Dhaka ০৭:৩৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
রংপুরে প্রবাসীর স্ত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা: প্রধান আসামি গাজীপুর থেকে গ্রেপ্তার সাঁতরে পার হওয়ার সময় বাঙালি নদীতে এক বৃদ্ধ নিখোঁজ ৩ লাখ রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নিতে রাজি মিয়ানমার: মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী রংপুরে প্রবাসীর স্ত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা, প্রধান আসামি গাজীপুর থেকে গ্রেফতার সাঘাটায় মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার আহ্বানে বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও সমাবেশ সাঘাটায় বিদেশে পাঠানোর নামে ৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ! সংবাদ সম্মেলনে বিচার দাবি লাওসে এশিয়া ন্যাশনাল ওয়াটার কনসালটেটিভ মিটিংয়ে এমপি মিলন নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে সরকার সবসময় থাকবে: এমপি মমতাজ আলো আড়াই বছর ধরে আটকে গাইবান্ধার ৯ সেতুর কাজ, ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কায় দুর্ভোগে মানুষ ধ্বংস আর মৃত্যুর মাঝেও ফুটবলকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াইয়ে ফিলিস্তিনিরা

দুর্যোগের আগাম প্রস্ততিতে মুঠোফোনে ভয়েস কল,  প্রকল্প শেষ হওয়ায় সেবা বন্ধের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন মানুষ

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৩:১৪:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ জুন ২০২৫
  • ১৪২ Time View

আফতাব হোসেন, গাইবান্ধা:

