Dhaka ০১:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
নটর ডেম ও সেন্ট যোসেফে পলাশবাড়ী গ্রীন ফিল্ড স্কুলের ৭ শিক্ষার্থীর ভর্তির সুযোগ ঢাকা-রংপুর লংমার্চ ও পলাশবাড়ী পথসভা উপলক্ষে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রেস ব্রিফিং ৭ ধাপে ইউপি নির্বাচন শুরু ১২ নভেম্বর: প্রথম ধাপে ভোট ৮০ উপজেলার ইউনিয়নে গণমাধ্যমের অন্দরমহলে নিঃশব্দ মৃত্যুমিছিল:কাল হয়তো আমরা কেউ… ব্যবসায়ীর মুখোশে ভয়ংকর প্রতারণা: হাতিয়েছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার দেড় লক্ষ টাকা স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু নভেম্বরের মাঝামাঝিতে খাটের নিচে লুকোচুরি: মামী-ভাগ্নের কাণ্ডে পলাশবাড়িতে তুলকালাম মেসির উদাহরণ টেনে ইয়ামালকে সতর্ক করলেন সাবেক বার্সা তারকা তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর ঘিরে প্রবাসীদের ব্যাপক প্রস্তুতি রুশ ড্রোনের নিশানায় সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক সিআইএ প্রধান ?

১০ লাখে বিক্রি হলেন রুশ সেনাবাহিনীর কাছে: যুদ্ধশিবির থেকে বাংলাদেশি যুবকের বাঁচার আকুতি

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৯:৫৬:২৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
  • ১৭২ Time View

ডেস্ক রিপোর্ট:

পরিবারে একটু সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন ছিল তাঁর। সেই স্বপ্ন পূরণে ধারদেনা করে প্রায় ১০ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন একটি এজেন্সির হাতে। কথা ছিল রাশিয়ার কোনো কোম্পানিতে বা নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ পাবেন জামালপুর সদর উপজেলার মো. আরমান আলী (৩০)। কিন্তু দালালের খপ্পরে পড়ে স্বপ্ন বদলে গেছে এক দুঃস্বপ্নে। ভালো চাকরির বদলে আরমানকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে। এখন প্রাণহানির চরম শঙ্কা নিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে দিন কাটছে তাঁর। ইতিমধ্যে ড্রোন হামলায় আহতও হয়েছেন তিনি। যুদ্ধশিবির থেকে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় এখন শুধুই দেশে ফেরার আকুতি জানাচ্ছেন এই বাংলাদেশি যুবক।

আরমান আলী জামালপুর সদর উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নের গোদাশিমলা এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বাড়িতে রয়েছে তাঁর স্ত্রী এবং পাঁচ মাস বয়সী এক দুগ্ধপোষ্য সন্তান। গত ৭ মে রাশিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন আরমান। এর পর থেকেই তিনি রুশ সেনাবাহিনীর হেফাজতে যুদ্ধক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে লড়ছেন।

গত শুক্রবার বিকেলে আরমানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। স্বজনদের চোখেমুখে শুধুই উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তার ছাপ। আরমানের যুদ্ধশিবিরে আটকে পড়ার খবরে প্রতিবেশীরা এসে ভিড় করছেন বাড়িতে। সবার মুখে একটাই আলোচনা—আরমান কি আদৌ ফিরতে পারবেন? এদিকে আরমানের পাঁচ মাস বয়সী অবুঝ শিশুটি দোলনায় দুলছে, সে জানেও না তার বাবার ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

টিনশেড ঘরের দরজায় বসে অনবরত কাঁদছিলেন আরমানের মা রেখা বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন: “বিদেশে গিয়ে সংসারের অভাব দূর করতে চেয়েছিল আরমান। কিন্তু এখন প্রতিদিনই আমরা অপেক্ষা করি ছেলের একটা ফোনকলের জন্য। কই আমার বাবার ফোন তো আসে না! আমি আমার বাবাকে অক্ষত অবস্থায় ফেরত চাই।”

‘আমাদের মাছের টোপের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে’

পরিবারের সদস্যরা জানান, রাশিয়ায় যাওয়ার পর প্রথম দিকে আরমানের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। গত ২৬ মে হঠাৎ একটি ফোন করে আরমান জানান, তাঁকে সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে এবং তিনি ইউক্রেন সীমান্ত এলাকার কোনো এক যুদ্ধশিবিরে আছেন। এরপর থেকে তাঁর ফোন বন্ধ।

তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুশ সেনাবাহিনীর পোশাক পরা অবস্থায় আরমানের একটি ভিডিও বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে আরমান কান্না করতে করতে তাঁদের ওপর হওয়া নির্মমতার বর্ণনা দেন।

