Dhaka ০১:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
গণমাধ্যমের অন্দরমহলে নিঃশব্দ মৃত্যুমিছিল:কাল হয়তো আমরা কেউ… ব্যবসায়ীর মুখোশে ভয়ংকর প্রতারণা: হাতিয়েছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার দেড় লক্ষ টাকা স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু নভেম্বরের মাঝামাঝিতে খাটের নিচে লুকোচুরি: মামী-ভাগ্নের কাণ্ডে পলাশবাড়িতে তুলকালাম মেসির উদাহরণ টেনে ইয়ামালকে সতর্ক করলেন সাবেক বার্সা তারকা তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর ঘিরে প্রবাসীদের ব্যাপক প্রস্তুতি রুশ ড্রোনের নিশানায় সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক সিআইএ প্রধান ? ৫ কোটি টাকার পানি শোধনাগার দুই বছরেও চালু হয়নি , ১৫ দিনের মধ্যে চালুর আল্টিমেটাম সার্ভার হ্যাক করে এনআইডি-সিডিআরসহ গোপন তথ্য সরবরাহ; যুবক গ্রেপ্তার জাভা সাগরে উল্টে গেল যাত্রীবাহী জাহাজ, ৬ জনের মৃত্যু—নিখোঁজ ১৩০

হারানো ঐতিহ্যে ফিরছে হাকালুকি হাওর

  • তিমির বনিক
  • Update Time : ০৯:৪৯:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২৩৩ Time View

সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার ৫ উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকি। মিঠাপানির এ হাওর ঘিরে রয়েছে অনেক ঐতিহ্য। জলজ, মৎস্য, কৃষি এই তিন উপাদানের জন্য এক সময় হাওরটি বিখ্যাত হলেও জলজ উদ্ভিদ ছাড়া মৎস্য ও কৃষিতে সফলতা রয়েছে হাওরের বুকে।

তথ্য সূত্রে জানা যায়, এশিয়ার অন্যতম ও দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকির আয়তন প্রায় ১৮ হাজার ১৫০ হেক্টর। ছোটবড় মিলে প্রায় ২৩৬টি বিল রয়েছে এই হাওরে। অসংখ্য খালগুলো দিয়ে কৃষকরা পানি সেচ করে কৃষি চাষ করেন। এসব খাল, বিলে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। বর্ষা মৌসুমে খাল বিলের পানিতে একাকার হয়ে যায়। শীতকালে প্রচুর বিদেশি পাখির আগমন ঘটে এই হাওরে। বরফে ঢাকা পশ্চিমা দেশ সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, তিব্বত, রাশিয়া সহ বিভিন্ন দেশ থেকে পাখিগুলো আসে। শীতকমে গেলে তারা আবার ও তাদের দেশে ফিরে যায়।

বোরো আমন চাষের জন্য হাকালুকি হাওর প্রসিদ্ধ। শীতের কনকনে শীতে কৃষক ভোরে সূর্যের আলো ছড়ার সাথে সাথে হাওরে গিয়ে কৃষিকাজ করেন।

বর্ষাকালে হাওরের সবটুকুজুড়ে পানি আর পানি। সেই পানিতে বাস করে হাজার রকমের ছোট বড় দেশীয় মাছ। বর্ষা মৌসুম চলে গেলে পানি কমে যাওয়ার কারণে মাছগুলো আশ্রয় নেয় ছোট বড় বিলগুলোতে। এসব বিলগুলো ইজারা দিয়ে কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে বাংলাদেশ সরকার।

মৎস্য, কৃষি কিংবা অতিথি পাখির কোলাহলে ভরপুর হাকালুকিতে একটা সময় বনাঞ্চল ছিল। প্রায় ৩০-৪০ বছর পূর্বেও হাকালুকি হাওরের বনে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী ছিল। এসবের মধ্যে মেছো বিড়াল (মেছো বাঘ) শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপের বসবাস ছিল। হাওরের মধ্যে হিজল, করচের বন ছিল পাহাড়ি জঙ্গলের মত। এসব বনের গাছের নিচে মাছগুলো ডিম দিত, যাতে শিকারিরা সহজে জাল ফেলে পোনা মারতে না পারে। হাওরগুলো নিলামে দেওয়ার কারণে ইজারাদাররা এসব বন কেটে বিলে কাঁটা হিসেবে ব্যবহৃত করার কারনে আগেরমত সেই বনাঞ্চল নেই হাওরে। ১৯৯৯ সালে হাকালুকি হাওরকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করার পরও বিভিন্ন অজুহাতে কাঁটা হয় এসব গাছ। শুধু ২০২১ সালে বাঁধ নির্মাণের অজুহাতে এক মালাম বিল থেকে প্রায় ২০ হাজার গাছ কাটা হয়েছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ ডেভেলপমেন্ট অফিসের অর্থায়নে হাকালুকি হাওরের বনাঞ্চল পূর্বের মত ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন ধরনের প্রদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিগত কয়েক বছরে প্রায় ৫০ হাজার হিজল, করচ ও বরুন গাছ রোপণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্যবেক্ষণের জন্য সংস্থা থেকে পাহারাদার নিয়োগ দেওয়ার কারণে পূর্বেরমতো ইজারাদাররা সহজে গাছ কাটতে পারেন না। প্রকৃতির পরিবেশ রক্ষা, মাছের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এ বনাঞ্চল রক্ষার দাবি এলাকাবাসীর।