একসময় গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী গ্রামগুলোতে বৃষ্টি কিংবা বন্যার পূর্বাভাস মিলতো পিঁপড়ার সারি বা বাতাসের গতিপথ দেখে। কিন্তু এখন আর অনুমানের ওপর নির্ভর করতে হয় না তাদের। আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বন্যা আসার আগেই সেই তষ্য মোবাইলে ভয়েস কলের মাধ্যমে পেয়ে যেত মানুষ । একটি বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক বাস্তবায়িত সুফল প্রকল্প থেকে দেয়া আগাম বার্তার ফলে মিলত এ সেবা। তবে প্রকল্পটি শেষ হতে চলেছে ফলে এ সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় প্রান্তিক মানুষজন। তাদের দাবী দুর্যোগের নির্ভরযোগ্য তথ্য আসা যেন অব্যাহত থাকে মুঠোফোনে ভয়েস কলের মাধ্যমে।
বন্যা প্রবণ গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় ঝুঁকিতে থাকা মানুষগুলোকে নিয়ে কাজ করছে একটি প্রকল্প। কেয়ার বাংলাদেশ, কনসার্নসহ কয়েকটি উন্নয়ন সংস্থার কনসোর্টিয়াম উদ্যোগ সুফল (স্কেলিং-আপ ফোরকাস্ট-বেইজড অ্যাকশন অ্যান্ড লার্নিং ইন বাংলাদেশ) প্রকল্প যা স্থানীয়ভাবে বাস্তবায়ন করেছে উন্নয়ন সংস্থা এসকেএস। মুলত আগাম বার্তা, আগাম প্রস্তুতি ও আগাম অর্থায়ন নিয়ে কাজ করা হয় এই প্রকল্পের মাধ্যমে ।
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার দক্ষিন সাতালিয়া গ্রামের রুমা বেগমের (৪৭) জানান, আগে তো মুখে খাবার নিয়ে পিঁপড়ার সারি যখন উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেয়, তখন ধরে নেয়া হয় সাতোয়া (সাতদিনব্যাপি বৃষ্টি) হবে। আর উত্তুরে বাতাস বইলে নদীতে পানি কমে এবং দখিনা হাওয়া বয়ে গেলে পানি বাড়বে। কিন্তু এখন আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাসের জন্য অনুমানের উপর নির্ভর করতে হয়না তাদের।
উপজেলার দক্ষিণ উল্লা গ্রামের শিউলী বেগম (৫০), মাঝিপাড়ার কাঞ্চন রানী (৭০), আদর্শ গ্রামের রাধিকা রানী (৫০), এবং বরমতাইড় গ্রামের বেলী রানীরা (৭০) এখন প্রাকৃতিক দূর্যোগ সম্পর্কে অনেক সচেতন। বন্যা, ভাঙ্গন বা বৃষ্টির মতো দূর্যোগের আগে কী ধরণের প্রস্ত নিতে হবে, দুর্যোগকালীন ও পরবর্তীতে কী করতে হবে তাও বেশ ভালোভাবেই জেনে গেছেন তারা। আর এসব জেনেছেন সুফল প্রকল্পের সুবাদে।
২০১৯ সালের জুলাই মাসের শেষের দিকে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা জেলার সদর, সাঘাটা, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ৪২টি ইউনিয়নের অত্যন্তপক্ষে প্রা সাড়ে তিন লক্ষাধিক মানুষ। আবাদ-বসত ভাসিয়ে উত্তাল নদনদীর পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। এই বন্যায় চাল-চুলো হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অনেক মানুষ। বন্যার পরপরই গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় কাজ শুরু হয় সুফল প্রকল্পের। সেবার ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবারকে প্রকল্প থেকে দেয়া হয় অর্থ, খাদ্যসহ বিভিন্ন সহায়তা।
এরপর প্রাকৃতিক দূর্যোগ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য গ্রামে গ্রামে ২০ থেকে ২২ জন নারী-পুরুষ নিয়ে তৈরি হয় কমিউনিটি গ্রুপ। উঠান বৈঠক, আলোচনা, সভা, সেমিনার, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পেয়ে গ্রামের অনেক নিরক্ষর মানুষ সচেতন হয়ে ওঠেন দুর্যোগে নিজেদের কী কী করণীয় এবং ক্ষয়ক্ষতি হ্রাঁসে পদক্ষেপ গ্রহণে।
পরবর্তীতে গ্রামের মানুষের চাহিদার প্রেক্ষিতে প্রতিটি গ্রুপের সদস্যের কাছে প্রকল্পটির মাধ্যমে ভয়েস কল আসতে শুরু করে। ভয়েস কলে জানানো হয় বন্যার আগাম বার্তা। এই বার্তা পেয়ে আশেপাশের মানুষকে মাইকে ঘোষণার মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নেন স্ব স্ব এলাকার গ্রুপ সদস্যরা।
বার্তা পাওয়ার পরপরই শুরু হয় নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্র যাওয়ার প্রস্তুতি কাজ। নারী, পুরুষ, কিশোরীদের জন্য তৈরি হয় আলাদা-আলাদা থাকার জায়গা। যেখানে শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য রাখা হয় বিশেষ ব্যবস্থা। এলাকা থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাবার রাস্তা সংস্কার, আশ্রয়কেন্দ্রে সুপেয় নিরাপদ পানি, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং গবাদী পশু রাখার জন্য নির্মাণ করা হয় অস্থায়ী শেড। আবার বন্যা পরবর্তী সময়ে ঘড়বাড়ি মেরামত, জীবানুমুক্ত করার কাজেও ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাপিয়ে পড়েন তারা।
এদিকে, বন্যা পূর্বাভাস বা ভয়েস কল পাওয়ার আগে অর্থাৎ বর্ষা আসার আগেই আলগা চুলা তৈরি করা, শুকনো খাবার সংরক্ষণ, কাপড়, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সংরক্ষণের ব্যাপারে সচেতন করা হয় গ্রামের মানুষকে। বন্যা-ভাঙ্গনের মতো নিদানকালের জন্য টাকা জমানোর ব্যাপারেও সজাগ করা হয় তাদের। নদ-নদী তীরবর্তী এসব এলাকার মানুষের একমাত্র সম্বল গবাদী পশু। বিশেষ করে বন্যার সময় গোখাদ্য নিয়ে চরম বিপাকে পড়তে হয় তাদের। মাঠ-ঘাট তলিয়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক খাবারের সব উৎস হারিয়ে টাকা দিয়ে গোখাদ্য কেনার সামর্থ থাকেনা অনেকের। সেজন্য প্রত্যেক গ্রুপের সদস্যকে হাতে কলমে গোখাদ্য তৈরি ও সংরক্ষনেরও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
শুধু বন্যার সময় নয় মাঝে মধ্যেই সুফল প্রকল্প থেকে ভয়েস কল আসতো গ্রুপের সদস্যদের কাছে। আসতো আবহাওয়ার খবর। যেমন জমিতে কোন আবহাওয়ায় সেচ, কীটনাশক বা সার প্রয়োগ করা যাবে আর কখন প্রয়োগ করা যাবেনা- সে সম্পর্কে আগাম খবর আসতো ভয়েস কলে। সারের পাশাপাশি শৈত প্রবাহ ও খড়ার আগাম বার্তা এবং কোন মৌসুমে কোন ফসল আর কোন ধরনের বীজ বপন করতে হবে সে বিষয়েও আগাম জানিয়ে দেয়া হতো ভয়েস কলে।