আরমান বলেন, “আমাদের মোট ৩০ জনকে একসঙ্গে রাশিয়া নেওয়া হয়েছিল। এজেন্সির লোক বলেছিল ভালো কাজ দেবে। কিন্তু পৌঁছানোর দুই দিনের মধ্যে রাশিয়ার দুই নাগরিকের হাতে আমাদের তুলে দেওয়া হয়। পরে আমাদের যুদ্ধের জন্য বিক্রি করে দেওয়া হয়।”

তিনি আরও বলেন:”ক্যাম্পে মাত্র ৩-৪ দিনের ট্রেনিং দিয়ে আমাদের ১৬ জনকে এক ক্যাম্পে পাঠানো হয়। ফ্রন্টলাইনে মাটির নিচে গ্রেনেড-মাইন আর ওপরে ড্রোন থাকে। ড্রোন দিয়ে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়। মাছের টোপের মতো আমাদের ব্যবহার করা হচ্ছে—ডানে যেতে বললে ডানে, বামে যেতে বললে বামে। এভাবে আমাদের ১৬ জনের মধ্যে ১২ জনই মারা গেছে! এখন মাত্র ৪ জন বেঁচে আছি। ড্রোন হামলায় আমার বাম হাত জখম হয়েছে। বাকি দুজন হাসপাতালে।”

শিউরে ওঠার মতো তথ্য দিয়ে আরমান বলেন, “ফ্রন্টলাইনে না যেতে চাইলেই আমাদের মারধর করা হয়, মাটির নিচে বাংকারে আটকে রাখা হয়। আমরা তো ভাষা বুঝি না, কিছু বুঝিয়ে বলতেও পারি না। আমাদের সবার বাড়িতে ছোট ছোট বাচ্চা আছে। আমরা তো এই জীবন চাই নাই। আমরা আসছিলাম শুধু ডাল-ভাত খাইয়া বাঁচার জন্য। আমাদের রক্ষা করুন, প্লিজ।”

আরমানের বাবা রফিকুল ইসলাম কান্নাভেজা চোখে বলেন, “উন্নত জীবনের আশায় ছেলেটা ১০ লাখ টাকা খরচ করে রাশিয়া গিয়েছিল। কিন্তু তাকে দালালেরা বিক্রি করে দিল। আমি আমার ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের জরুরি সহযোগিতা চাই।”

আরমানের ছোট ভাই সালমান জানান, আরমান এর আগে ইরাকে চার বছর শ্রমিক হিসেবে কাজ করে দেশে ফিরেছিলেন। দুই বছর আগে বিয়ে করার পর দীর্ঘদিন বেকার ছিলেন। সংসারের অভাব দূর করতেই আবার বিদেশে পাড়ি জমান। তিনি বলেন, “আমরা জানি না ভাই এখন কোথায় আছে, কেমন আছে, আদৌ বেঁচে আছে কি না। কী করব, কার কাছে যাব—কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। আমরা শুধু চাই, আমার ভাই নিরাপদে দেশে ফিরে আসুক।”

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

নটর ডেম ও সেন্ট যোসেফে পলাশবাড়ী গ্রীন ফিল্ড স্কুলের ৭ শিক্ষার্থীর ভর্তির সুযোগ

১০ লাখে বিক্রি হলেন রুশ সেনাবাহিনীর কাছে: যুদ্ধশিবির থেকে বাংলাদেশি যুবকের বাঁচার আকুতি

Update Time : ০৯:৫৬:২৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

ডেস্ক রিপোর্ট:

পরিবারে একটু সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন ছিল তাঁর। সেই স্বপ্ন পূরণে ধারদেনা করে প্রায় ১০ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন একটি এজেন্সির হাতে। কথা ছিল রাশিয়ার কোনো কোম্পানিতে বা নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ পাবেন জামালপুর সদর উপজেলার মো. আরমান আলী (৩০)। কিন্তু দালালের খপ্পরে পড়ে স্বপ্ন বদলে গেছে এক দুঃস্বপ্নে। ভালো চাকরির বদলে আরমানকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে। এখন প্রাণহানির চরম শঙ্কা নিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে দিন কাটছে তাঁর। ইতিমধ্যে ড্রোন হামলায় আহতও হয়েছেন তিনি। যুদ্ধশিবির থেকে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় এখন শুধুই দেশে ফেরার আকুতি জানাচ্ছেন এই বাংলাদেশি যুবক।

আরমান আলী জামালপুর সদর উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নের গোদাশিমলা এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বাড়িতে রয়েছে তাঁর স্ত্রী এবং পাঁচ মাস বয়সী এক দুগ্ধপোষ্য সন্তান। গত ৭ মে রাশিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন আরমান। এর পর থেকেই তিনি রুশ সেনাবাহিনীর হেফাজতে যুদ্ধক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে লড়ছেন।