হাওরপাড়ের বসবাসকারী বাসিন্দারা বলেন, হাওরে আগে মাছের পাশাপাশি অনেক গাছ ছিল। আমরা মাছ মারতে গেলে সহজে জাল ফেলা যেত না। কিছুদিন আগে থেকে এসব গাছ রোপণ করার কারণে কিছুটা সৌন্দর্য ফিরে আসছে।

সিএনআরএসের নবপল্লব প্রকল্পের ফিল্ড ম্যানেজার মোঃ তৌহিদুর রহমান বলেন, একটা সময় হাকালুকি হাওরে প্রচুর জলজ গাছ ছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বন বিভাগের আওতা থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে হাওরের ভূমির দায়িত্ব চলে যায়। এরপর থেকে তদারকির অভাবে গাছ কেটে জমি তৈরির কারনে গাছগুলো কাটা হয়েছে। সিএনআরএসের নবপল্লব প্রকল্পের আওতায় সেই পুরনো বনাঞ্চল ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগের সফলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আবার ও জলজ বৃক্ষে হাকালুকি তার ঐতিহ্য ফিরে পাবে বলে এ কর্মকর্তা আশা ব্যক্ত করেন।

পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক আব্দুল করিম কিম বলেন, হাকালুকি হাওরে জলজ ও হিজল-করচসহ অনেক বনের বৈচিত্র্যময় গাছপালা ছিল। এগুলো অনেকটাই উজাড় হয়ে গেছে। এখন যারা এই উদ্যোগ নিয়েছে নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু তখনই এটিই পরিপূর্ণতা পাবে যখন আগের মতো গাছগুলো দেখা যাবে। এ ছাড়া আর অজুহাতে কোন

দুষ্কৃতিকারীরা এই গাছগুলো কাটতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

হাকালুকি হাওর এশিয়ার বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি হওয়ায় এখানে হিজল-তমাল জাতীয় জলাভূমি উপযোগী গাছের আধিক্য রয়েছে যা মাছের প্রজনন ও আশ্রয়স্থল।

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহি উদ্দিন বলেন, সিএনআরএস যে উদ্যোগটি নিয়েছে সেটি খুব ভালো। হাকালুকি হাওরের বনাঞ্চল পূর্বের মত ফিরিয়ে আনতে সরকারের পাশাপাশি এ ধরনের প্রদক্ষেপ গ্রহণ প্রশংসনীয়। এ ছাড়া আমাদের সাথে আলাপ করে এসবের পর্যবেক্ষণের জন্য সংস্থা থেকে পাহারাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আমরাও তাদেরকে সহযোগিতা করছি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গণমাধ্যমের অন্দরমহলে নিঃশব্দ মৃত্যুমিছিল:কাল হয়তো আমরা কেউ…

হারানো ঐতিহ্যে ফিরছে হাকালুকি হাওর

Update Time : ০৯:৪৯:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার ৫ উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকি। মিঠাপানির এ হাওর ঘিরে রয়েছে অনেক ঐতিহ্য। জলজ, মৎস্য, কৃষি এই তিন উপাদানের জন্য এক সময় হাওরটি বিখ্যাত হলেও জলজ উদ্ভিদ ছাড়া মৎস্য ও কৃষিতে সফলতা রয়েছে হাওরের বুকে।

তথ্য সূত্রে জানা যায়, এশিয়ার অন্যতম ও দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকির আয়তন প্রায় ১৮ হাজার ১৫০ হেক্টর। ছোটবড় মিলে প্রায় ২৩৬টি বিল রয়েছে এই হাওরে। অসংখ্য খালগুলো দিয়ে কৃষকরা পানি সেচ করে কৃষি চাষ করেন। এসব খাল, বিলে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। বর্ষা মৌসুমে খাল বিলের পানিতে একাকার হয়ে যায়। শীতকালে প্রচুর বিদেশি পাখির আগমন ঘটে এই হাওরে। বরফে ঢাকা পশ্চিমা দেশ সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, তিব্বত, রাশিয়া সহ বিভিন্ন দেশ থেকে পাখিগুলো আসে। শীতকমে গেলে তারা আবার ও তাদের দেশে ফিরে যায়।

বোরো আমন চাষের জন্য হাকালুকি হাওর প্রসিদ্ধ। শীতের কনকনে শীতে কৃষক ভোরে সূর্যের আলো ছড়ার সাথে সাথে হাওরে গিয়ে কৃষিকাজ করেন।