সুফল-২ প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প ব্যবস্থাপক নুরুন্নাহার জানান, এ প্রকল্পের আওতায় ৬ হাজার ৭শ ৫৭ জন মানুষকে ভয়েস কল সেবা পৌঁছে দেয়া হয়। ২ হাজার ৭শ ১০ জনকে আর্থিক সহায়তা, দু’টি ড্রামের ভেলা তৈরি, ৫টি বাঁশের সাঁকো, ৫টি আশ্রয় কেন্দ্রের রাস্তা মেরামত, এগারোটি ল্যান্ডগেজ ও একটি রিভার গেজ স্থাপন, ১০টি স্কুল কাম ফ্লাড শেল্টার মেরামত এবং হাইজিন কিডস বিতরণ করা হয়। এছাড়া দুইশ জনকে সাইলেজ ও হেলেজ পদ্ধতিতে গোখাদ্য তৈরির প্রশিক্ষণ এবং গবাদী পশুর জন্য ২২টি ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পে গবাদী পশুর সেবা দেয়া হয়।

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ভরতখালী ইউনিয়নের বরমতাইড় গ্রামের বাসিন্দা শিরিনা বেগম (৫৫) আক্ষেপ নিয়ে বলছিলেন- খালি (শুধু) টাকা-পয়সা দিয়ে সব হয়না। হামাক (আমাদের) সুফল প্রকল্প যা দিচে (দিয়েছে) তা কুটি (কোটি) টাকাতেও পাওয়া যাবেনা। আগে বানের (বন্যার) আগে, সাতোয়ার আগে কি করা নাগবে (লাগবে) হামার জানা আচিল (ছিলো) না। অ্যাকন (এখন) গরুর খাবার তৈরি করাও শিখছি। বন্যার আগে সোগ (সব) প্রস্ততি নেই। আগে বন্যায় মেলা (অনেক) ক্ষয়ক্ষতি হচে (হয়েছে) এখন তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়না।
দক্ষিণ উল্লা গ্রামের সুজন চন্দ্র দাস বলছিলেন- ভয়েস কলের মাধ্যমে আগাম আবহাওয়ার খবর পাওয়ার কারনে কৃষি ফসল চাষাবাদে তারা অনেক উপকৃত হয়েছেন। এছাড়া বস্তায় এবং ঝুন্ত পদ্ধতিতে সবজি চাষ সম্পর্কেও এখন গ্রামের মানুষ সচেতন। তিনি বলেন, সুফল প্রকল্পের উপকারের কথা মুখে বলে শেষ করা যাবেনা।

গত বছরের ডিসেম্বরে সুফল প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। প্রকল্প বন্ধ হলেও বন্যার আগে ও পরে করনীয় সম্পর্কে গ্রামের মানুষ বেশ সচেতন। প্রকল্প থেকে পাওয়া জ্ঞান কাজে লাগিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার ফলে আর্থিক ক্ষতি কম হচ্ছে। তবে ভয়েস কল বন্ধ হবার কারনে এখন আর প্রাকৃতিক দূর্যোগ কিংবা আবহাওয়ার আগাম কোন খবর পাচ্ছেন না তারা।