গত শুক্রবার বিকেলে আরমানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। স্বজনদের চোখেমুখে শুধুই উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তার ছাপ। আরমানের যুদ্ধশিবিরে আটকে পড়ার খবরে প্রতিবেশীরা এসে ভিড় করছেন বাড়িতে। সবার মুখে একটাই আলোচনা—আরমান কি আদৌ ফিরতে পারবেন? এদিকে আরমানের পাঁচ মাস বয়সী অবুঝ শিশুটি দোলনায় দুলছে, সে জানেও না তার বাবার ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

টিনশেড ঘরের দরজায় বসে অনবরত কাঁদছিলেন আরমানের মা রেখা বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন: “বিদেশে গিয়ে সংসারের অভাব দূর করতে চেয়েছিল আরমান। কিন্তু এখন প্রতিদিনই আমরা অপেক্ষা করি ছেলের একটা ফোনকলের জন্য। কই আমার বাবার ফোন তো আসে না! আমি আমার বাবাকে অক্ষত অবস্থায় ফেরত চাই।”

‘আমাদের মাছের টোপের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে’

পরিবারের সদস্যরা জানান, রাশিয়ায় যাওয়ার পর প্রথম দিকে আরমানের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। গত ২৬ মে হঠাৎ একটি ফোন করে আরমান জানান, তাঁকে সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে এবং তিনি ইউক্রেন সীমান্ত এলাকার কোনো এক যুদ্ধশিবিরে আছেন। এরপর থেকে তাঁর ফোন বন্ধ।

তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুশ সেনাবাহিনীর পোশাক পরা অবস্থায় আরমানের একটি ভিডিও বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে আরমান কান্না করতে করতে তাঁদের ওপর হওয়া নির্মমতার বর্ণনা দেন।

আরমান বলেন, “আমাদের মোট ৩০ জনকে একসঙ্গে রাশিয়া নেওয়া হয়েছিল। এজেন্সির লোক বলেছিল ভালো কাজ দেবে। কিন্তু পৌঁছানোর দুই দিনের মধ্যে রাশিয়ার দুই নাগরিকের হাতে আমাদের তুলে দেওয়া হয়। পরে আমাদের যুদ্ধের জন্য বিক্রি করে দেওয়া হয়।”

তিনি আরও বলেন:”ক্যাম্পে মাত্র ৩-৪ দিনের ট্রেনিং দিয়ে আমাদের ১৬ জনকে এক ক্যাম্পে পাঠানো হয়। ফ্রন্টলাইনে মাটির নিচে গ্রেনেড-মাইন আর ওপরে ড্রোন থাকে। ড্রোন দিয়ে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়। মাছের টোপের মতো আমাদের ব্যবহার করা হচ্ছে—ডানে যেতে বললে ডানে, বামে যেতে বললে বামে। এভাবে আমাদের ১৬ জনের মধ্যে ১২ জনই মারা গেছে! এখন মাত্র ৪ জন বেঁচে আছি। ড্রোন হামলায় আমার বাম হাত জখম হয়েছে। বাকি দুজন হাসপাতালে।”

শিউরে ওঠার মতো তথ্য দিয়ে আরমান বলেন, “ফ্রন্টলাইনে না যেতে চাইলেই আমাদের মারধর করা হয়, মাটির নিচে বাংকারে আটকে রাখা হয়। আমরা তো ভাষা বুঝি না, কিছু বুঝিয়ে বলতেও পারি না। আমাদের সবার বাড়িতে ছোট ছোট বাচ্চা আছে। আমরা তো এই জীবন চাই নাই। আমরা আসছিলাম শুধু ডাল-ভাত খাইয়া বাঁচার জন্য। আমাদের রক্ষা করুন, প্লিজ।”

আরমানের বাবা রফিকুল ইসলাম কান্নাভেজা চোখে বলেন, “উন্নত জীবনের আশায় ছেলেটা ১০ লাখ টাকা খরচ করে রাশিয়া গিয়েছিল। কিন্তু তাকে দালালেরা বিক্রি করে দিল। আমি আমার ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের জরুরি সহযোগিতা চাই।”

আরমানের ছোট ভাই সালমান জানান, আরমান এর আগে ইরাকে চার বছর শ্রমিক হিসেবে কাজ করে দেশে ফিরেছিলেন। দুই বছর আগে বিয়ে করার পর দীর্ঘদিন বেকার ছিলেন। সংসারের অভাব দূর করতেই আবার বিদেশে পাড়ি জমান। তিনি বলেন, “আমরা জানি না ভাই এখন কোথায় আছে, কেমন আছে, আদৌ বেঁচে আছে কি না। কী করব, কার কাছে যাব—কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। আমরা শুধু চাই, আমার ভাই নিরাপদে দেশে ফিরে আসুক।”