বর্ষাকালে হাওরের সবটুকুজুড়ে পানি আর পানি। সেই পানিতে বাস করে হাজার রকমের ছোট বড় দেশীয় মাছ। বর্ষা মৌসুম চলে গেলে পানি কমে যাওয়ার কারণে মাছগুলো আশ্রয় নেয় ছোট বড় বিলগুলোতে। এসব বিলগুলো ইজারা দিয়ে কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে বাংলাদেশ সরকার।

মৎস্য, কৃষি কিংবা অতিথি পাখির কোলাহলে ভরপুর হাকালুকিতে একটা সময় বনাঞ্চল ছিল। প্রায় ৩০-৪০ বছর পূর্বেও হাকালুকি হাওরের বনে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী ছিল। এসবের মধ্যে মেছো বিড়াল (মেছো বাঘ) শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপের বসবাস ছিল। হাওরের মধ্যে হিজল, করচের বন ছিল পাহাড়ি জঙ্গলের মত। এসব বনের গাছের নিচে মাছগুলো ডিম দিত, যাতে শিকারিরা সহজে জাল ফেলে পোনা মারতে না পারে। হাওরগুলো নিলামে দেওয়ার কারণে ইজারাদাররা এসব বন কেটে বিলে কাঁটা হিসেবে ব্যবহৃত করার কারনে আগেরমত সেই বনাঞ্চল নেই হাওরে। ১৯৯৯ সালে হাকালুকি হাওরকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করার পরও বিভিন্ন অজুহাতে কাঁটা হয় এসব গাছ। শুধু ২০২১ সালে বাঁধ নির্মাণের অজুহাতে এক মালাম বিল থেকে প্রায় ২০ হাজার গাছ কাটা হয়েছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ ডেভেলপমেন্ট অফিসের অর্থায়নে হাকালুকি হাওরের বনাঞ্চল পূর্বের মত ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন ধরনের প্রদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিগত কয়েক বছরে প্রায় ৫০ হাজার হিজল, করচ ও বরুন গাছ রোপণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্যবেক্ষণের জন্য সংস্থা থেকে পাহারাদার নিয়োগ দেওয়ার কারণে পূর্বেরমতো ইজারাদাররা সহজে গাছ কাটতে পারেন না। প্রকৃতির পরিবেশ রক্ষা, মাছের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এ বনাঞ্চল রক্ষার দাবি এলাকাবাসীর।

হাওরপাড়ের বসবাসকারী বাসিন্দারা বলেন, হাওরে আগে মাছের পাশাপাশি অনেক গাছ ছিল। আমরা মাছ মারতে গেলে সহজে জাল ফেলা যেত না। কিছুদিন আগে থেকে এসব গাছ রোপণ করার কারণে কিছুটা সৌন্দর্য ফিরে আসছে।

সিএনআরএসের নবপল্লব প্রকল্পের ফিল্ড ম্যানেজার মোঃ তৌহিদুর রহমান বলেন, একটা সময় হাকালুকি হাওরে প্রচুর জলজ গাছ ছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বন বিভাগের আওতা থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে হাওরের ভূমির দায়িত্ব চলে যায়। এরপর থেকে তদারকির অভাবে গাছ কেটে জমি তৈরির কারনে গাছগুলো কাটা হয়েছে। সিএনআরএসের নবপল্লব প্রকল্পের আওতায় সেই পুরনো বনাঞ্চল ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগের সফলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আবার ও জলজ বৃক্ষে হাকালুকি তার ঐতিহ্য ফিরে পাবে বলে এ কর্মকর্তা আশা ব্যক্ত করেন।

পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক আব্দুল করিম কিম বলেন, হাকালুকি হাওরে জলজ ও হিজল-করচসহ অনেক বনের বৈচিত্র্যময় গাছপালা ছিল। এগুলো অনেকটাই উজাড় হয়ে গেছে। এখন যারা এই উদ্যোগ নিয়েছে নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু তখনই এটিই পরিপূর্ণতা পাবে যখন আগের মতো গাছগুলো দেখা যাবে। এ ছাড়া আর অজুহাতে কোন

দুষ্কৃতিকারীরা এই গাছগুলো কাটতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

হাকালুকি হাওর এশিয়ার বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি হওয়ায় এখানে হিজল-তমাল জাতীয় জলাভূমি উপযোগী গাছের আধিক্য রয়েছে যা মাছের প্রজনন ও আশ্রয়স্থল।

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহি উদ্দিন বলেন, সিএনআরএস যে উদ্যোগটি নিয়েছে সেটি খুব ভালো। হাকালুকি হাওরের বনাঞ্চল পূর্বের মত ফিরিয়ে আনতে সরকারের পাশাপাশি এ ধরনের প্রদক্ষেপ গ্রহণ প্রশংসনীয়। এ ছাড়া আমাদের সাথে আলাপ করে এসবের পর্যবেক্ষণের জন্য সংস্থা থেকে পাহারাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আমরাও তাদেরকে সহযোগিতা করছি।