দক্ষিণ উল্লা’র শিউলী বেগমের বাড়িতে যখন কথা হচ্ছিলো তখনো ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিলো ওই এলাকায়। শিউলি বলছিলেন বোরো ধান কাটার পর তিনি জানতেন না বৃষ্টি হবে। হঠাৎ করে টানা এক সপ্তাহের বৃষ্টির কারনে তার প্রায় দেড় বিঘা জমির ধান তিনি সিদ্ধ করেও আর শুকাতে পারেননি বলে ধানের গাজ বের হয়ে ধানগুলো আধা নষ্ট হয়ে যায়। জমির সম্পুর্ন খড় বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে পচে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আক্ষেপ করে বলেন, মোবাইলে ভয়েস কল আসলে বৃষ্টির খবর জানতে পারতেন এবং আগাম ব্যবস্থা নিতে পারতেন। শিউলী বেগমের মতো সাঘাটার দক্ষিণ উল্লা, উত্তর উল্লা, মাঝিপাড়া, আদর্শ গ্রাম, বরমতাইড়, নীলকুঠি গ্রামের বাসিন্দারা আবার ভয়েস কল চালুর দাবী জানান। এসব এলাকার বাসিন্দাদের দাবী, প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা আবহাওয়ার খবরের জন্য ভয়েস কল অনেক উপকারী। তারা বলেন, প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে হলে এই ভয়েস কল খুবই উপকারী। দ্রুত যাতে ভয়েস কল চালুর উদ্যোগ নেয়া হয় সেজন্য প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন যমুনা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার মানুষ।

সুফল প্রকল্পের ফোকাল পার্সন খন্দকার জাহিদ সরওয়ার সোহেল জানান, এসকেএস ফাউন্ডেশন ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালে গাইবান্ধার সাঘাটা, বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলায় সুফল প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। এ প্রকল্প থেকে অন্তত: দুই লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে সচেতন হয়েছেন। ভয়েস কল চালুর বিষয়ে তিনি বলেন, প্রকল্পগ্রহণ করা হয় প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষিতে, এব্যাপারে যেহেতু কমিউনিটির মানুষজন উপকৃত হয়েছেন এজন্য এটি সরকারি-বেসরকারিভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এজন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানান।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

রংপুরে প্রবাসীর স্ত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা: প্রধান আসামি গাজীপুর থেকে গ্রেপ্তার

দুর্যোগের আগাম প্রস্ততিতে মুঠোফোনে ভয়েস কল,  প্রকল্প শেষ হওয়ায় সেবা বন্ধের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন মানুষ

Update Time : ০৩:১৪:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ জুন ২০২৫

আফতাব হোসেন, গাইবান্ধা:

