Dhaka ০৫:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জলবায়ুর থাবায় অস্তিত্ব সংকটে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, বন্ধ তিন শতাধিক নৌঘাট

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৯:৪৮:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৬৭ Time View

আফতাব হোসেন:

জলবায়ুর পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে ক্রমাগত নাব্য সংকটে পড়ে মরণদশায় উপনীত হয়েছে উত্তরের জীবনরেখা খ্যাত তিস্তাব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদী। হারিয়ে ফেলেছে পানি প্রবাহের চিরচায়িত স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি। নাব্য সংকটের কারণে বছরের আট মাসই অচল থাকছে চরাঞ্চল ও মূল ভূখন্ডের সাথে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম তিন শতাধিক নৌঘাট।  এর ফলে পশ্চিম পাড়ের জেলা গাইবান্ধাকুড়িগ্রাম ও রংপুরের সাথে পূর্বপাড়ের জামালপুরময়মিনসিংহশেরপুর ও ঢাকার নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। এতে চরম ভোগান্তির পাশাপাশি চরাঞ্চলের মানুষ ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

তথ্য নিয়ে জানা যায়রংপুর বিভাগের গাইবান্ধাকুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলার ১৬টি উপজেলার ৪১০টি চরে অন্তত ১৪ লাখ মানুষ বসবাস করে। এই তিন জেলার মোট ভৌগোলিক এলাকার প্রায় ২৫ শতাংশই নদী ও চরাঞ্চল। এই বিস্তীর্ণ জনপদে অভ্যন্তরীণ নৌঘাট প্রায় ৪ শতাধিক। শিক্ষাচিকিৎসাহাটবাজার এবং চাষাবাদের প্রয়োজনে প্রতিদিন লাখো মানুষকে নদীর এপার-ওপার করতে হয়। কিন্তু নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ায় বর্তমানে অন্ত৩০০টি নৌঘাট বন্ধ হয়ে গেছে।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভাটি কাপাসিয়া চরের রাজা মিয়া আক্ষেপ করে বলেননদীতে পানি নেইমাইলের পর মাইল শুধু বালু। এখন মূল শহরের হাটবাজারে যাওয়া আমাদের জন্য পাহাড় টপকানোর মতো কঠিন হয়ে পড়েছে।

 নদী গবেষক ও গণউন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস্ সালাম জানাননাব্য সংকটে ব্রহ্মপুত্রযমুনা ও তিস্তার বুক এখন ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। মানুষ বাধ্য হয়ে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পায়ে হেটে যোগাযোগ রক্ষা করছে। চরাঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহনে কৃষকরা মহাবিপদে পড়েছেন। বিকল্প হিসেবে ঘোড়ার গাড়িঅটো-বাইক কিংবা কাঁকড়া‘ ট্রাক্টরে চড়ে ৫ থেকে ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে যাতায়াত সময় যেমন বাড়ছেতেমনি গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়ার টাকা। তিনি দ্রুত নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নৌপথ সচল করার দাবি জানান।

ফুূলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়ার ইউপি সদস্য হামিদ মিয়া বলেনবাহাদুরাবাদের সাথে বালাসীঘাটের যোগাযোগে দুটি বড় নৌবন্দর নির্মান হলেও তা বন্ধ রয়েছে ফেরি চলাচলে প্রয়োজনীয় পানি না থাকায়। এজন্য তিনি নদী ড্রেজিং করার পরামর্শ দিয়ে বলেননদীর সাথে হাজারো মানুষের জীবনজীবিকা জড়িত।

 গাইবান্ধার বালাসীঘাটের ইজারাদার হাসু মিয়াজানানগ্রতিবছর বিপুল টাকা দিয়ে ঘাট ইজারা নিলেও নাব্য সংকটে ঘাট বন্ধ থাকায় লোকসানের বোঝা বইতে হচ্ছে। নৌযান চলাচল না করায় আয় বন্ধ হওয়ার পথে।

 গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানানমাঝেমধ্যে যমুনা নদীতে ড্রেজিং করে নৌপথ সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে নদীর বিশাল এলাকা জুড়ে এই সংকট নিরসন বেশ চ্যালেঞ্জিং।

 এদিকেবাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) কিছু কিছু পয়েন্টে ড্রেজিং করে একটি রুট সচল রাখার চেষ্টা করলেও বিশাল চরাঞ্চলের মানুষের জন্য তা যথেষ্ট নয়। পানিশূন্য এই নদীগুলোকে বাঁচাতে এবং চরাঞ্চলের মানুষের জনদুর্ভোগ লাঘবে সরকার দীর্ঘমেয়াদী ও বৈজ্ঞানিক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করবে-এমনটাই এখন উত্তরাঞ্চলবাসীর প্রত্যাশা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

