
আফতাব হোসেন:
জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে উত্তরাঞ্চরের প্রধান নদ-নদীগুলো। তীব্র নাব্য সংকটে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও তিস্তা নদী হারিয়েছে তার চিরচায়িত পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক গতি। বছরের আট মাসই পানিশূন্য থাকছে এসব নদের বিশাল এলাকা। ফলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে তিন শতাধিক নৌঘাট। এতে গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও রংপুর অঞ্চলের চরাঞ্চল এবং মূল ভূখণ্ডের প্রায় ১৪ লাখ মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
বিপর্যস্ত জনজীবন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলার ১৬টি উপজেলায় ৪১০টি চরে বিপুল সংখ্যক মানুষের বসবাস। এই তিন জেলার মোট ভৌগোলিক এলাকার প্রায় ২৫ শতাংশই নদী ও চরাঞ্চল। যাতায়াতের জন্য এই তিন জেলায় চার শতাধিক অভ্যন্তরীণ নৌঘাট রয়েছে, যার মধ্যে ৫৯টি তিস্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু জলবায়ু সংকটের প্রভাবে নদীগুলো দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ায় তিন শতাধিক নৌঘাট বর্তমানে অচল।
সরেজমিনে দেখা যায়, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের বুকজুড়ে এখন শুধুই ধু-ধু বালুচর। পশ্চিম পাড়ের জেলাগুলোর সাথে পূর্বপাড়ের জামালপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও ঢাকার নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রতিদিন চাষাবাদ, হাটবাজার, শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রয়োজনে মানুষকে মাইলের পর মাইল বালুচর পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতে হচ্ছে।
হরিপুর চরের বাসিন্দা মোসলেম উদ্দিন বলেন, “নদীতে পানি নেই, নৌকাও চলে না। ৫-৬ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে ঘাটে পৌঁছাতে হয়। আমাদের কষ্টের শেষ নেই।”
বিকল্প বাহনে ঝুঁকি ও বাড়তি ব্যয় নৌকা না চলায় চরাঞ্চলের মানুষ বাধ্য হয়ে ঘোড়ার গাড়ি, অটোবাইক এবং ঝুঁকি নিয়ে কাঁকড়া-ট্রাক্টরে যাতায়াত করছেন। ৫ থেকে ২০ কিলোমিটার পথ বালুর ওপর দিয়ে পাড়ি দিতে গিয়ে গুণতে হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া। এতে সময় ও অর্থ দুই-ই অপচয় হচ্ছে।
অর্থনীতিতে ধস যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় চরাঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে আনা কৃষকদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে তারা ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে, নৌঘাট বন্ধ থাকায় লোকসানের মুখে পড়েছেন ইজারাদাররা।
কছিমের খেয়াঘাটের ইজারাগ্রহণকারী রাজা মিয়া বলেন, “নদীতে পানি না থাকায় অনেক পথ ঘুরে ঘাটে আসতে হয়। এতে খরচ বেড়েছে, যাত্রী কমেছে। প্রতিবছর আমরা চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি।”
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও প্রত্যাশা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা যায়, নৌপথ সচল রাখতে যমুনা ও তিস্তার কিছু স্থানে ড্রেজিং করা হচ্ছে। তবে বিশাল এই সংকটের তুলনায় তা অপ্রতুল। বিআইডব্লিউটিএ একটি রুট সচল রাখার চেষ্টা করলেও কার্যত তা স্থায়ী সমাধান দিচ্ছে না।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই নদীগুলো নাব্য হারাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনজীবনে। এই সংকট মোকাবিলায় কেবল সাময়িক ড্রেজিং নয়, সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘমেয়াদী ও সুপরিকল্পিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

Reporter Name 











