
আফতাব হোসেন, গাইবান্ধা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, উত্তরের জনপদ গাইবান্ধার রাজনীতির মাঠ ততই সরগরম হয়ে উঠছে। জেলার ৫টি সংসদীয় আসনে মোট ৪০ জন প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে থাকলেও, বিজয়ের মালা শেষ পর্যন্ত কার গলায় উঠবে-সেই সমীকরণ মেলানো এখনই কঠিন। ভোটারদের মতিগতি এবং প্রার্থীদের বিরামহীন প্রচারণায় পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, কোনো আসনেই এককভাবে কাউকে বিজয়ী ঘোষণা করার সুযোগ নেই।
সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন গাইবান্ধার রাজনৈতিক ইতিহাসে ভিন্নমাত্রার। বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সরব উপস্থিতিতে কোনো কোনো আসনে ত্রিমুখী, আবার কোথাও চতুর্মুখী হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্যমতে, গাইবান্ধার ৫টি আসনে মোট ৪০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ): ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটি ঐতিহাসিকভাবে জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত হলেও জামায়াতেরও এখানে শক্ত অবস্থান রয়েছে। মোট ৮ জন প্রার্থীর এই লড়াইয়ে মূলত ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। অতীতে এখানে মূল লড়াই জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এবার ধানের শীষ (বিএনপি), দাঁড়িপাল্লা (জামায়াত) ও লাঙ্গল (জাতীয় পার্টি) প্রতীকের প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি ভোটের সমীকরণ জটিল করে তুলেছে। খন্দকার জিয়াউল ইসলাম মোহাম্মদ আলী (ধানের শীষ), শামীম হায়দার পাটোয়ারী (লাঙ্গল), মো. মাজেদুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা) ও মো. রমজান আলী (হাতপাখা)-সহ অন্য প্রার্থীরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। ‘লাঙ্গল’ তার হারানো দুর্গ ধরে রাখতে মরিয়া, অন্যদিকে জামায়াত চায় তাদের ঘাঁটিতে আধিপত্য বিস্তার করতে।
গাইবান্ধা-২ (সদর): ফ্যাক্টর যখন ‘ব্যক্তিগত ইমেজ’ জেলা সদরের এই আসনটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ৭ জন প্রার্থীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ধানের শীষের প্রার্থী আনিসুজ্জামান খান বাবু, জামায়াতের আব্দুল করিম এবং লাঙ্গলের আব্দুর রশীদ সরকারের মধ্যে। সদর আসনে প্রার্থীর ‘ব্যক্তিগত ইমেজ’ একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। তবে স্বতন্ত্র ও ছোট দলগুলো ভোট ব্যাংকে হানা দিলে ফলাফল যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে।
গাইবান্ধা-৩(সাদুল্যাপুর-পলাশবাড়ি): ১০ প্রার্থীর কঠিন সমীকরণ জেলায় সবচেয়ে বেশি ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এই আসনে, ফলে ভোট ভাগাভাগির বড় সম্ভাবনা রয়েছে। আঞ্চলিকতা এই আসনে একটি বড় ইস্যু। এখানে ধানের শীষের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক, জামায়াতে ইসলামীর আবুল কাওছার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এবং লাঙ্গলের মইনুর রাব্বী চৌধুরীর মধ্যে মূল লড়াইয়ের সম্ভাবনা থাকলেও, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারেন। অতীতে এটি আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও জাতীয় পার্টির নির্দিষ্ট ভোট ব্যাংক লড়াই জমিয়ে তুলতে পারে।
গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ): ট্রাম্পকার্ড ‘সুইং ভোটার’ আয়তন ও ভোটারের দিক দিয়ে জেলার অন্যতম বড় এই আসনে ৬ জন প্রার্থীর মধ্যে সমানে সমান লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ধানের শীষের মোহাম্মদ শামীম কায়সার ও দাঁড়িপাল্লার ডা. আব্দুর রহিম সরকারের সাথে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে লাঙ্গলের কাজী মশিউর রহমানের প্রচারণাও চোখে পড়ার মতো। এই আসনটি বারবার হাতবদল হওয়ায় এখানকার ‘সুইং ভোটাররা’ জয়-পরাজয় নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন।
গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি): চরাঞ্চলের হাওয়ায় নতুনের আবাহন নদীভাঙন কবলিত সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে ৯ জন প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। বিগত দিনে এটি প্রয়াত ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়ার দুর্ভেদ্য ঘাঁটি ছিল। তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এখানে নতুন নেতৃত্ব আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ধানের শীষের ফারুক আলম সরকার, লাঙ্গলের শামীম হায়দার পাটোয়ারী, জামায়াতের মো. আব্দুল ওয়ারেছ (দাঁড়িপাল্লা) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী নাহিদুজ্জামান নিশাদ (হাঁস) ও এএইচএম গোলাম শহীদ রঞ্জুর (মোটরসাইকেল) মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। বিএনপি ও জাতীয় পার্টির দুই বহিষ্কৃত নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় জামায়াত প্রার্থী কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। তবে বিএনপি কর্মীদের মতে, দলীয় বিভেদ থাকলেও ভোটের দিন ধানের শীষের হিসাব এক হবে।
ফুলছড়ি উপজেলায় কোনো প্রার্থী না থাকায় প্রার্থীদের বিশেষ নজর এই উপজেলার চরাঞ্চলের ভোটারদের দিকে। ধারণা করা হচ্ছে, ফুলছড়ির চরাঞ্চল বেষ্টিত ৭টি ইউনিয়নে যে প্রার্থী বেশি ভোট পাবেন, জয়ের পথে তিনিই এগিয়ে থাকবেন।
ভোটারদের প্রত্যাশা গাইবান্ধার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে গ্রামের অলিগলি-সবখানেই এখন নির্বাচনের আলোচনা। সাধারণ ভোটাররা এমন প্রতিনিধি চান যিনি এলাকার উন্নয়ন করবেন এবং সুখে-দুঃখে পাশে থাকবেন। বিশেষ করে নদীভাঙন রোধ, কর্মসংস্থান এবং কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি যারা দিচ্ছেন, তাদের দিকেই সাধারণ মানুষের ঝোঁক বেশি। ভোটাররা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন, যেখানে তারা নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। এখন দেখার অপেক্ষা, প্রার্থীদের বিরামহীন প্রচারণা ও প্রতিশ্রুতি শেষে বিজয়ের হাসি কে হাসেন।

Reporter Name 