জলবায়ুর থাবায় অস্তিত্ব সংকটে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, বন্ধ তিন শতাধিক নৌঘাট

Update Time : ০৯:৪৮:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬

আফতাব হোসেন:

জলবায়ুর পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে ক্রমাগত নাব্য সংকটে পড়ে মরণদশায় উপনীত হয়েছে উত্তরের জীবনরেখা খ্যাত তিস্তাব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদী। হারিয়ে ফেলেছে পানি প্রবাহের চিরচায়িত স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি। নাব্য সংকটের কারণে বছরের আট মাসই অচল থাকছে চরাঞ্চল ও মূল ভূখন্ডের সাথে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম তিন শতাধিক নৌঘাট।  এর ফলে পশ্চিম পাড়ের জেলা গাইবান্ধাকুড়িগ্রাম ও রংপুরের সাথে পূর্বপাড়ের জামালপুরময়মিনসিংহশেরপুর ও ঢাকার নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। এতে চরম ভোগান্তির পাশাপাশি চরাঞ্চলের মানুষ ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

তথ্য নিয়ে জানা যায়রংপুর বিভাগের গাইবান্ধাকুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলার ১৬টি উপজেলার ৪১০টি চরে অন্তত ১৪ লাখ মানুষ বসবাস করে। এই তিন জেলার মোট ভৌগোলিক এলাকার প্রায় ২৫ শতাংশই নদী ও চরাঞ্চল। এই বিস্তীর্ণ জনপদে অভ্যন্তরীণ নৌঘাট প্রায় ৪ শতাধিক। শিক্ষাচিকিৎসাহাটবাজার এবং চাষাবাদের প্রয়োজনে প্রতিদিন লাখো মানুষকে নদীর এপার-ওপার করতে হয়। কিন্তু নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ায় বর্তমানে অন্ত৩০০টি নৌঘাট বন্ধ হয়ে গেছে।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভাটি কাপাসিয়া চরের রাজা মিয়া আক্ষেপ করে বলেননদীতে পানি নেইমাইলের পর মাইল শুধু বালু। এখন মূল শহরের হাটবাজারে যাওয়া আমাদের জন্য পাহাড় টপকানোর মতো কঠিন হয়ে পড়েছে।

 নদী গবেষক ও গণউন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস্ সালাম জানাননাব্য সংকটে ব্রহ্মপুত্রযমুনা ও তিস্তার বুক এখন ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। মানুষ বাধ্য হয়ে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পায়ে হেটে যোগাযোগ রক্ষা করছে। চরাঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহনে কৃষকরা মহাবিপদে পড়েছেন। বিকল্প হিসেবে ঘোড়ার গাড়িঅটো-বাইক কিংবা কাঁকড়া‘ ট্রাক্টরে চড়ে ৫ থেকে ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে যাতায়াত সময় যেমন বাড়ছেতেমনি গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়ার টাকা। তিনি দ্রুত নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নৌপথ সচল করার দাবি জানান।

ফুূলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়ার ইউপি সদস্য হামিদ মিয়া বলেনবাহাদুরাবাদের সাথে বালাসীঘাটের যোগাযোগে দুটি বড় নৌবন্দর নির্মান হলেও তা বন্ধ রয়েছে ফেরি চলাচলে প্রয়োজনীয় পানি না থাকায়। এজন্য তিনি নদী ড্রেজিং করার পরামর্শ দিয়ে বলেননদীর সাথে হাজারো মানুষের জীবনজীবিকা জড়িত।

 গাইবান্ধার বালাসীঘাটের ইজারাদার হাসু মিয়াজানানগ্রতিবছর বিপুল টাকা দিয়ে ঘাট ইজারা নিলেও নাব্য সংকটে ঘাট বন্ধ থাকায় লোকসানের বোঝা বইতে হচ্ছে। নৌযান চলাচল না করায় আয় বন্ধ হওয়ার পথে।

 গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানানমাঝেমধ্যে যমুনা নদীতে ড্রেজিং করে নৌপথ সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে নদীর বিশাল এলাকা জুড়ে এই সংকট নিরসন বেশ চ্যালেঞ্জিং।

 এদিকেবাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) কিছু কিছু পয়েন্টে ড্রেজিং করে একটি রুট সচল রাখার চেষ্টা করলেও বিশাল চরাঞ্চলের মানুষের জন্য তা যথেষ্ট নয়। পানিশূন্য এই নদীগুলোকে বাঁচাতে এবং চরাঞ্চলের মানুষের জনদুর্ভোগ লাঘবে সরকার দীর্ঘমেয়াদী ও বৈজ্ঞানিক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করবে-এমনটাই এখন উত্তরাঞ্চলবাসীর প্রত্যাশা।