একসময় গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী গ্রামগুলোতে বৃষ্টি কিংবা বন্যার পূর্বাভাস মিলতো পিঁপড়ার সারি বা বাতাসের গতিপথ দেখে। কিন্তু এখন আর অনুমানের ওপর নির্ভর করতে হয় না তাদের। আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বন্যা আসার আগেই সেই তষ্য মোবাইলে ভয়েস কলের মাধ্যমে পেয়ে যেত মানুষ । একটি বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক বাস্তবায়িত সুফল প্রকল্প থেকে দেয়া আগাম বার্তার ফলে মিলত এ সেবা। তবে প্রকল্পটি শেষ হতে চলেছে ফলে এ সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় প্রান্তিক মানুষজন। তাদের দাবী দুর্যোগের নির্ভরযোগ্য তথ্য আসা যেন অব্যাহত থাকে মুঠোফোনে ভয়েস কলের মাধ্যমে।
বন্যা প্রবণ গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় ঝুঁকিতে থাকা মানুষগুলোকে নিয়ে কাজ করছে একটি প্রকল্প। কেয়ার বাংলাদেশ, কনসার্নসহ কয়েকটি উন্নয়ন সংস্থার কনসোর্টিয়াম উদ্যোগ সুফল (স্কেলিং-আপ ফোরকাস্ট-বেইজড অ্যাকশন অ্যান্ড লার্নিং ইন বাংলাদেশ) প্রকল্প যা স্থানীয়ভাবে বাস্তবায়ন করেছে উন্নয়ন সংস্থা এসকেএস। মুলত আগাম বার্তা, আগাম প্রস্তুতি ও আগাম অর্থায়ন নিয়ে কাজ করা হয় এই প্রকল্পের মাধ্যমে ।
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার দক্ষিন সাতালিয়া গ্রামের রুমা বেগমের (৪৭) জানান, আগে তো মুখে খাবার নিয়ে পিঁপড়ার সারি যখন উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেয়, তখন ধরে নেয়া হয় সাতোয়া (সাতদিনব্যাপি বৃষ্টি) হবে। আর উত্তুরে বাতাস বইলে নদীতে পানি কমে এবং দখিনা হাওয়া বয়ে গেলে পানি বাড়বে। কিন্তু এখন আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাসের জন্য অনুমানের উপর নির্ভর করতে হয়না তাদের।
উপজেলার দক্ষিণ উল্লা গ্রামের শিউলী বেগম (৫০), মাঝিপাড়ার কাঞ্চন রানী (৭০), আদর্শ গ্রামের রাধিকা রানী (৫০), এবং বরমতাইড় গ্রামের বেলী রানীরা (৭০) এখন প্রাকৃতিক দূর্যোগ সম্পর্কে অনেক সচেতন। বন্যা, ভাঙ্গন বা বৃষ্টির মতো দূর্যোগের আগে কী ধরণের প্রস্ত নিতে হবে, দুর্যোগকালীন ও পরবর্তীতে কী করতে হবে তাও বেশ ভালোভাবেই জেনে গেছেন তারা। আর এসব জেনেছেন সুফল প্রকল্পের সুবাদে।
২০১৯ সালের জুলাই মাসের শেষের দিকে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা জেলার সদর, সাঘাটা, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ৪২টি ইউনিয়নের অত্যন্তপক্ষে প্রা সাড়ে তিন লক্ষাধিক মানুষ। আবাদ-বসত ভাসিয়ে উত্তাল নদনদীর পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। এই বন্যায় চাল-চুলো হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অনেক মানুষ। বন্যার পরপরই গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় কাজ শুরু হয় সুফল প্রকল্পের। সেবার ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবারকে প্রকল্প থেকে দেয়া হয় অর্থ, খাদ্যসহ বিভিন্ন সহায়তা।
