর কোনো রামিসাকে যেন এমন পৈশাচিক পরিণতির মুখোমুখি হতে না হয়, তার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজকে এখনই আপসহীন ও কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
বিবেকের এই গভীর ঘুম ভাঙানোর দায় আমাদের সবার।