
ডেস্ক রিপোর্টঃ বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, তাঁদের অন্যতম পল্লীগীতি সম্রাট আবদুল আলীম। আজ তাঁর জন্মদিন, ১৯৩১ সালের ২৭ জুলাই তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার তালিবপুর (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত) গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। দেশভাগের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) কুড়িগ্রামে চলে আসেন।
শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। পরিবারের উৎসাহে ছোটবেলায় গান শেখা শুরু করেন। কৈশোরেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গেয়ে মানুষের নজর কেড়ে নেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বেতারের শিল্পী হিসেবে যুক্ত হয়ে তিনি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর কণ্ঠে লোকসংগীত যেন বাংলার মাটি, নদী, কৃষক, মাঝি, গ্রামীণ জীবন, প্রেম-বিরহ, মানবতা ও আধ্যাত্মিকতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল।
আবদুল আলীমের গানের পরিধি ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। তিনি পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, মুর্শিদী, মারফতি, জারি, সারি এবং ইসলামী সংগীতে সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিটি ধারার গান তিনি নিজস্ব আবেগ, উচ্চারণ ও স্বতন্ত্র গায়কীর মাধ্যমে শ্রোতাদের কাছে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। ফলে তাঁর গান শহর থেকে গ্রাম সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
তাঁর গাওয়া অসংখ্য গান আজও বাংলা সংগীতের অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। “সর্বনাশা পদ্মা নদী”, “নাইয়ারে”, “ও বন্ধু রে”, “আমার গহীন গাঙের নাইয়া”, “পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে”-সহ আরও বহু গান যুগের পর যুগ ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। তাঁর কণ্ঠে নদীমাতৃক বাংলার জীবন, মানুষের সুখ-দুঃখ এবং লোকজ ঐতিহ্য যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
সংগীতজীবনে তিনি অনেক সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৭৭ সালে বাংলা লোকসংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করে। এছাড়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন তাঁর অবদানকে নানা সময়ে সম্মানিত করেছে।
১৯৭৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মাত্র ৪৩ বছর বয়সে তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। অল্প সময়ের জীবন হলেও তাঁর সৃষ্টিকর্ম বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছে স্থায়ীভাবে, তাঁর কণ্ঠের আবেদন আজও অমলিন। বাংলা সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্যের ধারক-বাহক হিসেবে তিনি চিরকাল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
আজ এই কালজয়ী শিল্পী জন্মদিন উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিল্পী, গবেষক ও ভক্তরা নানা কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করছেন। বাংলা লোকসংগীতের ঐতিহ্য সংরক্ষণে তাঁর অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন সংস্কৃতিসেবীরা।

Reporter Name 
