এরপর প্রাকৃতিক দূর্যোগ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য গ্রামে গ্রামে ২০ থেকে ২২ জন নারী-পুরুষ নিয়ে তৈরি হয় কমিউনিটি গ্রুপ। উঠান বৈঠক, আলোচনা, সভা, সেমিনার, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পেয়ে গ্রামের অনেক নিরক্ষর মানুষ সচেতন হয়ে ওঠেন দুর্যোগে নিজেদের কী কী করণীয় এবং ক্ষয়ক্ষতি হ্রাঁসে পদক্ষেপ গ্রহণে।
পরবর্তীতে গ্রামের মানুষের চাহিদার প্রেক্ষিতে প্রতিটি গ্রুপের সদস্যের কাছে প্রকল্পটির মাধ্যমে ভয়েস কল আসতে শুরু করে। ভয়েস কলে জানানো হয় বন্যার আগাম বার্তা। এই বার্তা পেয়ে আশেপাশের মানুষকে মাইকে ঘোষণার মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নেন স্ব স্ব এলাকার গ্রুপ সদস্যরা।
বার্তা পাওয়ার পরপরই শুরু হয় নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্র যাওয়ার প্রস্তুতি কাজ। নারী, পুরুষ, কিশোরীদের জন্য তৈরি হয় আলাদা-আলাদা থাকার জায়গা। যেখানে শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য রাখা হয় বিশেষ ব্যবস্থা। এলাকা থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাবার রাস্তা সংস্কার, আশ্রয়কেন্দ্রে সুপেয় নিরাপদ পানি, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং গবাদী পশু রাখার জন্য নির্মাণ করা হয় অস্থায়ী শেড। আবার বন্যা পরবর্তী সময়ে ঘড়বাড়ি মেরামত, জীবানুমুক্ত করার কাজেও ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাপিয়ে পড়েন তারা।
এদিকে, বন্যা পূর্বাভাস বা ভয়েস কল পাওয়ার আগে অর্থাৎ বর্ষা আসার আগেই আলগা চুলা তৈরি করা, শুকনো খাবার সংরক্ষণ, কাপড়, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সংরক্ষণের ব্যাপারে সচেতন করা হয় গ্রামের মানুষকে। বন্যা-ভাঙ্গনের মতো নিদানকালের জন্য টাকা জমানোর ব্যাপারেও সজাগ করা হয় তাদের। নদ-নদী তীরবর্তী এসব এলাকার মানুষের একমাত্র সম্বল গবাদী পশু। বিশেষ করে বন্যার সময় গোখাদ্য নিয়ে চরম বিপাকে পড়তে হয় তাদের। মাঠ-ঘাট তলিয়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক খাবারের সব উৎস হারিয়ে টাকা দিয়ে গোখাদ্য কেনার সামর্থ থাকেনা অনেকের। সেজন্য প্রত্যেক গ্রুপের সদস্যকে হাতে কলমে গোখাদ্য তৈরি ও সংরক্ষনেরও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
শুধু বন্যার সময় নয় মাঝে মধ্যেই সুফল প্রকল্প থেকে ভয়েস কল আসতো গ্রুপের সদস্যদের কাছে। আসতো আবহাওয়ার খবর। যেমন জমিতে কোন আবহাওয়ায় সেচ, কীটনাশক বা সার প্রয়োগ করা যাবে আর কখন প্রয়োগ করা যাবেনা- সে সম্পর্কে আগাম খবর আসতো ভয়েস কলে। সারের পাশাপাশি শৈত প্রবাহ ও খড়ার আগাম বার্তা এবং কোন মৌসুমে কোন ফসল আর কোন ধরনের বীজ বপন করতে হবে সে বিষয়েও আগাম জানিয়ে দেয়া হতো ভয়েস কলে।

