
প্রমত্তা তিস্তা এখন নামমাত্র মরা খাল। একসময়ের উত্তাল ঢেউ আর পানির গর্জনের বদলে নদীর বিশাল বুক জুড়ে এখন শুধুই ধূসর বালুচর। পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাওয়ায় নদীর তলদেশ এখন পরিণত হয়েছে কৃষকের ফসলি জমিতে।
ধু ধু বালুচরে তামাক ও ভুট্টার আবাদ রংপুরের কাউনিয়া রেল ও সড়ক সেতু এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, মূল নদীর সিংহভাগই শুকিয়ে খাঁ খাঁ করছে। যে সেতুর নিচ দিয়ে একসময় বিশাল জলরাশি বয়ে যেত, সেখানে এখন মাইলের পর মাইল তামাক, আলু ও ভুট্টার আবাদ করছেন স্থানীয় কৃষকরা। নাব্য হারিয়ে যাওয়ায় মাঝনদীতেও এখন অনায়াসে হেঁটে চলাচল করা যাচ্ছে। গাইবান্ধার তারাপুর, হরিপুর, চন্ডিপুর ও কাপাসিয়া এলাকার চিত্রও একই রকম।
স্থানীয় কৃষক রহিম উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, “আগে এই সময় নদীতে অনেক পানি থাকত, মাছ ধরতাম। এখন নদী মরে গেছে, তাই নিরুপায় হয়ে বালুচরে চাষাবাদ করছি। কিন্তু পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচ দিতেও এখন অনেক খরচ হচ্ছে।”
কাপাসিয়ার রাজা মিয়া জানান, দীর্ঘকাল খনন না করায় পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। এতে সেচের জন্য ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করছে। পরিবেশবিদ ড. মোজাম্মেল হক সতর্ক করে বলেন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় দেশীয় প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। এছাড়া নৌ-যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার মাঝি ও মৎস্যজীবী।
গণউন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী প্রধান ও উন্নয়ন গবেষক এম. আবদুস সালাম বলেন, “তিস্তা উত্তরবঙ্গের জীবনরেখা। এভাবে নদী শুকিয়ে যাওয়া মানে এই অঞ্চলের মরুকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হওয়া। দ্রুত খনন কাজ শুরু না করলে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
নদী গবেষক ড. আইনুন নিশাত জানান, উজানের পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা এবং পলি জমে তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়াই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। তার মতে, তিস্তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভারসাম্য এখন চরম হুমকির মুখে। এটি রক্ষায় জরুরি সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, তিস্তা নদী উত্তর জনপদের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার প্রাণ। বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে এই নদীর নাব্য ফিরিয়ে এনে এটিকে পুনরায় সম্পদে রূপান্তর করার।

আফতাব হোসেন 