সুফল-২ প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প ব্যবস্থাপক নুরুন্নাহার জানান, এ প্রকল্পের আওতায় ৬ হাজার ৭শ ৫৭ জন মানুষকে ভয়েস কল সেবা পৌঁছে দেয়া হয়। ২ হাজার ৭শ ১০ জনকে আর্থিক সহায়তা, দু’টি ড্রামের ভেলা তৈরি, ৫টি বাঁশের সাঁকো, ৫টি আশ্রয় কেন্দ্রের রাস্তা মেরামত, এগারোটি ল্যান্ডগেজ ও একটি রিভার গেজ স্থাপন, ১০টি স্কুল কাম ফ্লাড শেল্টার মেরামত এবং হাইজিন কিডস বিতরণ করা হয়। এছাড়া দুইশ জনকে সাইলেজ ও হেলেজ পদ্ধতিতে গোখাদ্য তৈরির প্রশিক্ষণ এবং গবাদী পশুর জন্য ২২টি ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পে গবাদী পশুর সেবা দেয়া হয়।

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ভরতখালী ইউনিয়নের বরমতাইড় গ্রামের বাসিন্দা শিরিনা বেগম (৫৫) আক্ষেপ নিয়ে বলছিলেন- খালি (শুধু) টাকা-পয়সা দিয়ে সব হয়না। হামাক (আমাদের) সুফল প্রকল্প যা দিচে (দিয়েছে) তা কুটি (কোটি) টাকাতেও পাওয়া যাবেনা। আগে বানের (বন্যার) আগে, সাতোয়ার আগে কি করা নাগবে (লাগবে) হামার জানা আচিল (ছিলো) না। অ্যাকন (এখন) গরুর খাবার তৈরি করাও শিখছি। বন্যার আগে সোগ (সব) প্রস্ততি নেই। আগে বন্যায় মেলা (অনেক) ক্ষয়ক্ষতি হচে (হয়েছে) এখন তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়না।
দক্ষিণ উল্লা গ্রামের সুজন চন্দ্র দাস বলছিলেন- ভয়েস কলের মাধ্যমে আগাম আবহাওয়ার খবর পাওয়ার কারনে কৃষি ফসল চাষাবাদে তারা অনেক উপকৃত হয়েছেন। এছাড়া বস্তায় এবং ঝুন্ত পদ্ধতিতে সবজি চাষ সম্পর্কেও এখন গ্রামের মানুষ সচেতন। তিনি বলেন, সুফল প্রকল্পের উপকারের কথা মুখে বলে শেষ করা যাবেনা।

গত বছরের ডিসেম্বরে সুফল প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। প্রকল্প বন্ধ হলেও বন্যার আগে ও পরে করনীয় সম্পর্কে গ্রামের মানুষ বেশ সচেতন। প্রকল্প থেকে পাওয়া জ্ঞান কাজে লাগিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার ফলে আর্থিক ক্ষতি কম হচ্ছে। তবে ভয়েস কল বন্ধ হবার কারনে এখন আর প্রাকৃতিক দূর্যোগ কিংবা আবহাওয়ার আগাম কোন খবর পাচ্ছেন না তারা।

দক্ষিণ উল্লা’র শিউলী বেগমের বাড়িতে যখন কথা হচ্ছিলো তখনো ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিলো ওই এলাকায়। শিউলি বলছিলেন বোরো ধান কাটার পর তিনি জানতেন না বৃষ্টি হবে। হঠাৎ করে টানা এক সপ্তাহের বৃষ্টির কারনে তার প্রায় দেড় বিঘা জমির ধান তিনি সিদ্ধ করেও আর শুকাতে পারেননি বলে ধানের গাজ বের হয়ে ধানগুলো আধা নষ্ট হয়ে যায়। জমির সম্পুর্ন খড় বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে পচে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আক্ষেপ করে বলেন, মোবাইলে ভয়েস কল আসলে বৃষ্টির খবর জানতে পারতেন এবং আগাম ব্যবস্থা নিতে পারতেন। শিউলী বেগমের মতো সাঘাটার দক্ষিণ উল্লা, উত্তর উল্লা, মাঝিপাড়া, আদর্শ গ্রাম, বরমতাইড়, নীলকুঠি গ্রামের বাসিন্দারা আবার ভয়েস কল চালুর দাবী জানান। এসব এলাকার বাসিন্দাদের দাবী, প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা আবহাওয়ার খবরের জন্য ভয়েস কল অনেক উপকারী। তারা বলেন, প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে হলে এই ভয়েস কল খুবই উপকারী। দ্রুত যাতে ভয়েস কল চালুর উদ্যোগ নেয়া হয় সেজন্য প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন যমুনা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার মানুষ।

সুফল প্রকল্পের ফোকাল পার্সন খন্দকার জাহিদ সরওয়ার সোহেল জানান, এসকেএস ফাউন্ডেশন ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালে গাইবান্ধার সাঘাটা, বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলায় সুফল প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। এ প্রকল্প থেকে অন্তত: দুই লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে সচেতন হয়েছেন। ভয়েস কল চালুর বিষয়ে তিনি বলেন, প্রকল্পগ্রহণ করা হয় প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষিতে, এব্যাপারে যেহেতু কমিউনিটির মানুষজন উপকৃত হয়েছেন এজন্য এটি সরকারি-বেসরকারিভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এজন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানান।